আমরা পেনাল্টি শটকে বলতাম প্লান্টিক

ইরাজ আহমেদ

সেই শহরে, সেই সুদূর অতীতে পাড়ার বন্ধুরা মিলে একটা ক্লাব তৈরী করেছিলাম। নাম ছিলো ‘রঙধনু বয়েজ ক্লাব’।এখন চলছে বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা। খেলা দেখতে দেখতে মনে পড়লো ষাট, সত্তরের দশকে ঢাকা শহরের পাড়ায় পাড়ায় এরকম ছোট ছোট ক্লাব ছিলো। দলবেঁধে আমরা চাঁদা তুলতাম ফুটবল আর ক্রিকেট ব্যাট কেনার জন্য। এখন থেকে বছর তিরিশ আগে ক্রিকেটের বল মাঠে গড়াতো শীতকালে। তার আগে গ্রীষ্ম-বর্ষা জুড়ে শুধুই ফুটবলের দাপট।আমরা তখন ভুল করে পেনাল্টি শটকে বলতাম ‘প্লান্টিক শট’, গোলকিপারকে ‘গোলকি’।
এসব ছোট ছোট ক্লাবগুলোর অস্তিত্ত্ব এখন আর টেরই পাওয়া যায় না। মাঠ হারিয়েছে এই শহরের কিশোরদের জীবন থেকে। হারিয়েছে পাড়ার ক্লাব কালচার।
আমরা ‘রঙধনু বয়েজ ক্লাব’-এর পক্ষ থেকে প্রচুর ফুটবল ম্যাচ খেলতে যেতাম বিভিন্ন পাড়ায়। টুর্নামেন্ট খেলা হতো তখনকার সিদ্ধেশ্বরী বালক বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠে, মালিবাগের বাগানবাড়ি ক্লাবের মাঠে, শান্তিনগরের বালুর মাঠে। লিখতে বসে মনে পড়ছে অদ্ভুত সব ফুটবল ম্যাচের কথা। তখন ম্যাচের বাঁশি বাজার আগে আমাদের উচ্চতা মাপা হতো মাঠের পাশে দেয়ালে দাগ টেনে।এর কারণ ছিলো বয়সে একটু বড় ভালো খেলোয়াড় যাতে ভাড়ায় কোনো টিমে খেলতে না পারে।তখন টুর্নামেন্ট অথবা ম্যাচ জিততে অন্য পাড়ার ভালো খেলোয়াড়দের ভাড়া করে এনে খেলানো হতো। এই ভাড়াটে ফুটবলারদের অন্য পাড়া থেকে নিয়ে আসতে হতো রিকশায়। খেলাশেষে হাতে দিতে হতো কয়েকটা ভাংতি টাকা।বলছিলাম দেয়ালে দাগ টেনে মাপ দেয়ার কথা। একবার তেমনি এক উত্তেজনাকর ম্যাচে আমরা দারুণ এক স্ট্রাইকারকে ভাড়া করে আনলাম পাশের পাড়া থেকে। কিন্তু ঝামেলা বাধলো তার উচ্চতা নিয়ে। সে ছিলো আমাদের চাইতে বয়সে বড়। আমাদের প্রতিপক্ষ ব্যাপারটা জানতো।খেলোয়াড়দের নাম ঘোষণার সময় ঝামেলা শুরু করলো তারা। আমরা পড়লাম বিপদে।কিন্তু ওই প্রখ্যাত খেলোয়াড়ই শেষে বাঁচালো আমাদের। দেয়ালের উচ্চতা মাপার দাগের তলায় কৌশলে নিজের শরীরকে সামান্য বাঁকা করে দাঁড়ালো সে। তাতে তার বেশী উচ্চতা ম্যাচের আয়োজকদের চোখে আর ধরা পড়লো না। মনে আছে আমরা সেই ম্যাচটা জিতেছিলাম।
তখন হাফটাইমে আমাদের দেয়া হতো ছোট করে কাটা এক টুকরো লেবু আর পানি। হায়ারে যারা খেলতে আসতো তাদের জন্য বাড়তি বরাদ্দ ছিলো দশ অথবা পনেরো পয়সার আইসক্রীম। একটা বালতিতে পানির মধ্যে বরফ ফেলে তার উপরে রাখা হতো লেবু। সেই ঠাণ্ডা লেবুর স্বাদ আর ঘ্রাণ আজো যেন টের পেলাম পেছনের পথে ফিরে তাকিয়ে।কোনো কোনো দিনে পাড়ার মোড়ের রেস্তোরাঁয় খাওয়ানো হতো সদ্য ভাজা গরম পুরি আর মাংসের ঝোল। এ ধরণের আয়োজনে অবশ্য ব্যায়ভার বহন করতো পাড়ার বড় ভাইরা। আমরা তখন খালি পায়ে ফুটবল খেলতাম। বুট কেনার আর্থিক সামর্থ ছিলো না ক্লাবের।
জানুয়ারী মাসে চাঁদা তুলে একটা বল কেনা হতো। সময়টা সত্তরের দশকের শেষভাগ প্রায়। অনেক ভেবে মনে পড়লো, সম্ভবত তখন একটা ভালো ফুটবলের জন্য গুনতে হতো একশ পঁচিশ টাকা। টাকা জোগাড় হলে দলবেঁধে ফুটবল কিনতে যেতাম ঢাকা স্টেডিয়ামে ‘হিমালয় স্পোর্টস’ নামে একটি দোকানে। সেই নতুন কেনা বলের চামড়ার ঘ্রাণ যে কী অসাধারণ ছিলো! ক্লাবের সদস্যদের সবার বাসায় বলটা ভ্রমণ করতো। তখন বলে হাওয়া পাঠানোর যন্ত্র কেনার সামর্থ আমাদের ছিলো না। তাই বাজারের মোড়ে রিকশার চাকায় হাওয়া দেয়ার পাম্পারটাই ছিলো ভরসা। যতদূর মনে পড়ে দশ পয়সা দিতে হতো বল পাম্প করাতে।
আমরা বিচিত্র সব পোশাক পড়ে ফুটবল খেলতাম। কারো পরনে হাতকাটা স্যাণ্ডো গেঞ্জী কারো আবার খালি গা। কেউ মাঠে আসতো পুরনো শার্ট পড়ে। তখন বড়দের শীল্ড ম্যাচে জার্সি পড়ার রেওয়াজ ছিলো। কাঁদা আর ঘামে মাখামাখি হয়ে বাড়ি ফিরতাম সন্ধ্যাবেলা। ফেরার পথে বয়েজ স্কুলের একপাশে একটা কলে সবাই মিলে গোসল করতাম। তখন সেই পানিতেও কেমন খনিজ গন্ধ ছিলো।
চশমা পড়ে গোলকিপিং করতো কোকো। রয়েল নামে বন্ধুটি কী অসাধারণ ফুটবল খেলতো। ফুটবল খেলে আশপাশের পাড়ায় সুনাম কুড়িয়েছিলো অমর, আতিক, লিলু। পোলিওর আক্রমণে ছোট হয়ে যাওয়া পা নিয়েও গোলপোস্টের তলায় আমাদের আরেক ভরসাস্থল ছিলো সেন্টু। বিকেলবেলা ফুটবল মাঠের গর্জন আজো কানে ভেসে আসে। বিশ্বকাপের খেলা দেখতে দেখতে হয়তো নাকে ভেসে আসে কাদামাখা মাঠের ঘাসের গন্ধ। মনে পড়ে মাঠের পাশের বাড়ির বারান্দায় বিকেলে অনমনা দাঁড়ানো সেই কিশোরীকে যে আমাদের খেলা দেখতো।