আমার বন্ধুসম বাবা

দীবা নার্গিস

বাবার সান্নিধ্য লাভ এবং তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল আমার মা- ফরিদা খাতুন আমাদের ছেড়ে যাবার পর। তখন ১৯৮৪ সাল ফুরিয়ে আসছে। তার আগেকার বাবার সঙ্গে স্মৃতি খুব একটা মনে পড়ে না। বাংলাদেশের নাট্যজগতে অসাধারণ প্রতিভাবান এক মানুষ ছিলেন আব্দুল্লাহ আল-মামুন। আমার দেখা এক শ্রেষ্ঠ বাবা।  ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত আমার মা তাঁকে সংসারের সব রকম উত্তাপ থেকে দূরে রেখেছিলেন। মায়ের বেঁচে থাকার সময়ে আমার বাবা আমাদের চার ভাইবোনের বয়স এবং ক্লাশ নিয়ে বরাবরই বিভ্রান্ত থাকতেন।

বাবা ও মা

বাবার কাছেই শোনা, ছেলেমেয়েদের বয়স কেউ জানতে চাইলে দৈর্ঘ্য না দেখিয়ে উনি প্রস্থেই দেখাতেন, কারন ছেলেমেয়েদের উনি দেখতেন সকালে বিছানায় আর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায়। আমার মা-বাবা ৮৪ সালে ছিলেন ৩২ এবং ৪০ বছর বয়সী দম্পতি। আশির দশকে এই বয়সীদের দেখা হতো মুরব্বি গোছের, অভিভাবক পর্যায়ের মানুষ হিসেবে। আমার মা পুরদস্তুর সেভাবেই জীবনযাপন করতেন। পরিবারে উনি ছিলেন সবার মুরব্বি সে মানুষটির বয়স হোক ৮ বা ৫৮। আত্মীয় বা অনাত্মীয় সব্বাইকে উনি নিজের মমতার ডানা দিয়ে আগলে রাখতেন। আমরা চার জন আমার মায়ের এইসব ভালোবাসার মানুষদের তালিকার নিচের দিকেই থাকতাম। এখন আমি নিজে মা হয়ে সেই কারণটা বুঝতে পারি। সন্তানদের ভালমন্দ নিশ্চিত হওয়াটা সংসারের বাকি আট দশটা কাজের মধ্যে হয়েই যায় কিন্তু বাকিদের হিষেব করতে হয় চারদিক ভেবে চিন্তে। জীবিকা আর মিডিয়া-এই দুই জগতের কর্মব্যাস্ত আমার বাবা তাঁর স্ত্রীর সব কাজেই পাশে থাকতেন একজন যথাযথ জীবনসঙ্গী হয়ে। আমার মা-ও ছিলেন আমার বাবার সর্বদা সঙ্গী। বাবার সব কাজের ব্যাক্তিগত জীবনের পুরো দায়িত্ব আমার মা সুনিপুন ভাবেই পালন করে গেছেন। সেটা হোক টেলিভিশন, মঞ্চ নাটক অথবা চলচ্চিত্রের শ্যুটিংয়ের সময়ে।   আমার বাবার কাজ আর প্যাশনের জায়গাগুলতে আমার মায়ের ভালোবাসা ছিল শতকরা এক’শ ভাগ।  আমাদের শৈশব এবং কৈশোরের প্রথম ভাগে বাবা ছিলেন মায়ের কড়া শাসন থেকে বাঁচার একমাত্র আশ্রয়স্থল।  মায়ের শাসনের একটি প্রধান অস্ত্র ছিলো পিটুনি আর বাবা সবসময় ছিলেন এর বিরুদ্ধে। উনি মাকে বলতেন, মেয়েদের গায়ে হাত না তুলেও তো শাসন করা যায়। আমি নানা রকম মার খাওয়ার কাজ করেও নিপাট ভদ্র মানুষ হয়ে বাবার বাসায় ফেরার অপেক্ষায় থাকতাম। কারন একমাত্র তিনিই তখন আমাকে বাঁচাতে পারতেন। জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের সামলে রেখেছিলেন উনি। মাতৃহীন চারটি বাচ্চাকে প্রায় একাই বড় করেছেন। সে সময় আমাদের দাদী আমাদের সঙ্গে থাকতেন। বাবার সঙ্গে সঙ্গে দাদীকে আমরাও ‘আম্মা’ বলে ডাকতাম।   মায়ের অনুপস্থিতিতে বাবা হয়ে গেলেন আমাদের ‘ ফ্রেন্ড, ফিলোজফার অ্যান্ড গাইড’। কী অসাধারন কৌশলে সদ্য কৈশোর ছোঁয়া মেয়েদের এবং একমাত্র শিশু পুত্রটিকে নিখাদ ভালোবাসায় ঘিরে রাখতেন আমাদের বাবা। যে মানুষটি আমাদের নিয়মিত পড়াতে আসতেন সেই গৃহশিক্ষককে একদিন বাড়ির বসার ঘরে দেখে বাবা ভেবেছিলেন তাঁর কোন সাক্ষাৎপ্রার্থী। স্যার হেসে বলেছিলেন, ‘ আমি গত এক বছর ধরে আপনার মেয়েদের পড়াচ্ছি। কিন্তু আপানার সঙ্গে দেখা হওয়ার সৌভাগ্য হলো আজ’। এই একই মানুষ স্ত্রীর অবর্তমানে তাঁর সন্তানদের দিয়েছেন মায়ের মমতা, বাবার ভালবাসা। আমরা বাবা এবং মাকে পেয়েছি একজন মানুষের মাঝেই।

     আমাদের বাড়িতে খাওয়া অথবা ঘুমের সময় শুধু মাত্র আমারা ছয়জন থাকবো সেটা মা থাকাকালীন অবস্থায় কখনও হয়নি। সুতরাং আমরা সে সময় সঙ্গিহীন হওয়ার সুযোগ পেতাম না। পরে সেই জায়গায় পেয়েছি বাবাকে। আমাদের সঙ্গে ক্যারাম খেলা, লুডো অথবা তাস খেলায় উনি থাকতেন ভীষণ সক্রিয়। সিনেমা দেখা , রেস্তোরায় খাওয়া , বাইরে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করতেন বাবা। আমাদের চার ভাইবোনের জন্য একই রকম ভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করায় আমারা একটা অদৃশ্য সুতোয় আটকে আছি নানা রকম চরাই উৎরাই পার হয়েও। নাটক হোক মঞ্চ বা টেলিভিশনের সেসব নিয়মিত দেখতাম আমরা প্রচণ্ড উৎসাহ নিয়ে। আমার মা যেমন থিয়েটারের নিয়মিত সদস্য ছিলেন আমরাও পর্যায়ক্রমে থিয়েটারের সঙ্গে ছিলাম। বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র দেখা, বই পড়া, বিভিন্ন রকম খেলায় অংশ নেয়া এই সবই হয়েছে বাবার অনুপ্রেরণায় এবং সাহচার্যে। একুশের বই মেলায় থিয়েটারের স্টল–এ প্রতিদিন উপস্থিতি ছিল ফেব্রুয়ারী মাসের আকর্ষণ। বইয়ের সঙ্গে পরিচিতি আর বই পড়ার প্রতি আমাদের ভালবাসা তৈরি হয় তখন থেকেই। সেসময়ের মোবাইলহীন দিন  আর স্বল্প সময়ের screen time ছিল সত্যিকার অর্থে আশীর্বাদ। যে কারনে বইপড়ার অভ্যাস আমাদের সময়ের ছেলেমেয়েদের ছিল মজবুত। বাবা মা আর অন্যান্যরাও উপহার হিসাবে বইকেই বেছে নিতেন।

বাবা তাঁর ভালবাসার বিষয়গুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা গড়তে চেয়েছিলেন মনেপ্রানে। বাবার প্রথম ভালবাসা ছিল ‘নাটক’। চেয়েছেন আমরা এই শিল্পটিকে ধারন করি নিজেদের মধ্যে। রীতিমত পড়াশুনো করেছিলাম সেসময় ‘থিয়েটার স্কুল’-এ। উনি সবসময় চাইতেন খেয়ালের বশে আমরা যেন কোনো কাজ না করি। বিষয়টিকে নিজের প্যাশন হিসেবে নিজের মধ্যে বড় হতে দেই। আমারা তাঁর এই প্রয়াসকে বেশি দূর নিয়ে যেতে পারিনি। এটা তিক্ত সত্য কিন্তু আমরা তাঁর ভালবাসার জায়গায় পৌঁছুতে পারিনি। এখনো মনে হয় আমার মা যিনি ছিলেন নাট্য জগতের অনেক দূরের মানুষ কিন্তু বাবার ভালবাসা আর প্যাশনকে উপলব্ধি করেই এক সময় সে জগত তাঁর নিজের হয়ে উঠেছিলো।মা শুধুমাত্র আমার বাবার প্রতি তাঁর ভালবাসার কারণেই আপন করে নিয়েছিলেন সেই পৃথিবীকে। নিজেকে বড় হতভাগ্য মনে হয় এমন একজন মানুষকে কাছে পেয়েও তাঁর শিক্ষার সমাদর করতে পারিনি। আজ এই সময় মনে হচ্ছে এখনও দিন ফুরিয়ে যায়নি, কাজ করার ইচ্ছেও শেষ হয়নি। বাবার এই ভালবাসাকে  এখনকার প্রজন্মের  সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কাজটা  আমাকে করতে হবে। আমাদের দেশে সমসাময়িক শিল্প চর্চা কিভাবে করে গেছেন বাবা সেটা নিয়ে এখন কেউ কথা বলেন না। এই দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে, দায়িত্ব মনে করে নয় নিজের ভালবাসার জায়গা থেকেই করবো সেটা।

জীবনকে পজেটিভ দৃষ্টিতে দেখাটাও শেখার বিষয়। আমাদের ছেলেবেলার কঠিন সময়ে নিজেদের সব রকম নেতিবাচক বলয় থেকে দূরে রাখা শিখেছি বাবার কাছেই। একটা সময় পর্যন্ত খুব ‘পজেটিভ’ মানুষ আমার বাবা পরবর্তী জীবন নিয়ে উদাসীন হয়ে গিয়েছিলেন।সে সময় আমার বাবা একা হয়ে পড়েছিলেন খুব বেশি।  কাতর হয়ে থাকতেন কারও সঙ্গলাভের। যাদের জন্য অপেক্ষা করতেন তারা তাকে সময় দেননি। অভিমানী আমার বাবা নিজেকে পুরাটাই গুটিয়ে নিয়েছিলেন জীবনের শেষ পর্যায়ে।

বেশির ভাগ সময় তাঁকে নিজের শোবার ঘরে বিছানার পাশে রাখা ছোট সোফাটায় বসে থাকতে দেখা যেতো।  তখন বাবার সঙ্গী ছিলো আমার ভ্রাতষ্পুত্র ‘সুদিন’। এই নাতিটিকে উনি চোখে হারাতেন আর বলতেন, ‘স্নেহ নিম্নগামী’। তখন এই বাড়াবাড়ি রকমের ভালবাসাকে কখনো আমাদের মনে হয়েছে আদিখ্যেতা। ভাবতাম ছেলেটাকে পৃথিবীর কোন কঠিন বিষয় বুঝতেই দিচ্ছেন না উনি, ও তো খুব ভুগবে।বাবার জগতটা  এই শিশুটিকে কেন্দ্র করেই ছিলো। ওর প্রতি ভালবাসাই তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলকে করে তুলেছিলো আনন্দময়।

প্যাকেজ নাটকের শুরুর দিনগুলোতে ব্যাস্ত থাকা মানুষটি ২০০৩-২০০৪ সাল থেকে টিভি নাটকের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। অথচ আধুনিক টিভি নাটকের সূচনা তাঁর হাতেই। তখন অতি মাত্রায় বাণিজ্যিক প্রভাব নাটকের মান নিয়ে গিয়েছিলো প্রায় শূণ্যের কোঠায়। যেমন ভাষার ব্যাবহার তেমনই হালকা নাট্য রচনা। সেই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়ার মতো তো উনি নন। এ সব কারণে জীবনের শেষের কাজগুলো উনি করেছেন অভ্যাসের কারনে, প্যাশন থেকে নয়। আমার প্রায়ই মনে হয়, বাবার এই মানসিক কষ্টটাই তাঁর শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিলো। উনি কোন ভাবেই নাটকের এই অবক্ষয় দেখতে পারছিলেন না। কিন্তু যারা এর মাধ্যমে ব্যাবসায়িক লাভটাই দেখছিলেন তারা ছিলো দলে ভারী। আমার বাবা একা এক হাতে নাটকের মান বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধটা বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারেননি। চলে গেছেন অসময়ে, অভিমান নিয়ে, প্রচণ্ড দুঃখ বোধ নিয়ে।

১৩ই জুলাই বাবার জন্মদিন। ২০০৮ সালের জন্মদিনটা খুব আড়ম্বরে পালন করতে চেয়েছিলেন। এই ইচ্ছেটাও তাঁর অনেক অপূরণীয় ইচ্ছের তালিকায় যোগ হয়ে গেছে। জন্মদিন আর মৃত্যু দিন-এর মধ্যে ফারাক এক মাস সাত দিনের। সেই বছরের জন্মদিন তাঁর শেষ জন্মদিন বুঝতেই পারেননি হাসপাতালের সি.সি.ইউ-এর ঠান্ডা বিছানায় শুয়ে। কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে তাঁর জীবন যুদ্ধ। চলে গেছেন বড্ড বেশী তাড়াতাড়ি। বাবা আমার, যেখানেই আছো ভাল থাকো। ওখানে তোমার মনে কষ্ট দেয়ার মত কাজ আর তোমাকে দেখতে হবে না। তোমার ভালবাসার জায়গা গুলো তুমি আবার তৈরি করে নিয়ো।