আমার বিশ্ববিদ্যালয়…

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

( কলকাতা থেকে): দু’বছরের অন্ধকার যুগ কাটিয়েছিলাম মাধ্যমিকের পরে।ফিজ়িক্স-কেমিস্ট্রি-ম্যাথস-বায়োর চতুর্মুখী ফাঁসে মনের দম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল…। কিন্তু শরীর চলতো ‘ভাল ছাত্রীর’ মতো অভিনয় করতে করতে, সিলেবাস-সমুদ্রের পাড়ে বসে ঘাড় গুঁজে নম্বর খুঁড়তে খুঁড়তে…।

খানিক লোকদেখানো কোচিংক্লাস আর তুমুল মনভরানো ফাঁকিবাজির পরে চলনসই একটা রেজ়াল্ট করে, এদিক ওদিক ফর্ম তুলেছিলাম। জার্নালিজ়ম, লিঙ্গুইস্টিকস, জিওলজি এই সব। ও দিকে জয়েন্ট এন্ট্রান্সে একটা কয়েদি নম্বরও জুটে গিয়েছিল, ভবিষ্যতের আইটি খামারের এক দুঃখী গরু হিসেবে…।

সব কিছু বদলে দিয়েছিল একটা পরীক্ষা।
জাস্ট খেলাচ্ছলে দিতে যাওয়া একটা পরীক্ষা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপ্যারেটিভ লিটরেচারের এন্ট্রান্স টেস্ট। সাংবাদিক হতে চাইতাম ছোটো থেকেই। সাংবাদিক হিসেবে বাড়িতে চিনতাম শুধুমাত্র দীপান্বিতা মাসিকে। আর দীপামাসি কমপ্যারেটিভ পড়েছিল…।
এই দুইয়ে দুইয়ে চার আর চারে চারে আটের ধারণাটুকু নিয়ে ফর্ম-টর্ম তুলে পরীক্ষায় বসে পড়া।

আর কিচ্ছু না, নাথিং। অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, আন্দাজ… কোনওটাই ছিল না।

পরীক্ষার দিন শুধু হাতে ছিল একটা সাদা খাতা আর প্রশ্নপত্র। আগাগোড়া অচেনা, অজানা, নতুন একঝাঁক প্রশ্নে… প্রশ্নও নয় ঠিক, যেন আলোচনায় সাজানো একফালি কাগজ। উত্তরপত্রে একটা উত্তরও ঠিক করে লিখতে পারিনি আমি। আই রিপিট, একটাও ‘উত্তর’ লিখতে পারিনি। কেবল প্রতিটা আলোচনায় নিজের মতো করে, এত দিন ধরে এত বই (সিলেবাসের নয়, গল্পের) পড়ে যা শিখেছি… ওগুলোও যে শেখা, তা প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার আগে বুঝিনি… সেই শেখাটুকু যেটুকু বলতে পারি, লিখতে পারি, এক্সপ্রেস করতে পারি….তার সবটা নামিয়ে আসা…।

পরীক্ষা ভাল হয়নি আমার। কিন্তু একটা পরীক্ষার খাতা শেষ করার পরে যে এত হাল্কা, এত তৃপ্ত লাগতে পারে… সেটা সেই দিন প্রথম বুঝেছিলাম…।
আর বুঝেছিলাম, একটা নির্দিষ্ট মাত্রার মেধা, বোধ, চিন্তাশক্তি,সৃজনশীলতা না থাকলে, সাহিত্যের প্রতি ভালবাসা না থাকলে, বইয়ের পাঠকে মুখস্থের বদলে আত্মীকৃত না করতে পারলে… হাজার পড়াশোনা করে আসার পরেও, কোটি কোটি নম্বর হাতে পাওয়ার পরেও, এই প্রশ্নপত্রে দাঁতফোটানো সম্ভব ছিল না…।

এর পরে ফলপ্রকাশ হল, আর বাকিটা….

না, ইতিহাস নয়। আমি কোনও ঐতিহাসিক চরিত্র হয়ে উঠতে পারিনি এখনও…। বাকিটা শুধুই আমার জীবন…। হয়তো আমার মতো আরও অনেকের জীবন…। আমি যে পড়তে পারি, বুঝতে পারি, বলতে পারি, লিখতে পারি, এক্সপ্লেন করতে পারি….. এগুলোও যে আমার পারা… এগুলো দিয়েই যে বিশ্বসাহিত্যের মতো একটা গুরুগম্ভীর বিষয় চর্চা করা যায়, তা কোনও দিনও জানা হতো না। নেভার…।

আমার তিয়াষ হওয়া হতো না…। ‘তিয়াষ’ হওয়াটা তেমন কোনও ব্যাপার, তা বলতে চাইনি। কিন্তু তিয়াষের জন্য তিয়াষই হওয়ার সুযোগ পাওয়াটা বা অরুণের গোপাল না হয়ে অরুণ হওয়াটা আবার বরুণের অরুণ না হয়ে বরুণ হওয়াটা অথবা কিরণমালার কিরণমালাই হয়ে ওঠার পথ খুঁজে পাওয়া অবশ্যই একটা ব্যাপার…। র‌্যাদার সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

আর সেই গুরুত্বপূর্ণ পথের শুরুয়াতে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকাল্টির বিভিন্ন বিভাগের এই প্রবেশিকা পরীক্ষাটা একটা পারফেক্ট দিকনির্দেশ…।

এই প্রবেশিকা পরীক্ষা নাকি উঠে যাচ্ছে…।

কাঁড়ি কাঁড়ি নম্বরধারীরা আর পাঁচটা কলেজের মতোই ইউনিভার্সিটির গেটে এসে গুঁতোগুঁতি করবে…।

যে মাছেরা দুর্দান্ত সাঁতার কাটে, আর যে বাঁদরেরা চড়চড়িয়ে গাছে চড়ে, তারাই সব সিট ভরাবে…।
আর যে মাছগুলো এত দিন জোর করে গাছে ঝুলে থাকার দরুণ তেমন নম্বর করতে পারেনি কিন্তু একটু জলের জন্য হাঁসফাঁস করেছে, অথবা যে বাঁদরগুলো জলে হাবুডুবু খেতে খেতে হাঁ করে তাকিয়ে থেকেছে গাছের দিকে….. তাদের জন্য বন্ধ হল বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা…।

আমার যাদবপুর আর কারও গাছ হবে না, জল হবে না…।

আমার যাদবপুর এবার থেকে নম্বরের কাঁচামাল দিয়ে আরও বেশি নম্বর উৎপাদনের কারখানা হবে মাত্র…।
তার পরে নম্বর-দূষণে ছেয়ে যাবে আমাদের ঝিলপাড়, আমাদের ওয়ার্ল্ডভিউ, আমাদের বিবিসি, আমাদের মিলনদা…।
নম্বরের মুখস্থভারে বুজে যাবে যাদবপুরের স্বতঃস্ফূর্ত মেধাবী কণ্ঠ…।

বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা, মেধা বিসর্জন দিয়ে, রাষ্ট্রের তৈরি করে দেওয়া নম্বরের কাঠামোয় আটকে থাকা এই যাদবপুর আমাদের কাছে একটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়…।

ভরসা আছে, ভাইবোনেদের ওপর…। ভরসা আছে অধ্যাপকদের শুভবুদ্ধির ওপর, ভরসা আছে শিক্ষাকর্মীদের ওপর…। আমার যাদবপুরকে ঠিক জিতিয়ে দেবেন ওঁরা, প্রতিবারের মতোই…।

আর আবার, বারবার আমায় বলার সুযোগ করে দেবেন…
আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্বিত প্রাক্তনী, তিয়াষ…।

ছবি: লেখক ও গুগল