ব্যোমকেশ বক্সী ও একজন ডাক্তার

হামিদ কায়সার

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়,ব্যোমকেশ লেখক

কবে যেন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার বিরতি পড়লো? ঠিক খেয়াল আসছে না। নক আউট পর্ব শুরু হওয়ার আগে বোধ হয়। সেদিনই হঠাৎ একটা ধাক্কা খেলাম। কী যেন নেই, কী যেন নেই। পড়তে ভালো লাগে না। লিখতে ভালো লাগে না। শুয়ে থাকতে ভালো লাগে না। হাঁটা-পায়চারি গান সবই অর্থহীন মনে হলো। রাতে দেখি ঘুমও উধাও। বিছানায় শুধু ছটফট করি। নিজেকে ভীষণ অসহায় বোধ হতে লাগল। শেষে মাথায় বুদ্ধি এলো আচ্ছা ব্যোমকেশ বক্সীর পরামর্শ নেওয়া যায় না? উনি তো জীবনে কতজনের কত সমস্যার সমাধান দিয়েছেন, কত রহস্যও খুঁজে বের করেছেন।
বিছানা ছেড়ে ব্যোমকেশ বক্সীর দরোজার টোকা দিলাম। আদর করেই বসালেন তার কাছে। খুলে বললাম সবকিছু। প্রশ্ন করলাম, কিছুই ভালো লাগছে না। কেনো? তিনি শুধু মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, আমার সঙ্গে যতক্ষণ ভালো লাগে থাকো। তারপর দেখি তোমার জন্য কী করা যায়! সেই থেকে সত্যান্বেষি ব্যোমকেশ বক্সীর সঙ্গে সময় কাটাতে লাগলাম। তারপর যখন আবার বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা শুরু হলো তখন পড়ে গেলাম আরেক বিপদে। ব্যোমকেশ বক্সীকে দেখি আর ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। খেলা দেখবো নাকি ব্যোমকেশ বক্সীর সঙ্গে নেব? দুটোই চলে একসঙ্গে। কিন্তু আমিতো আর সমাজের বাইরের কেউ নই। সমাজে কতকিছু ঘটছে! কোটা আন্দোলন নিয়ে নির্যাতন, চট্টগ্রামে রাইফার মুত্যু। এর মধ্যে আবার চট্টগ্রামে একসঙ্গে ডাক্তারি সেবা বন্ধের ঘোষণা! এসব তো ব্যথিত করবেই, আহত করে, নিজেকে কেমন অসহায় লাগে। আমার মনোকষ্ট বুঝতে পেরেই কিনা, ব্যোমকেশ বক্সী আমার সামনে খুলে দিল ওর ‘অগ্নিবাণ’-এর এক পৃষ্ঠা-‘ডাক্তার রুদ্রকে লইয়া হাবুল ফিরিয়া আসিল। ডাক্তার রুদ্র বয়স্থ লোক; কলিকাতার একজন নামজাদা চিকিৎসক। কিন্তু অত্যন্ত রূঢ় ও কটুভাষী বলিয়া তাহার দুর্নাম ছিল। মেজাজ সর্বত্রিই সপ্তমে চড়িয়া থাকিত; এমন কি মুমূর্ষু রোগীর ঘরেও তিনি এমন ব্যবহার করিতেন যে, তিনি না হইয়া অন্য কোনও ডাক্তার হইলে তাহার পেশা চলা কঠিন হইয়া পড়িত। একমাত্র চিকিৎসা-শাস্ত্রে অসাধারণ প্রতিভার বলে তিনি পসার-প্রতিপত্তি বজায় রাখিয়াছিলেন; এছাড়া তাহার মধ্যে অন্য কোনও গুণ আজ পর্যন্ত কেহ দেখিতে পায় নাই।
ডাক্তার রুদ্র-র চেহারা হইতেও তাহার চরিত্রের আভাস পাওয়া যাইত। নিকষ কৃষ্ণ গায়ের রং, ঘোড়ার মত লম্বা কদাকার মুখে রক্তবর্ণ দুটা চক্ষুর দুবির্ণীত আত্মম্ভরিতায় যেন মানুষকে মানুষ বলিয়াই গণ্য করে না। অধরোষ্ঠ্যের গঠনেও ঐ সার্বজনীন অবস্থা ফুটিয়া উঠিতেছে। তিনি যখন ঘরে আসিয়া ঢুকিলেন, তখন মনে হইল, মূর্তিমান দম্ভ কোট-প্যান্টালুন ও জুতা সুদ্ধু ঘরের মধ্যে আসিয়া দাঁড়াইল। হাবুল নীরবে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া ভগিনীর দেহ দেখাইয়া দিল। ডাক্তার রুদ্র স্বভাব-কর্কশ স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, কি হয়েছে, মারা গেছে?
ব্যোমকেশ বলিল, আপনিই দেখুন।
ডাক্তার রুদ্র তখন হাঁটু গাড়িয়া রেখার পাশে বসিলেন; মুহূর্তের জন্য একবার নাড়িতে হাত দিলেন, একবার চোখের পাতা টানিয়া চক্ষু-তারকা দেখিলেন। তারপর উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন, মারা গেছে। প্রায় দু’ঘন্টা আগে মৃত্যু হয়েছে। কথাগুলি তিনি এমন পরিতৃপ্তির সহিত বলিলেন- যেন অত্যন্ত সুসংবাদ শুনিবামাত্র শ্রোতারা খুশি হইয়া উঠিবে।
ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল, কিসে মৃত্যু হয়েছে, বলতে পারেন কি?
সেটা অটন্সি না করে বলা অসম্ভব। আমি চললুম- আমার ভিজিট বত্রিশ টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে দিও।’ বলিয়া ডাক্তার রুদ্র প্রস্থান করিলেন।

ছবি: গুগল