অপত্য

দেবদ্যুতি রায়

জানালার বাইরে থেকে আসা বাতাসটা নিজেও যেমন এলোমেলো, তেমনি এলোমেলো করে দিতে চায় বুঝি আশপাশ। ট্রেনের দুলুনিতে আর ঠান্ডা বাতাসে ঘুমঘুম পেতে থাকে রেণুর। জোর করে তাড়িয়ে দিতে চায় ঘুমটা- শচীন জেগে আছে, একটু আগে বলেছে, ঘুম আসছে না ওর, রেণু ঘুমালে একলা হয়ে যাবে বেচারা। রেণু পাশে তাকায়, শচীন তাকিয়ে আছে বাইরে- অন্ধকারে কী এত দেখে কে জানে। অবশ্য পুরো অন্ধকার বলা যাবে না, আবছা আলো আছে।

“এই”-আলতো ডাকে রেণু। পাশাপাশি দু’টি ‍সিটে বসেছে ওরা।

শচীন ফিরে তাকায়। প্রায় সব লাইট নেভানো ট্রেনের কামরাটার আবছা আলোয় শচীনের ধবধবে ফর্সা মুখ কি একটু ফ্যাকাসে লাগে? রেণুকে প্রায় অবাক করে দিয়ে ফিসফিস করে শচীন বলে,  “বিয়ের পর আমরা কখনো একসঙ্গে এতটা সময় বেড়াইনি, তাই না?”

এটা প্রশ্ন নাকি একটা জবানবন্দি বোঝে না রেণু, ফিসফিস করে বলা বোধহয় আশেপাশের ঘুমন্ত মানুষগুলোকে বিরক্ত না করার জন্য। ট্রেনের দুলুনিতে আসা ঘুমটা সরিয়ে দিতে দিতে ও একটু হাসে।শচীনের ডান হাতটা নিজের হাতে তুলে নেয় ও। তারপর শচীনের মতই প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে-“এই যে এখন যাচ্ছি।”

তারপর আবার চুপ। রেণুর ঘুম ঘুম ভাবটা কেটে যেতে থাকে। সত্যিই তো, কোথ্থাও বেড়াতে যায়নি তারা বিয়ের পরে দু’জনে মিলে। এই প্রথম! রেণুর নিজেরও কেমন ধন্ধ লাগে, এই প্রথম! সেই যে বিয়ে হলো, তারপর প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর কেটে গেল-আজ তারা দু’জনে মিলে প্রথম বেড়াতে যাচ্ছে। বেড়াতে?বেড়ানোর কথাটায় একটু খটকা লাগে রেণুর। এটা কি আসলে বেড়াতে যাওয়া? ভাবতে চায়, ছেলের বাসায় যাওয়াকে আসলে বেড়াতে যাওয়া বলা যায় কি না। একবার মনে হয়-হয়তো বলা যায়, রেণু ভাবে, ছেলে যখন আলাদা জায়গায় আলাদা থাকে, তখন দিন কয়েকের জন্য তার বাসায় যাওয়া তো বেড়াতে যাওয়াই হয়! ছেলে তাদের, ঠিক আছে, বাসা তো আর তাদের নয়।

“আমরা কেমন হুট করে বুড়ো হয়ে গেলাম, তপুর মা”- শচীনের শ্বাস কি একটু দীর্ঘ হয়? রেণুর চিন্তায় ছেদ পড়ে। তা বুড়ো একটু হয়েছে বটে তারা। চুলে পাক না ধরলে কি আর দাদু-দিদা হওয়া মানায়?

“বুড়ো না হলে তোমার নাতনি তোমাকে ‘ঐ বুড়া’ বলবে কী করে?”-মুচকি হাসে রেণু। “বুড়ো হওয়া কি খারাপ?”

বুড়ো হওয়া খারাপ কী ভালো, সে তর্কে ‍যায় না শচীন। নিজের আশেপাশে তাকায়-প্রায় সবাই ঘুমাচ্ছে, কেবল ঐ কোণার দিকে, ওরা কয়েকজন বন্ধু বোধহয়, জমাটি আড্ডা দিচ্ছে, কোনোদিকে মনোযোগ নেই। কী প্রাণোচ্ছ্বল ওরা! শচীনের ভালো লাগে। আজ এই বয়সে প্রথমবার নিজের স্ত্রীকে নিয়ে এতটা লম্বা পথ পাড়ি দিতে গিয়ে শচীনের কেমন যে লাগছে, নিজেই ধরতে পারছে না ঠিকমতো। এতগুলো দিন পর! এতগুলো মাস, এত্তগুলো বছর!তা্ই তো, মাঝখানে যে এতগুলো বছর কেটে গেছে-চাল, ডাল, তেল, নুন আর ছেলেমেয়েদের জামা, কাপড়, পড়ার খরচের হিসাবের মধ্যে তা এমনভাবে ধরা পড়েনি কখনো। বিয়ের পরে ওরা থাকতো যৌথ পরিবারে। বাবা-মা আর অতগুলো ছোট ছোট ভাইবোনের সংসারে শচীন রেণুকে নিজের মতো করে তেমন কিছুই দিতে পারেনি। তপু হওয়ার পরে নিজের সংসার হয়েছে ওদের, তা সেখানেও সময় সুযোগ হলো কই? দু’জনের চাকুরি আর পরপর চার চারটা ছেলেমেয়ে বড় করে তোলার ঝামেলায় নিজেদের আটপৌড়ে জীবন সামলাতেই ওদের হিমশিম খেতে হয়েছে। তারপর যখন ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে নিজেরটা নিজে করে নিতে শিখেছে, ঝাড়া হাত পা হয়েছে দু’জন, তখনো কেমন করে যেন চোখ এড়িয়ে গেছে বরাবর। আজকাল ওদের জীবন কাটে এক একঘেয়ে গতানুগতিকতায়। ছেলেমেয়েরা কেউ কাছে নেই-স্কুল থেকে রেণুর ফিরতে ফিরতে বিকেল, তারপর একটু হাত পা ছড়িয়ে গল্প করার সময়; সে সময়েও ফিরে ফিরে আসে ছেলেমেয়েদের কথা। নিজেদের জীবনে কী করা হলো আর কী হলো না, তার হিসাব মেলাবার সময় কই?

আজ এই মাঝরাতে, অন্ধকার ট্রেনের হালকা দুলুনি, এলোমেলো বাতাস আর ঘুমন্ত সহযাত্রীদের ভিড়ে একলা হওয়ার পরে তবে জীবনের হিসাব নিকাশগুলো চোখের সামনে উঠে এলো! শচীন আবার বাইরে তাকায়, দু’এক দিন আগেই বোধহয় পূর্ণিমা হয়েছে, খানিক ক্ষয়াটে চাঁদের ঈষৎ হলদেটে আলোয় রেললাইনের ধারের ফসলি জমিগুলো কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে। আবার নিজের জীবনে পেছন ফিরে তাকায় ও-বলতে গেলে প্রায় সবটা পথই পেরিয়ে এসেছে শচীন। বয়স তো কম হলো না, তেরো বছরের রেণুর সঙ্গে যখন ওর বিয়ে হলো তখন ও রীতিমতো বত্রিশ। সেই সময়ে এবং অবশ্যই মহেশপুর গ্রামের ছেলে হিসাবে বয়সটা ছিলো দস্তুরমতো বেশি। রেণুর বাবা তাঁর মেয়েটার জন্য সৎ বংশের শিক্ষিত এবং চাকুরিজীবী জামাই খুঁজেছিলেন বলে বয়সটার হিসাব ধর্তব্যের মধ্যে আনেননি। লোকে অবশ্য বলতে ছাড়েনি রেণুর গায়ের শ্যামলা রঙের জন্যই রমেশ মাস্টার বাধ্য হয়ে শচীনের মত বয়স্ক জামাইকে ধরে এনেছেন। এমনকী নতুন জামাইয়ের সঙ্গে যখন দেখা হয়েছে, কেউ কেউ হেঁ হেঁ করে হেসে বলেও ফেলেছে-“তোমার দুইঝনোক মানাইছে ভালো, বাবা। এনুটার তো কালা অংগের জইন্যে জামাই পাওয়া গেছিলো না। তা তোমরা মাস্টার মানুষ, ভালোয় হইছে, ছওয়াটা ছোট হইলেও সমস্যা হইবে না। তোমার তো ছোট ছওয়ারঘরোক পড়েয়া অইব্যাস আছে।”

নতুন জামাই, লজ্জ্বায় কিছু বলতে পারতো না শচীন কিন্তু অবাক হয়ে ওর মনে হতো, পাড়ার লোকে রেণুর শুধু গায়ের রঙটাই বা দেখে কেন, ওর দূর্গা প্রতিমার মতো মুখশ্রী কারো চোখেও পড়ে না?

সেসব বহু দিন আগের কথা। আবার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়তে যায় শচীনের আর তখনই টের পায় ট্রেনের গতি কমে আসছে ধীরে ধীরে, তার মানে সামনে কোন একটা স্টেশন। ক’টা স্টেশন পার হলো, মনে পড়ছে না। শচীনের সামনের সিটের লোকটা একবার চোখ কচলে নড়েচড়ে বসে, এপাশ ওপাশ তাকিয়েই আবার বন্ধ করে চোখ, মাথা এলিয়ে দেয় পেছনে।

তপু বলে দিয়েছে ওরা পাঁচটার কাছাকাছি সময়ে পৌঁছে যাবে কমলাপুরে। সেই কমলাপুর, শিক্ষকদের একটা সম্মেলনে এসেছিলো বিয়ের আগে, তারপরে এই ঢাকা আসা-রেণু তো প্রথমবার। আজকাল গার্মেন্টসের কাজ আর রিকশা চালানোর সুবাদে ওদের গ্রামের গরীব মানুষগুলোও হরহামেশাই ঢাকায় আসছে-কেবল ছেলে আর বৌয়ের হাজার অনুরোধের পরেও আসা হয় না ওদের। এবারও আসা হতো কী না কে জানে, কেবল সাত মাসের নাতনিটার জন্যই যে এবারের ঢাকায় আসা, তা কাউকে মুখফুটে না বললেও মনে মনে সবাই বুঝেছে। না হলে যে শচীন মাস্টার চাকুরি ছাড়ার পর থেকে দু’দিনের জন্যও কোথাও যেতে রাজী হয় না, এমনকী পাশের জেলায় বড় মেয়ের বাড়িতে গেলেও দু’রাত পার করে না, সেই মানুষ কি না নিজে থেকেই রেণুকে বলে বসলো- “তোমার গরমের ছুটি হলে চলো তো একটু ঢাকা ঘুরে আসি। সেই একবার গেলাম, আর তুমি তো যাওইনি কখনো।”

শুনে সেদিন একটু মুচকি হেসেছিলো রেণু মনে মনে। কেন যে হঠাৎ শচীন মাস্টারের ঢাকা যেতে ইচ্ছে করলো সেই একবারের পরে, ওকে বলে দিতে হয়নি। তবে স্কুলের ছুটির প্রথম সপ্তাহে বাড়িঘরের কাজ মোটামুটি গুছিয়ে আজ ওরা সত্যি সত্যিই ঢাকার ট্রেনের সেকেন্ড ক্লাসে উঠে বসলো; ট্রেনেই, বাসে নয়, কারণ রেণু একটু মিষ্টি হেসে বলেছিলো- “একবারও তো ট্রেনে চড়িনি আমি, চলো না, বাসে না গিয়ে ট্রেনেই যাই।”

তাই সই। শচীনেরও ট্রেনেই সুবিধা, বয়স হয়েছে, বাথরুমটা ঘনঘনই যেতে হয় আজকাল। আর ট্রেনে ‍চড়ার একটা আলাদা আনন্দও আছে বৈকি। বহুকাল চড়াও হয় না ট্রেনে, কোথায়ই বা যাওয়া হয় আজকাল! ভাগ্যিস ট্রেনে এসেছে, শচীনের মনে হয়, এই ট্রেনটার ঝিকঝিক শব্দ, হালকা দুলুনি আর আবছা অন্ধকার রাতে সিটে বসেও এই যে ছুটে চলা, এও তাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে একটা গতি এনে দিচ্ছে।

থেমে থাকা ট্রেনটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছে আবার। মোবাইল বের করে বোধহয় সময় দেখে রেণু, শচীনের দিকে তাকিয়ে বলে-“তিনটা বাজে, আর বেশি দেরি নাই।” হ্যাঁ, বেশি দেরি নেই আর, ঘন্টা দু’য়েকের কিছু আগে পরে পৌঁছে যাবে ওরা কমলাপুরে, ওখানে গাড়ি নিয়ে থাকবে তপু।অত সকালে নাতনিটা কি আসবে?

রেণু একটু পাশে ঘেঁষে আসে এবার, মৃদুস্বরে বলে- “তপুরও মেয়ে হয়ে গেলো, কী অদ্ভুত না?”

সহসাই শচীনের মনে প্রায় তেত্রিশ বছর আগের ছবি ভেসে ওঠে। প্রথমবার তপুকে যখন কোলে নিয়েছিলো ও, নরম তুলতুলে ছোট্ট মানুষটাকে নিয়ে কী করবে, বুঝেই উঠতে পারছিলো না। আর সেদিনই বুঝতে পেরেছিলো, প্রথম সন্তান জন্মের পরে সব বাবারই বোধহয় একটু লজ্জ্বা লাগে।

আরো কত কত ছবি ভেসে ওঠে চোখের সামনে এক এক করে। নরম তুলতুলে শরীরের ছোট্ট এক দেবশিশুকে কোলে করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে শচীন, বারান্দার কোণে চাটাইয়ে তোলা আঁতুড়ের দরজা দিয়ে শেষ সন্ধ্যার আলোতে রেণুর শীর্ণ হাসিমুখ, কী সুন্দর! আজও এই এতদিন পরে হঠাৎ সবকিছু ঠিকঠাক মনে পড়ে যায় শচীনের, ওর ঠোঁটের কোলে হালকা একটু হাসির রেখা ছুঁয়ে যায়, এক নিশ্বাসের দূরত্বে বসা রেণুর ঠোঁটেও কি চিলতে হাসি? শচীন ঠাহর করতে পারে না। বাইরে ঘোলাটে চাঁদের আলো আর কামরার আবছা অন্ধকারে বহুকাল আগের এক আশ্চর্য সন্ধ্যায় হারিয়ে যাওয়া দু’জন মানুষকে নিয়ে ট্রেন ছুটে চলে আগের মতোই, অবিরাম।

ছবি: সজল