হয়তো সংজ্ঞা পাল্টানোর এক বিশ্বকাপ

লুৎফুল হোসেন

দেখতে দেখতে চার বছরের জমানো উত্তেজনার একটা মাস এসে পৌঁছে গেলো শেষ সীমানায়। বিশ্ব জুড়ে ফুটবল জ্বর কাঁপিয়ে-ছাপিয়ে পৌঁছে গেছে শেষ দিনে। সব আশা আকাঙ্ক্ষা উত্তেজনা, জল্পনা কল্পনা, আর ভবিষ্যৎ গণনার হিসাব ও অনুমান জলাঞ্জলি দিয়ে, কোটি কোটি মানুষের মনের ইচ্ছে প্রদীপে জল ঢেলে ফুরিয়ে গেলো বলে শীর্ষ এক উৎসবের আলো।

বিশ্বসেরা তারকা মেসি, রোনাল্ডো, নেইমার কিংবা তাদের দল আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল অথবা দলীয় বিবেচনায় সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ব্রাজিল, ইংল্যাণ্ড, স্পেন, জার্মেনি, আশাজাগানিয়া বেলজিয়াম সব ছাপিয়ে তারকাখচিত তারুণ্যনির্ভর ফ্রান্স আর তারকা তকমায় পিছিয়ে থাকা সেরা মধ্যমাঠের চমক ক্রোয়েশিয়া মঞ্চের সব আলো দখল করে এখন দাঁড়িয়ে আছে পাদপ্রদীপের নিচে।

আফ্রিকার দলগুলো আশানুরূপ নৈপুণ্যে মাতাতে না পারলেও মুসা, মিকেল, মোসেস মাঠ মাতিয়েছে। ভালোই খেলেছে এশিয়ার দেশ কোরিয়া। সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে মাপা ছকের দুর্দান্ত ফুটবল দিয়ে এবারের আসর মাতিয়ে দিয়েছে জাপান।

তারকা ফুটবলারদের পতন আর অঘটনের এই বিশ্বকাপে তারকাদের মুখ ঢেকেছে বিজ্ঞাপনে। ব্যার্থতায় বারবার জার্সি টেনে যেভাবে মুখ ঢাকতে হয়েছে তারকাদের, তাতে তাদের নামের প্রতি সুবিচারের বদলে জার্সিতে নাম আর প্রখর সব জার্সি নম্বরের চাদরে বিপণন আর বানিজ্যিক ফুটবলের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে সব একে একে। একমাত্র রোনাল্ডো পর্তুগালের প্রথম খেলায় একাই দলকে টেনে নিয়ে যাবার মতো এক অসম্ভবের ইঙ্গিত দিলেও তা পেরে ওঠেননি। সাম্পাওলির অতীত অর্জনের ছায়াটিও ছিলো এবার অনুপস্থিত। পেরে ওঠেননি ল্যাটিন ফুটবলের নান্দনিকতার সঙ্গে ইউরোপীয় ফুটবলের ধারের মিশেল ঘটাবার কুশলী তিতেও।

আসলে বছরের পর বছর ধরে ক্লাব ফুটবলে তারকা হয়ে ওঠা ফুটবলাররা খেলেন যে ধাঁচে, নকশায় ও রীতিতে বিশ্বকাপের মঞ্চ তা থেকে বলতে গেলে পুরোপুরিই ভিন্ন। এই আসরে হেরে গিয়ে ফিরে আসবার সুযোগ নেই বললে চলে। ক্লাব পর্বের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যা সম্ভব। তার ওপর পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা খেলোয়াড়দের নিয়ে এক সূত্রে জ্বলজ্বলে একখানা মালা গাঁথাটা ভীষণ কঠিন এক কাজই বটে। তার উপর ওয়ান টাচ এবং গতি ও শক্তির ইউরোপীয় ফুটবলের দাপটে নান্দনিকতা বা শৈল্পিক ফুটবল দেখাবার ফুরসত বিশ্বকাপে এক অর্থে নেই-ই। কিংবা হয়তো নান্দনিকতার সংজ্ঞাটিই বদলে যাচ্ছে ফুটবলে।

সর্বোপরি টিম গেম এবং প্রতি খেলায় প্রতিপক্ষ অনুযায়ী খেলবার পন্থাটি যথাযথ আবিষ্কার করা, সে অনুযায়ী নানান ছক কষে শেষমেষ মাঠে সেটার বাস্তবায়ন ঘটানো। পুরো টিমের খেলোয়াড় কোচ ফিজিও সবার অত্যন্ত কঠিন মেধা, শ্রম আর সৌভাগ্য-বরের হাতে আবর্তিত। তার উপর আছে কখনো কখনো বিরক্তিকর রক্ষণাত্মক ও মারদাঙ্গা ফুটবলের দৌরাত্ব। সেই সব বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে শেষতক ওই ঘরানার ইউরোপীয় দলই টিকে আছে মঞ্চ দখল করে। এখন অপেক্ষা জানার। গতি ও কৌশলে দৃষ্টিকাড়া আগুয়ান এমবাপে, গ্রিজম্যান, জিরুডের দল নাকি মধ্যমাঠের অভিজ্ঞ মাস্টার লুকা মডরিচ, ইভান রাকিটিচের দল শেষ হাসি হাসবে সোনার শিরোপা দখল করে।

মেক্সিকো, উরুগুয়ে ভালো খেললেও নান্দনিক খেলার আলোয় সেভাবে জ্বলে উঠতে পারেনি কোনো ল্যাটিন দল এই বিশ্বকাপে। পাওয়ার আর স্পিডের ইউরোপীয় ফুটবল দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করেছে এবারের আসরে। জার্মানি স্পেন-এর মতো দলকেও ঝরে পড়তে হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে অনেক আগে। কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল ও উরুগুয়ে ছাড়া বাকী ল্যাটিন দল।

কোয়ার্টারে বুক ভেঙ্গেছে উরুগুয়ে, ব্রাজিল, সুইডেন আর স্বাগতিক রাশিয়ার। অল ইউরোপিয়ান সেমিতে ফ্রান্সের কুশলী ফুটবলের কাছে এক গোলের হার মানতে হয়েছে লড়াকু লুকাকু আর হ্যাজার্ডের দল বেলজিয়ামের। অন্য সেমিতে বুক ভেঙেছে অতি উচ্চ আশাবাদের চূড়ায় পৌঁছে যাওয়া ইংল্যাণ্ডের। তৃতীয় স্থান নির্ধারণীর আনুষ্ঠানিকতায় হ্যাজার্ডের বেলজিয়াম দুই গোলের জয়ে নিজেদেরকে তারকাখচিত ইংলিশদের চাইতে শ্রেয়তর প্রমাণ করেছে অনায়াসে।

নাটকের শেষ অঙ্কে গাণিতিক হিসাব ফ্রান্স এগিয়ে। মধ্যমাঠের ম্যাজিক ফুটবল উপহার দেয়া ক্রোয়েশিয়া কোটি মানুষের আবেগ দখল করে শিরোপার দাবিদার নিঃসন্দেহে।

এবারের ফাইনালিস্ট হয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্ব রেকর্ডের খাতায় নাম লিখিয়েছে ক্রোয়েশিয়া । সেই খাতায় আরো কিছু জুড়ে দিয়ে অঘটনের বিশ্বকাপে যুগ যুগান্তরের সেরাদের বৃত্ত ভেঙ্গে নতুন কোনো দেশ নিতে পারবে কি সোনার কাপ? সেটাই বিশ্ববাসীর কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রসঙ্গ, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অপেক্ষা শুধু ঘন্টার। মিলে যাবে সব উত্তর। মিলে যাবে উত্তর, ২০১৮এর আসর বিশ্বকাপের ইতিহাসে হয়ে উঠতে পারে কতোটা নতুনত্বের নির্মাতা!

বানিজ্যের একাধিপত্যের এই যুগে জয়ী হোক ফুটবল। জয়ী হোক ফুটবল প্রেম। জয়ী হোক উদ্দীপ্ত ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।

ছবিঃ ফক্স নিউজ, ফিফা