দ্য জাঙ্গল বুক : বাচ্চাদের গল্প, ভাল লাগবে বড়দেরও

Jungle-Book-Remake-Detailsবাবলু ভট্টাচার্য : মোগলির অ্যা়ডভেঞ্চার ‌থ্রি-ডি স্ক্রিনের ‘বাস্তবতা’য়। যেখানে পরিচালক জন ফ্যাভেরু নেহাত একটা মিষ্টি গল্প বলেননি।

গানটা যদি শের খান গাইত? কতটা হাড় হিম করা শোনাতে পারে সেটা, আন্দাজ করা যাচ্ছে নিশ্চয়ই? জন ফ্যাভেরু’র ‘দ্য জাঙ্গল বুক’-এর গোটা আবহ ততটাই ‘ডার্ক’। সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে শেখে এক মানবশিশু- মোগলি। মৃত্যুর রং ডোরাকাটা হলুদ। নাম শের খান। বাঁচার লড়াই কার কাছে শেখে মোগলি? নেকড়ে বাঘের দলের কাছে! ব্ল্যাক প্যান্থারের কাছে! জঙ্গলের বাসিন্দাদের সঙ্গে মোগলির তুমুল বোঝাপড়া। এই গোটা ব্যাপারটাকেই ইংরেজি ভাষায় অনুধাবন করেছিলেন রুডইয়ার্ড কিপলিং। আর ডিজনির দ্বিতীয় ‘জাঙ্গল বুক’-এর সফরটাকে গা ছমছমে অ্যাকশনে ভরপুর করে পর্দায় এনেছেন ফ্যাভেরু।

যে গানটা দিয়ে এই লেখার শুরু, সেই ‘অ্যান্থেম’টি ভারতীয় চ্যানেলে শোনা যেত নব্বইয়ের দশকে। জাপানি অ্যানিমেশনে ভারতবাসী অন্তত ওই সময়ই সবচেয়ে বেশি পরিচিত হয়েছে মোগলির অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে। রঙিন, অনাবিল সব ছবি দিয়ে গ্রাফিক বোর্ড সাজাতেন নির্মাতারা। ছবিতে সেই গানের ব্যবহার নেই। বাড়তি রঙের ব্যবহারও নেই। বরং অনেক আঁধারি রয়েছে ছবির গায়ে-বহরে। কী রকম…?

ছবির প্রথম দিকেই দেখানো হয় জঙ্গলে প্রবল গ্রীষ্মে সব প্রাণীদের মধ্যে ‘জল চুক্তি’ (ওয়াটার ট্রুস) হয়েছে। মানে, আক্ষরিক অর্থে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খাওয়ার দশা! সেই সময় শিকার করতে নেই, শের খানও জানে! তবু পাথরের খাদানে জমা জল খেতে আসা সব পশুর সামনে শের খান (ইদ্রিস এলবা) মোগলিকে (নীল শেট্টি) শাসিয়ে যায় দিব্যি। মানুষ-ছানার গন্ধ তাকে উন্মত্ত করে দিয়েছে বলে সে চড়া হুমকি দেয় এই বলে, যে প্রতিশোধ তাকে নিতেই হবে। মোগলির মতোই একজন মানুষ, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আহত করেছিল তাকে। এবার শের খান মোগলিকে মেরে বদলা নিতে চায়! তার এই চাওয়ার মধ্যেও ‘টেরর কোশেন্ট’ যথেষ্ট রেখেছেন পরিচালক।

তার সঙ্গে প্রায় প্রতি সিকোয়েন্সে একবার করে মনে করিয়ে দিয়েছেন, জঙ্গলের একটা আইন আছে। সেই আইন যে মানে না, তার অস্তিত্ব সংকটময়। আবার জঙ্গলের একটা হৃদয়ও আছে। যার মন্ত্র হল, বন্ধুত্ব-স্নেহ-ভালবাসা আইন দিয়ে হয় না। এই দু’নিয়মের দুই পিঠের একদিকে শের খান। আরেকদিকে মোগলি। এবং চিরকালীন ভালমন্দের জঙ্গুলে দ্বন্দ্ব! মোগলিকে বড় করেছে বাঘিরা (বেন কিংগসলে), নেকড়ে সর্দার আকিলা (জিয়ানকার্লো এসপোসিতো) এবং নেকড়ে-মা রক্ষা (লুপিটা এনইয়ঙ্গো)। সিজিআই’তে তাদের বিভিন্ন অনুভূতি অসামান্য ফুটিয়েছে ‘অ্যাভাটার’ বা ‘লাইফ অফ পাই’-এর টেকনিক্যাল টিম!

কিন্তু ‘জাঙ্গল বুক’এর ভালমন্দের দ্বন্দ্বটাকে অত সাদা-কালো করে ফ্যাভেরু দেখাননি। বরং নব্বইয়ের দশকে যারা রঙিন অ্যানিমেশনে ‘জাঙ্গল বুক’ দেখেছে, যারা এখন সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক— তাদের জন্যই বোধহয় ফ্যাভেরু বানিয়েছেন এই পরদা-গল্প! দু’দশক পরে দুনিয়াটাও যে বদলে গিয়েছে। মৃত্যু এখানে রোজকার সত্যি ঘটনা। নাগরিক-অরণ্যেও খাদ্য-খাদক সম্পর্কের ব্লু-প্রিন্ট বসে গিয়েছে ডিএনএ’তে! সেখানে ‘ডার্ক টোন’ না আনলে গল্পের জোর থাকবে কী করে!

jungle-book-2016-posters-mowgli-baloo

গল্প কিন্তু শুরু থেকেই গতিময়। ভিস্যুয়াল-ও। ব্ল্যাক প্যান্থারের কাছে ক্ষিপ্রতার ট্রেনিং পেয়েছে যে মানুষের বাচ্চা, তার গতি যতটা তুফানি হতে পারে, সাউন্ড এবং মোশনে ততটাই ধরা প়ড়েছে পর্দায়। স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গে রয়েছে থ্রি-ডি বাস্তবের অতিকায়তা! কিন্তু যেখানে গল্পটাকে বলার জন্য চিত্রনাট্যে স্থিতি দরকার, সেখানেও মাত্রাটা সমান নিয়ন্ত্রণে।

মোগলির ভূমিকায় নীল শেট্টির আদুরে অভিনয় মন কেড়ে নেবে। গ্রাফিক ডিটেলিংও তুখড়় ছবির। যেভাবে লস অ্যাঞ্জেলেসের স্টু়ডিও হয়ে গিয়েছে মধ্যপ্রদেশের গহীন অরণ্য, কিংবা বুনো মহিষের পিঠে চড়ে শের খানের কবল থেকে বাঁচতে গিয়ে যেভাবে পাহাড়ি ধসের মুখোমুখি হয় মোগলি— তার সবটাই গ্রাফিক বিবরণে খুব জীবন্ত! ‘লাইভ অ্যাকশন’ শব্দটার আক্ষরিক সেলুলয়েড অনুবাদ করেছেন যেন পরিচালক।

ছবির দ্বিতীয়ার্ধে বিনোদন জমাটি! বালু (বিল মারি) পর্দায় আসার পর আঁধারি নৃশংসতার বাইরে কিছুটা হাসির খোরাকও পাওয়া যায় গল্প থেকে। ‘বেয়ার নেসেসিটিজ’ গানটাও রয়েছে ছবিতে। গোরিলা-সম্রাট কিংগ লুইয়ের (ক্রিস্টোফার ওয়াকেন) ‘মর্কট’পনাতেও মজাই পাবেন দর্শক। তার কাছে ক্ষমতার হিসেবটা স্পষ্ট। কী সেটা? মানুষের মতো শিখে নিতে হবে আগুনের ব্যবহার! তাতেই সে হয়ে উঠবে অপ্রতিরোধ্য! প্রকাণ্ড ভাঙা মন্দিরে বাঁদর-বেবুন-গোরিলাদের ‘আই ওয়ানা বি লাইক ইউ’ গানের সঙ্গে প্রায়-তাণ্ডবনৃত্যও ফিরিয়ে আনবে নস্ট্যালজিয়া! রয়েছে কা’এর (স্কারলেট জোহানসন) সঙ্গে মোগলির প্রথম মোলাকাতও। যদিও স্কারলেটের হিসহিসে কণ্ঠ বেশ কম সময়ের
জন্যই শোনা যায় ছবিতে— প্রত্যাশা বেশি থাকা সত্ত্বেও!