সেই আমার প্রথম রাত জাগা, সেই আমার প্রথম বিশ্বকাপ

সৈয়দ গাউসুল আলম

১৯৮২ সালের কথা। আমার বয়স তখন ৮ অথবা ৯ বছর। মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে থাকি। একটা ছোট্ট দুই বেড রুমের টিন শেডের বাড়িতে, আমরা চারজন, আমি, বাবা, মামণি আর ছোট বোন। আর হ্যাঁ, সঙ্গে কমপক্ষে দুজন স্থায়ী মেহমান, বগুড়া থেকে আগত। বাবা সরকারী চাকুরী করেন, মাসে ২০ তারিখ পর্যন্ত মোটামুটি চলে যায়, তারপর শুরু হয় টানাটানি। কিন্তু তাতেও খুব একটা সমস্যা নেই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে দশ পা হেটে ডানে মোড় নিলেই খলিলের দোকান এবং সেখানে বাকির খাতা খোলাই আছে। মাসের ২০ তারিখের পর থেকেই, সেই বাকির খাতায় পূর্ণ স্বাধীনতা। আমার জিব লাল করা টফি থেকে শুরু করে হঠাৎ এসে হাজির হওয়া বাবার বন্ধু আর বন্ধুর বউ এর জন্য রান্না করার পোলাওয়ের চাল-সবকিছুর জন্যই সদা উন্মুক্ত খলিলের দোকানের বাকির খাতা। বাঙালি মধ্যবিত্ত এক আজব চিড়িয়া, নিজের পকেটের টাকা শেষ হওয়ার পর মাসের কুড়ি তারিখের অপেক্ষাতেই যেন বসে ছিল, কবে খুলবে সেই বাকির খাতা, তারপর যেন আর চিন্তা নেই। অনেক সময় নতুন মাসেও পুরো বাকির হিসাব চুকানো যেতো না। তখন অপেক্ষা করে থাকতে হতো বাবার ট্যুরের জন্য। অফিসের কাজে বাবা ট্যুরে যেতেন, আর কোন রকমে টি,এ (ট্রাভেল এলাউন্স) ডি,এ (ডেইলি এলাউন্স) থেকে টাকা বাঁচিয়ে খলিলের দোকানের টাকা শোধ হতো। মধ্যবিত্তের জীবন বলে কথা- বেহিসাবি জীবনে স্বপ্নের মধ্যে বাঁচা।

সেটা ছিলো মে মাস। হঠাৎ দেখি পাড়ার বড় ভাই, স্কুলের বড় ভাই, এমনকি বাড়িতে বাবার সঙ্গে তার বন্ধু-বান্ধবদের শুধু ওয়ার্ল্ডকাপ ফুটবল নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। এখনকার মতো এতো ফ্ল্যাগ দেখা যেতো না বটে, তবে উত্তেজনার কোন কমতি ছিল না। আমিও কিছু না বুঝেই মহা উত্তেজিত। বাবার বাধ্য ছেলের মতো আমিও হয়ে গেলাম ব্রাজিল সমর্থক। বাঙালি মুসলমানের ধর্ম আর বিশ্ব কাপের ফুটবল দল, বাবার পছন্দেই নির্বাচিত হয়। সময় ঘনিয়ে এলো, জুন মাস, ক’দিন পরেই ওয়ার্ল্ড কাপ, চারিদিকে সাজ সাজ রব কিন্তু আমাদের বাড়ীতে টিভি নেই। ওদিকে বাবা গত তিন মাস ধরে অফিসের কাজে তুমুল ব্যস্ত, খেলা কিভাবে দেখবো, সেটা জিজ্ঞাসা করার সুযোগ কিংবা সাহস কোনটাই নেই। ওয়ার্ল্ড কাপ শুরু হওয়ার আর পাচ দিন বাকি, হঠাৎই ঘর আলো করে, আমাকে অবাক করে দিয়ে বিকেলবেলা হাজির হলো আমাদের বাড়ীর প্রথম টিভি, ফিলিপস এর ২০ ইঞ্চি সাদা-কালো। বাবা নিয়ে এলেন, তার গত ছয় মাসের ট্যুরের টাকা জমিয়ে, কম খেয়ে, কম ভাল জায়গায় থেকে ছেলেমেয়ের জন্য টি, ভি নিয়ে এলেন অতি সাধারণ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম।
টিভি এলো, ছাদে এন্টেনা লাগলো, বিকেল করে আমাদের ‘থাণ্ডার ক্যাটস’ দেখা হলো কিন্তু আমি পড়লাম দুশ্চিন্তায়- ওয়ার্ল্ড কাপ, আর মাত্র দুদিন বাকি। সমস্যা হচ্ছে, আমার রাত জাগার অনুমতি নেই। নেই মানে নেই, মা’র কড়া নির্দেশ, বাচ্চা’রা এতো রাত জাগে না। তার উপর রাত দু’টা, আড়াই’টা পর্যন্ত জেগে থাকা, অসম্ভব। মা’র কাছে গিয়ে দু,একবার ঘ্যান ঘ্যান করেছি, সুবিধে হয়নি। এর মধ্যে ওয়ার্ল্ড কাপ শুরু হয়ে গেলো, পাশের ঘরেই খেলা চলছে আর আমি দু চোখ জলে ভাসিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ছি। তারপর এলো সেই রাত, আর কয়েক ঘণ্টা পরেই শুরু হবে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে, আর আমি দেখতে পারবো না।

আমার বুক ফেটে কান্না আসছে, কিন্তু আমার কিছুই করার নেই। রাতে খাওয়ার টেবিলে মুখ কালো করে খাচ্ছি। বাবা বোধহয় লক্ষ্য করে ছিলেন, আর এর আগেও যে খেলা দেখতে চেয়ে বায়না করে মা’র বকা খেয়েছি, তা উনি জানতেন। বাবা খুব তাড়াতাড়ি খেতেন, সে নিয়ে আরো মজার মজার গল্প আছে, পরে বলবো। আমি মন খারাপ করে খাচ্ছি, বাবার খাওয়া শেষ। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কি শাওন, আজকে তো ব্রাজিলের খেলা, দেখবে না কি?’ আমি তো চমকে উঠলাম। কিছু বলবার আগেই মা বলে উঠলেন, ‘ছোট মানুষ, কাল স্কুল, এতো রাত জেগে খেলা দেখার দরকার’টা কি? আমি মা’র দিকে রাগে দুঃখে, কাঁদো কাঁদো চেহারা করে তাকালাম। ওইদিক থেকে বাবা বললেন, ‘হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা তো শেষ, শখ করেছে, দেখুক আজকের খেলাটা।’ আমি সব ভয় দুঃখ ভুলে চীৎকার করে উঠলাম, আমার কাণ্ড দেখে তখন মা’র মুখেও হাসি। তারপর আর কি, সেই মূহুর্ত উপস্থিত। সাদা-কালো টি,ভি তে ব্রাজিলের হলুদ জার্সিও সাদা-কালো। সক্রেটিস দৌড়াচ্ছে, জিকো দৌড়াচ্ছে, আমিও দৌড়াচ্ছি। নিয়মের কাঁটাতার পেরিয়ে অনিয়মের রাজ্যে দৌড়, ডি বক্সের বাইরে থেকে এডারের জোরে কিক, গোওওওওল!!!!!!! রাত দুটো-আড়াই’টা বাজে, আমি লাফাচ্ছি, বাবা চীৎকার করছে, পুরো পাড়াজুড়ে চীৎকার। সেই আমার প্রথম রাত জাগা, সেই আমার প্রথম বিশ্বকাপ।

এবারো আজ বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখবো, আমি আর রাজর্ষি। ব্রাজিল নেই, আর বাবা নেই। আমার এই প্রথম বিশ্বকাপের গল্প’টা ক’দিন আগেই রাতে শুয়ে রাজর্ষিকে বলছিলাম। গল্প বলা শেষ হওয়ার পর রাজর্ষি বেশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলো, তারপর আস্তে করে আমার দিকে ঘুরে বাঁ হাত’টা আমার বুকের উপর দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। হঠাৎই যেন মনে হলো, বাবা বুঝি পাশেই আছেন।

ছবিঃ ফক্স নিউজ