গোল্ডেন বুকার পেলো ইংলিশ পেশেন্ট

মাইকেল ওনদাতশি-র বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘দি ইংলিশ পেশেন্ট’।  ১৯৯২-এ প্রকাশিত যে বই চলতি সপ্তাহে জিতে নিল বুকার প্রাইজ়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে আয়োজিত ‘গোল্ডেন বুকার’ সম্মাননা। নিজের বইকে ‘কমপ্লিকেটেড’ বিশেষণ দিয়েছেন খোদ ওনদাতশি-ই। যে বইয়ের সৌজন্যে তাঁর আবিশ্ব খ্যাতি, তার জন্মকথাপ্রসঙ্গে বলেছেন নিজের জীবনের গল্পও। সারা জীবন পাল্টে পাল্টে গিয়েছে তাঁর নিজের ঠিকানাও। শ্রীলঙ্কায় (তখন সিংহল) জন্মতাঁর, ডাচ-সিংহলি-তামিল রক্ত তাঁর ধমনীতে। শৈশবেই মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে যায়। মা ফিরে চলে যান ইংল্যান্ডে। এগারো বছর বয়সে কিশোর মাইকেলও পাড়ি দেন বিলেত। সে যাত্রা ছিলো নিঃসঙ্গ। লন্ডনে গিয়ে কিছুদিন লেখাপড়ায় মন দিয়েছিলেন ওনদাতশি। কিন্তু আবার ঘটে বাড়ি বদল। চলে যান কানাডা।

মাইকেল ওনদাতশি

কলেজে সাহিত্য পড়াতে পড়াতেই মনের মধ্যে তৈরী হয়ে যায় ‘দি ইংলিশ পেশেন্ট’, কিন্তু ছাত্র-পড়ানোর পাশাপাশি উপন্যাস লেখার কাজ এগিয়ে নিতে পারছিলেন না ওনদাতশি। দুটোকে একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। যে দিন মন বলল, এ ভাবে চললে বইটাকে ছাড়তে হবে, সে দিন চাকরি ছাড়লেন। কাজের শেকল থেকে মুক্তি এনে দিল বহুকাঙ্ক্ষিত লেখনী। বাকিটা তো ইতিহাস!

১৯৬৮-তে যাত্রা শুরু বুকারের, ২০১৭ অবধি মোট ৫১ জন পুরস্কারজয়ীর ৫১টি বই ফিরে পড়েছিলেন পাঁচ বিচারক। তার পর বেছে নিয়েছিলেন পাঁচ দশকের ‘সেরা পাঁচ’ বই: ভি এস নইপলের ‘ইন আ ফ্রি স্টেট’, পেনিলোপি লাইভলি-র ‘মুন টাইগার’, ওনদাতশি-র ‘দি ইংলিশ পেশেন্ট’, হিলারি ম্যান্টেল-এর ‘উল্ফ হল’ আর জর্জ সন্ডার্স-এর ‘লিঙ্কন ইন দ্য বার্ডো’। সলমন রুশদির ‘মিডনাইট’স চিলড্রেন’ ১৯৮১ সাল ছাড়াও বুকারের ২৫ ও ৪০ বছর পূর্তিতে দু’বার সেরার সম্মান পাওয়ায় এই বইকে রাখা হয়েছিল ‘বিবেচনার বাইরে’। বিচারকদের বাছাই পাঁচটি বই তুলে দেওয়া হয়েছিল জনতার দরবারে, সেখানেই সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে, নইপলকেও টপকে, সেরা বইয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে ‘দি ইংলিশ পেশেন্ট’।

৩৮টা ভাষায় অনূদিত, হলিউডে চলচ্চিত্রায়িত (এবং ১৯৯৬ সালে ন’টা অস্কার জিতে নেওয়া) ‘দি ইংলিশ পেশেন্ট’ খুব জনপ্রিয়। বিশ্বযুদ্ধ শেষের আবহে, যখন আর এক বার পাল্টে যেতে চলেছে পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্র, সেই সময়ে ইতালির এক পাহাড়ী এলাকায় চারটি মানুষের খণ্ডিত জীবনকাহিনি চমকে দিয়েছিল পাঠকদের। শীর্ষচরিত্র এক অচিন মানুষ, নানান ঘটনা-দুর্ঘটনা পেরিয়ে, স্মৃতি-বিস্মৃতি খুঁড়ে যে বুনে চলেছে নিজেরই অতীত-ইতিহাস। সে ইংরেজ নয় কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শুনে বাকি চরিত্রেরা দেয় তাকে নতুন পরিচিতি: ‘দি ইংলিশ পেশেন্ট’। উপন্যাসের বাকি চরিত্রেরা— কানাডিয়ান সেনাবাহিনীর নার্স ‘হানা’, জার্মান বোমা নিষ্ক্রিয় করার কাজে সিদ্ধহস্ত ভারতীয় শিখ ‘কিপ’, আর অক্ষশক্তির কাগজপত্র চুরিতে ওস্তাদ কানাডিয়ান চোর কারাভাজিয়ো। এদের জীবন আলাদা, আলাদা তাদের দৃষ্টিভঙ্গীও। কিন্তু যুদ্ধ-পরিস্থিতি চার জনকে এনে ফেলেছে চার দেওয়ালের মধ্যে। এদেরই স্মৃতি, সংলাপ, সন্দেহ, সংশয় বুকে নিয়ে এগোয় জটিল এই উপন্যাসের দ্রুতি। তারই মধ্যে উঁকি দিয়ে যায় ভালবাসাও।

পাঁচ বিচারকের এক জন, কামিলা শামসি বলেছেন, ‘‘ওঁর চরিত্রেরা তো ঠিকানাহীন, ওরা থিতু ঘর খুঁজে পায় ওঁর ভাষাতেই।’’

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

ছবিঃ গেটি ইমেজেস, গুগল