কতটা পথ পেরোলে বলো- পর্ব ৩

শ্যামলী আচার্য

রবিবার। ২০ মে, ২০১৮। অধমের প্যারিসের মাটিতে অবতরণ। রেডিওতে অকারণে বিভিন্ন বিষয়ে বকবক করার ‘ক্যাজুয়াল’ দায়িত্ব পালনের সুবাদে মাঝেমধ্যেই পড়াশোনা করেটরে নিজেকে ‘বিজ্ঞ’ (বা ‘বিশেষভাবে অজ্ঞ’) করে তুলতে হয়। সেইসূত্রেই জানা ছিলো, ১৯ মে শেষ হয়ে গেছে ৭১ তম কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। কাজেই, নিজের ডিজাইনার গাউন, যেটা পরে নিত্য শুতে যাই রাত্রে, সেটা আর ভরিনি ট্র্যাভেল ব্যাগে। কী হবে? ভাঙা হাটে কুড়ি তারিখ কে’ই বা দেখবে ওই রাজবেশ! কানের ধূলিধূসর লাল কার্পেট থেকে নিজের গাউন আপাতত তুলে নেওয়াই ভালো!

এই বছর কান উৎসবের অফিসিয়াল ফেস্টিভ্যাল পোস্টারে ছিল গোদারের ১৯৬৫ সালে তৈরি ছবি পিয়েরো লে ফু (Pierrot le Fou)। জাঁ পল বেলমন্দ আর আনা কারিনার ঘনিষ্ঠ ছবি। ফরাসী নিউ ওয়েভ সিনেমার ধারায় গোদারের এটি দশ নম্বর ছবি। কী আশ্চর্য সমাপতন! ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে, ২১ তম কান ফেস্টিভ্যালে, ১৮ মে ১৯৬৮, সোমবার… জাঁ লুক গোদার, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো, লুই মাল আর ক্লোদ লোলুশ উঠে দাঁড়ালেন কান ফেস্টিভ্যালের মঞ্চে। স্পষ্ট ভাষায় সমর্থন করলেন রাষ্ট্রর বিরুদ্ধে সংগঠিত ছাত্র-আন্দোলন। বন্ধ করে দিলেন কান উৎসব। ঠিক পঞ্চাশ বছর আগের এক মে মাস। সমাজবদলের নতুন ডিসকোর্স পেল ফ্রান্স। কিছুই বদলাল না, অথচ সবকিছু বদলে গেল!
ছাত্ররা সেদিন জানিয়েছিলো, ‘তরুণ হও অথবা চুপ করো’। ‘শিল্পের মৃত্যু হয়েছে, মৃতদেহ খেও না’। ‘রাষ্ট্র, সে তো আমি’। ‘আমরাই ক্ষমতা’। ‘সৌন্দর্য এখন রাস্তায়’। ‘নিষিদ্ধকরণকে নিষিদ্ধ করা হল’। পারী কম্যুন-এর পরে এত বড় ঝাঁকুনি আর কখনও আসেনি ফ্রান্সের সমাজজীবনে। শুধু চিত্রকলা, স্থাপত্য আর কবিতায় নয়, সিনেমাতেও প্রতিফলিত নিউ ওয়েভ মুভমেন্ট।
এহেন একটি ঐতিহাসিক জায়গায় এসে পৌঁছতে পারায় ভাগ্য দৈব ছাপিয়ে ধন্যবাদ দিই ইচ্ছাশক্তিকে। ইচ্ছে থাকলেই উপায়…

আমার মা ছিলেন যাদবপুরে একটি সরকারি মাধ্যমিক ইশকুলের অংক দিদিমণি। দিদিমণিরা যেমন হয়ে থাকেন। বিশ্বের সকলকেই ছাত্র ভাবেন। এতে আমি আজন্ম অভ্যস্ত। নিজেকে ছাত্র ভাবতে কখনও বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয় না আমার। প্রতিদিন বাঁচি, প্রতিদিন শিখি। আমর বাবা মাঝেমধ্যে বলতেন, টানা পনেরো বছর ইশকুলে পড়ালে কোর্ট নাকি তার সাক্ষ্য নেয় না! হে হে হে। বলাই বাহুল্য, এই তথ্যের কোন আইনি ভিত্তি নেই। নিতান্তই চটিয়ে দেবার জন্য বলা। কিন্তু কথাটা মনে পড়ে। এই সফরেও মনে পড়েছে বেশ কয়েকবার। একে সংগে ভূগোল দিদিমণি। তার ওপর তিনি সবেতেই সারা জীবন ফার্স্ট। আমার মতো লাস্ট বেঞ্চের কাটাকুটি খেলা ফাঁকিবাজ পাবলিক নন। সবেতেই অগ্রগামী। কি বা রান্নায়, কি বা কান্নায়। তাঁর জানের জান প্রাণের আধখান অংশুমানের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য, একটি চমৎকার রেস্তোরাঁ খুলবে সে। রান্না তার প্যাশান। সে রন্ধনে উৎসাহী এবং সুপটু, খাদ্যগ্রহণ এবং প্রস্তুতির প্রতিটি পর্বে অতি সুনিপুণ মানুষ। অতি খুঁতখুঁতে। বাজার করা থেকে পরিবেশন অবধি নিজের তত্ত্বাবধানে রাখার জন্য নিয়মিত স্ত্রীর ওপর পৌরুষ প্রদর্শন করে থাকেন। কিন্তু, ওই যে বলেছি। গিন্নি ক্লাসে ফার্স্ট। আর ফার্স্ট হওয়া লোকেরা কক্ষনো অন্যকে জায়গা ছেড়ে দেয় না। এই জীবনের কোনও খেলায়, কোনও দিনও আমি হারবো না! কাজেই, প্যারিসে AIRBNB-র চমৎকার ফ্ল্যাটে আমি-তন্ময়-গোল্লু ছিলাম মহানন্দে। উপাসনা-অংশুমান বাজার করে, মেনু ঠিক করে, তরকারি কাটে। রান্না করার জন্য আগে কে বা প্রাণ করিবেক দান তারি লাগি কাড়াকাড়ি। রান্নাঘরে বিস্তর শব্দ হয়। কে কোনটা আগে-পরে তা নিয়ে আলোচনা। একটু জোরেই হয়। দিদিমণিরা লাস্ট বেঞ্চের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে আন্তরিক ভাবে পৌঁছতে চাইলে যতটা জোরে বলেন, ঠিক ততটাই।

আমরা খেতে বসে ওদের ধন্য করি। আমি তো আরও বিন্দাস। মাঝেমধ্যেই গম্ভীর মুখে কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসি। যেন এমিল জোলা এসে ভর করেছেন স্বয়ং। চাট্টি গপ্পো লিখে না ফেললে সব নোবেল, বুকার অন্য লোকে মারামারি করে নিয়ে নেবে। রান্না ব্যাপারটা এমনিতেই আমার কাছে ইনঅর্গানিক কেমিস্ট্রির প্র্যাকটিকাল ক্লাস। জিভের টেস্টবাডেও কিছু জেনেটিক ডিফেক্ট আছে। যা পাই, তাই খাই। সব কিছুরই একরকম স্বাদ। তন্ময়ের পাঁচবার টাইফয়েডে (বিয়ের আগে, পাঁচবারই, পয়েন্ট টু বি নোটেড) লিভার অকেজো। কাজেই তেমন খাদ্যরসিক হয়ে উঠতে পারেনি। তাছাড়া, বাজার যাওয়া, রান্নাবান্না এগুলো ওর জ্যঁর নয়। কবিমানুষ। অতএব আমরা তিন প্রাণী শখের ট্যুরিস্ট। গোটা ট্যুর ওরাই আমাদের খাইয়ে-পরিয়ে আদরে-যত্নে রেখেছিল।

কেউ ভবিষ্যতে ওদের সংগে বেড়াতে গিয়ে দেখতে পারেন। অংশুমানের মত ট্যুর-ম্যানেজার লাখে একটা মেলে।( চলবে)

ছবি: লেখক