ফ্রিডা কাহলো এক সূর্যমুখী ফুল

‘‘সবাই ভাবে আমি একজন পরাবাস্তববাদী মানুষ। কিন্তু আসলে কোনোদিন নিজের স্বপ্নকে আঁকিনি। এঁকেছি একেবারে নিজস্ব বাস্তবতাকে’’-কথাটা বলেছিলেন ফ্রিডা কাহলো। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে এই পৃথিবীকে গুডবাই বলে দেয়া এই চিত্রশিল্পী তার ক্যানভাসের রঙ থেকে শুরু করে জীবনের ব্যথা, পঙ্গু শরীরে ডাক্তারের ছুরিকাঁচি চালানোর যন্ত্রণা নিয়েই জীবনকে অন্বেষণ করেছেন, যোগ করেছেন আলাদা মাত্রা। ফ্রিডা প্রেমে পাগল হয়ে বিয়ে করেছিলেন তার চাইতে বয়সে অনেক বড় আরেক শিল্পীকে। সে জীবন সুখের হয়নি। প্রেমে পড়েছিলেন ইতিহাসে আলোচিত রুশ বিপ্লবী লিও ট্রটস্কীর। ভেঙ্গে গিয়েছিলো সেই প্রেমও। নিজেকে যুক্ত করেছিলেন মানুষের মুক্তির সংগ্রামে। মৃত্যুর ৬৪ বছর পরেও ফ্রিডা কাহলোকে নিয়ে আলোচনা তাই অফুরান। চিত্রকর্ম, অসুখী দাম্পত্য জীবন, প্রেম আর পোশাকের স্টাইল নিয়ে ফ্রিডা কাহলো চেনা হয়েও একটুকরো অচেনা ছায়ার ভেতরেই রয়ে গেলেন। 

গত মাসে লণ্ডনের ভিক্টোরিয়া ও অ্যালবার্ট জাদুঘরে শুরু হয়েছে ৫০ বছর ধরে চোখের আড়ালে থাকা ফ্রিডা কাহলো‘র বিপুল পরিমাণ ব্যবহারের সামগ্রীর প্রদর্শনী। চলবে শীতকাল আসা পর্যন্ত। এই প্রদর্শনী পৃথিবীর শিল্পমনষ্ক মানুষকে আরেকবার হয়তো অন্য এক ফ্রিডার মুখোমুখি করবে। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ফ্রিডা কাহলো‘র সেই প্রদর্শনী আর তাঁর জীবন নিয়ে নানা কথা।

কী আছে লণ্ডনের জাদুঘরের সেই প্রদর্শনীতে? ৫০ বছর ধরে এই শিল্পীর জীবনের সঙ্গে যুক্ত এতোসব সামগ্রী চোখের আড়ালেই বা থেকে গেলো কেন? ১৯৫৪ সালের ১৩ জুলাই পৃথিবীকে বিদায় বলেছিলেন ফ্রিডা। সেই মৃত্যুর স্বাভাবিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে অনেকের মনে। মৃত্যুর পর তাঁর শিল্পী স্বামী দিয়েগো রিভেরা তাদের মেক্সিকো শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত ‘ব্লু হাউজ’ নামে বাড়ির একটি বাথরুমে ফ্রিডার বহু ব্যক্তিগত সামগ্রী তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন। সেখানে ৫০ বছরের অন্ধকারে অটকে ছিলো ফ্রিডার ৬ হাজার ছবি, ৩‘শটি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিশ, র‌্যাভলন কোম্পানীর লিপস্টিক, ১২ হাজারের মতো দলিলপত্র, চিঠি, শিল্পীর পোশাক আর তাঁর দেহে সংযোজিত কৃত্রিম পা। এই প্রর্দশনীর আয়োজকদের কথায় উঠে এসেছে ফ্রিডা কাহলোর সত্তা, পরিচয়, রাজনৈতিক বিশ্বাস, জাতীয়তা এবং পঙ্গুত্বের কথা। গোটা প্রর্দশনীর মূল ভাবনা হিসেবে এই বিষয়গুলোকেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তার পঙ্গু জীবনের ওষুধপত্র আর কৃত্রিম অঙ্গও প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে শিল্পীর জীবনের সেই বাস্তবতার ছবিটাকে সম্পূর্ণ করে তুলতে। ফ্রিডা তো নিজের ছবিতে এই বাস্তবতাকেই ক্যানভাসে ধরতে চেয়েছিলেন।

পোশাক ছিলো ফ্রিডা কাহলোর কাছে নিজের পঙ্গুত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র। মাত্র ৬ বছর বয়সে পলিও আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। অসুখের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় তাঁর ডান পা ছোট হয়ে যায়। তারপর ১৮ বছর বয়সে ঘটে আরেকটি মারাত্নক দূর্ঘটনা। তাঁর স্কুল যাবার বাসের সঙ্গে ট্রামের ভয়াবহ সংঘর্ষে ফ্রিডার শরীরের ২০টি হাড় ভেঙ্গে যায়। পুরো এক বছর তাকে বিছানায় কাটাতে হয়েছিলো। আর এখান থেকেই ফ্রিডার জীবনে শুরু হয় ছবি আঁকা। এরপর শরীরকে পঙ্গুদশা থেকে মুক্তি দিতে ৩০টি অপারেশন করাতে হয় তাঁকে। ১৯৫৩ সালে শেষ অপারেশনটা করান ফ্রিডা। পরের বছর মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু ঘটে। জীবনের শেষ অঙ্কে এসে পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়ে যাওয়ায় সেটা কেটে বাদ দিতে হয়েছিলো। কৃত্রিম পা ব্যবহার করতেন ফ্রিডা। শরীরের এইসব ক্ষত ঢেকে রাখতে বিশেষ ধরণের লম্বা পোশাক পরতেন তিনি। হাঁটাচলা করার জন্য কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহার করলেও সেগুলোও শিল্পীর তুলির ছোঁয়ায় নান্দনিকতা পেয়েছিলো।

স্বামীর সঙ্গে ফ্রিডা

পাগল হয়ে বিয়ে করে বসেছিলেন ১৫ বছর বয়সে। ৩৬ বছর বয়সী স্বামী দিয়েগো রিভেরা ছিলেন একজন খ্যাতিমান শিল্পী। স্কুলে পড়ার বয়সেই ফ্রিডার সঙ্গে পরিচয় হয় দিয়েগোর। দিয়েগো ফ্রিডার স্কুলে এসেছিলেন একটি ম্যুরালের কাজ নিয়ে। প্রেম তখনই তৈরী হয়নি। এরও ৬ বছর পরে দিয়েগোর সঙ্গে এক পার্টিতে দেখা হলে প্রেম আগুনের মতো ফুঁসে ওঠে। ফ্রিডা ঘোষণা দিয়ে বসেন নিজের গর্ভে দিয়েগোর সন্তান ধারণ করতেই তিনি তাকে বিয়ে করতে চান। প্রায় পরিবারের অমতেই বিয়ে করেছিলেন ফ্রিডা। লোকে বলতো ‘বেমানান দম্পতি’। আর বাবা-মা বলতেন, জামাই হাতি আর মেয়ে যেন ঘুঘু পাখি। বিশাল মোটা ছিলেন দিয়েগো রিভেরা। সেই বেমানান জীবনকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন ফ্রিডা। কিন্তু বিধিবাম। দিয়েগো তাকে তেমন করে ভালোই বাসতে পারেননি কোনোদিন। তার কাছে শারীরীক সম্পর্ক ছিলো বাথরুমে জলবিয়োগের মতো একটা বিষয়। ফ্রিডা দিয়েগোর সন্তানের মা হতেও ব্যর্থ হন। বেশ কয়েকবার গর্ভপাতের শিকার হয়ে ফ্রিডা যখন বিপর্যস্ত ঠিক তখনই দিয়েগো প্রেমে পড়ে ফ্রিডার ছোট বোন ক্রিশ্চিয়ানার সঙ্গে। সময়টা ১৯৩৩ সাল। বিয়েটা টিকলো না। ফ্রিডার দীর্ঘশ্বাস হাওয়ায় তুলি বুলিয়ে লিখে দিলো, ‘‘আমার জীবনে দূর্ঘটনা দুটো। প্রথমটা আমার দূর্ঘটনা আর দ্বিতীয়টা আমার স্বামী’’।মন ভেঙ্গে গিয়েছিলো তাঁর।

বিয়ে ভাঙ্গার পর কিন্তু ফ্রিডা কাহলো আবার প্রেমে পড়েছিলেন। আর তাঁর প্রেমিক ছিলেন ইতিহাসে সুবিখ্যাত বিপ্লবী, রাশিয়ার মেইনশেভিক পার্টির নেতা লিও ট্রটস্কী। তিনি তখন দেশ থেকে স্ট্যালিনের তাড়া খেয়ে পলাতক জীবনযাপন করছেন। ট্রটস্কী আর তাঁর স্ত্রী রাশিয়া থেকে চলে আসেন মেক্সিকোতে। আর আশ্রয় নেন ফ্রিডার বাড়িতেই। ফ্রিডা নিজেও সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। টানা দুই বছর সেই বাড়িতেই থাকতেন ট্রটস্কী। আর তখনই ফ্রিডার সঙ্গে এই বিপ্লবীর ভালোবাসা তৈরী হয়। ফ্রিডা ট্রটস্কীকে ডাকতেন এল ভিয়েজো। মেক্সিকান ভাষায় যার অর্থ ‘বুড়ো’। তাদের মধ্যে নিয়মিত চিঠির আদানপ্রদান ছিলো। ট্রটস্কী ফ্রিডার বইয়ের ভেতরে তাঁর লেখা চিঠির উত্তর রেখে দিতেন নিয়মিত। নিজের আঁকা বিখ্যাত আত্নপ্রতিকৃতি ‘বিটুইন দ্য কার্টেন’ তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ট্রটস্কীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে।

জীবন আর পঙ্গু শরীরের যন্ত্রণা তাকে তিলে তিলে ক্ষয় করেছে। কিন্তু রঙ-তুলির দুনিয়া ফ্রিডা কাহলোকে আলাদা পরিচয়ে সমুজ্জ্বল করে রেখেছে। আত্নপ্রতিকৃতি আর চিত্রকর্ম দুই জায়গাতেই নিজেকে রঙের বিস্তারে প্রকাশ করেছেন তিনি। এক ধরণের বোহেমিয়ান জীবন ছিলো তাঁর। দিয়েগোকে প্রত্যাখ্যান করেও দ্বিতীয়বার আবার তাকেই বিয়ে করেছিলেন । পাগলাটে অথচ দৃঢ়চেতা এই নারীর জীবন ও শিল্পের প্রভাব বহুদূর বিস্তৃত। কিন্তু আলোচকরা প্রশ্ন তোলেন, ফ্রিডা কাহলো কি ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে এই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম? প্রখ্যাত পপস্টার ম্যাডোনা একেবারে তার ক্যারিয়ারের শুরুতে ঘরের দেয়ালে এই মেক্সিকান চিত্রশিল্পীর ছবি সেঁটে রাখতেন। মুগ্ধ ছিলেন ফ্রিডা কাহলোর জীবনের গল্পে।

বুদ্ধিজীবী আঁদ্রে ব্রেঁত‘র আমন্ত্রণে প্যারিসে গিয়ে ছবির প্রদর্শনী করেছিলেন। নিজের জীবনের শেষ প্রদর্শনী করেন ফ্রিডা মেক্সিকোতে। গ্যালারীতে বিশাল আকারের ৪টি বিছানা সাজিয়েছিলেন মৃত মানুষের হাড়গোড় আর স্বামী, আত্নীয়স্বজন ও বন্ধুদের ছবি দিয়ে। ওটাই ছিলো পৃথিবীকে বলতে চাওয়া তাঁর শেষ কথা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘‘আমি অসুস্থ নই; তবে ভেঙ্গে পড়া মানুষ। তবে জীবন আমাকে যতদিন ছবি আঁকার ক্ষমতা দেবে ততদিনই আমি আনন্দিত’’।

ফ্রিডা কাহলোর মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে। অনেকেই বলেন, স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি তাঁর। সে রহস্যের কোনো কিনারাও হয়নি। মৃত্যুর পরে ফ্রিডার দেহ আগুনে পোড়ানো হয়েছিলো। আগুনের ভীষণ উত্তাপে এক সময় ফ্রিডার প্রাণহীন শরীরটা সেই আগুনের চিতায় উঠে বসেছিলো। তার জ্বলন্ত চুল দেখে মনে হয়েছিলো সূর্যমুখী ফুল।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ বিবিসি কালচার, নিউায়র্ক টাইমস।