খোঁজা…

জয়দীপ রায়

কিছু একটা যেন খুঁজি। লাগাতার। কচুরিপানা সরিয়ে যেতে যেতে রাধাদার সাঁতার শেখানোর ঘাট পেরিয়ে যখন নতুন ব্রীজের তলায় পৌঁছই, গায়ে ঠেকে নন্টেমামার পা টা, যে পা টা একদিন একঘন্টা ধরে নদী চষে ফেলার পর কিশোর মিস্ত্রি খপাৎ করে ধরে ফেলে জলের মধ্যে থেকে তুলে এনেছিল সাদা নন্টেমামাকে। আর আমরা ব্রীজের রেলিংয়ের উপরে ঝুঁকে থাকা মানুষেরা, পাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা আত্মীয়রা হায় হায় করে উঠি। আমি কিন্তু আজ পা টা খুঁজছিলাম না। কচুরিপানা সরিয়ে যেতে যেতে কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে আমার খিদে পেয়ে যায়। আমি জল থেকে উঠে ব্রীজের নীচে হক সাহেবের দোকানের সামনে দিয়ে বড় রাস্তায় উঠে পড়ি। 
বড় রাস্তা সবসময় বড় হয়। বড় গাড়ি বড় বাতিস্তম্ভ পেরিয়ে যেতে গিয়ে দেখা হয় ভগবান কাকার সাথে। ছোটবেলার ধোপদুরস্ত ভগবান কাকা একমুখ দাড়িগোঁফ আর ময়লা জামাপ্যান্ট পরে একটা টেলিফোন পোস্টে হেলান দিয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়া মোটর সাইকেল গুনছিলো। ভগবান কাকারও একসময় মোটর সাইকেল ছিল। আসামে মার্কেট ছিল। তিনসুকিয়া ডিব্রুগড় লামডিং গুয়াহাটির সাজগোজের দোকানে চিরুনি বিক্রি করতো। যশোর চিরুনি। সাথে ইমিটেশন জুয়েলারি। প্রথম যখন মাথাটা বিগড়ায়, জোর করে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিইয়ে সাদা অ্যাম্বাসাডারে তুলে দিয়েছিলাম। ওরা অ্যাসাইলামে নিয়ে গেছিল। তারপর থেকে রাস্তাঘাটে দেখা হলেই কিরকম অবিশ্বাসের চোখে দেখতো। আজকেও মোটর সাইকেল গোনা শেষ করে আমাকে সন্দেহের চোখেই দেখতে লাগলো। আমি পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভগবান কাকার ঘোলা চোখদুটো যেন একটু চকচক করে উঠলো।
তখনই বৃষ্টি নামলো। আমি তো নদী থেকেই ভিজে এসেছি। ভগবান কাকা পুরোপুরি ভিজে গেলে পর বলে উঠলো, খিদে পেয়েছে, জয়দেব। আরে খিদে তো আমারও পেয়েছে। দুজনে মিলে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে সাতক্ষীরা ডেয়ারীর পাঁউরুটি সন্দেশ খেলাম। আমার আবার মনে পড়ে গেল আমি যেন কি একটা খুঁজছিলাম।
-আমি কি খুঁজছিলাম গো ভগবান কাকা?
-ইঞ্জেকশান।
-না না, বলো না।
-ঘুম খুঁজছিলে তুমি, ঘুম।
-না গো, আমার মনে পড়ছে না যে। কিছু একটা খুঁজছিলাম। অনেকদিন আগে নন্টেমামার পা খুঁজে পেয়েছিলাম জলের মধ্যে, কিন্তু আজ কি খুঁজছিলাম?
-তোমার সত্যিই মনে পড়ছে না?
-নাহ্..
-আমারও মনে পড়ে না।
-কি?
-আমিও খুঁজি।
-কি খোঁজো?
-জানি না। খুঁজি কিছু একটা। একটা বিড়ি খাওয়াতে পারিস?
-বিড়ি তো তুমি কখনও খেতে না!
-এখনও খাই না। হঠাৎ মনে হল তোর সঙ্গে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির মধ্যে একটা বিড়ি খাই। আমার খুব আনন্দ হচ্ছে আজ।
-কেন?
-এই যে, তুইও আমার মত খুঁজে বেড়াচ্ছিস।
-তুমি কি খোঁজো?
-জানি না। ওটাই তো মনে পড়ে না। চল, এক জায়গায় যাই।
-কোথায়?
-হাঁটতে হাঁটতেই চল।
-আরে কোথায় বলবে তো!
-শিমুলতলার রাস্তা দিয়ে। 
-কোথায়?
-ভবানীপুরের মঠ পেরিয়ে।
-আরে কোথায় বলবে তো!
-বাংলাদেশে যাবার রেললাইনের তলা দিয়ে। চল না আমার সাথে।

চললাম। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে আরও ভিজতে ভিজতে একসময় শিমুলতলা পার করে ভবানীপুর। মঠ পেরিয়ে, ভেজা পটলক্ষেত পার হয়ে নদীর পাড়ে একটা বটগাছ। কালির থান। গাছের গায়ে অসংখ্য ভারা বাঁধা। মানত। কারোর চাবি হারিয়েছে, কারের বউ। কেউ পাশ চেয়েছে, কেউ মৃত্যু। কত কত চাওয়ার হিসাব গাছের গায়ে ঢিল হয়ে ঝুলছে। কোথা থেকে যেন ধুপের গন্ধ ভেসে আসছে নাকে। ভগবান কাকা একটা ইঁটের টুকরো নিজের ফেঁসে যাওয়া ফুলহাতা জামার হাতাটা ছিঁড়ে বেঁধে ফেললো। গাছের গায়ে আরও অসংখ্য ঝুলে থাকা চাহিদার ভিড়ে বাঁধতে বাঁধতে বললো, তুইও নে।
-কি চাইলে তুমি।
-তুই যা চাস।
-আমি কি চাই?
-মনে পড়াতে।
-কি মনে পড়াতে?
-কি খুঁজছিলিস সেটা।
-ভগবান, আমাকে মনে পড়িয়ে দাও আমি কি খুঁজছিলাম?
-ঠিক তাই। নে, বাঁধ।

নদীর ঘাটে একটা নৌকো এসে লাগলো। তিনজন মানুষ নেমে আসলো। আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। সাদা অ্যাপ্রন পরা। একজনের হাতে সিরিঞ্জ। আর দুজন বলশালী। বলশালী দুজন এসে আমাকে দুপাশ থেকে ধরলো। তৃতীয়জন এসে সিরিঞ্জের সূঁচটা আমার হাতে ফুটিয়ে দিল। আমি কোনও বাধা দিলাম না। কোনও বাধা দিতে পারলাম না। আমার ঘুম আসছে। বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছে। আমি ভিজতে ভিজতে ঝাপসা হয়ে যেতে থাকলাম। আর ভগবান কাকার গলা পাশের থেকে দূরে চলে যেতে যেতে বলতে লাগলো, মনে পড়েছে মনে পড়েছে, হোমটার নাম ছিল, রিপোজ। ওটাই তো খুঁজছিলাম আমি এতদিন। ওই দ্যাখ, ওদের অ্যাপ্রনের বুকেও তাই লেখা, রিপোজ। তুই ওদের সাথে চলে যা। তোরও মনে পড়ে যাবে তুই কি খুঁজছিলিস।

অন্ধকার হয়ে এলো বেশ। অন্ধকারে আমি আর বুঝতে পারলাম না, বৃষ্টি থেমেছে কিনা। বাড়ি যাব আমি।

ছবি: মাঞ্জারে হাসিন মুরাদ ও তন্ময় দেব