ফিরছে বাঘছাপ দেয়া পোশাকের ফ্যাশন

প্রাচীন মিশরীয় দেবীর বাঘছাপ পোশাক

চিতা বাঘের শরীরের দাগের মতো ছাপ দেয়া কাপড়ের পোশাক মহিলাদের কাছে জনপ্রিয় কেন? যীশু খৃষ্টের জন্মেরও ৬০০০ বছর আগে শিল্পীর তৈরী মাটির নারী মূর্তির শরীরে ব্যবহৃত হয়েছে চিতাবাঘের গায়ের সেই ছাপ দেয়া পোশাক। মিশরীয় প্রাচীন গ্রন্থে উল্লেখ আছে, তাদের বুদ্ধির দেবী ‘সেসাট’ এ ধরণের ছাপ দেয়া পোশাক পরিধান করতো। চীনা পূরাণে বলা হয়েছে, তাদের এক দেবীর শরীরে লাগানো ছিলো চিতাবাঘের লেজ। এই বিশেষ ধরণের ছাপ দেয়া কাপড়ের পোশাক ফ্যাশন সচেতন আধুনিক বিশ্বে কে পরিধান করেনি? অভিনেত্রী এলিজাবেথ  টেইলার থেকে আমেরিকার ফার্স্টলেডি জ্যাকুলিন কেনেডি, মিশেল ওবামা হয়ে হালের আমেরিকান পপ গায়িকা ও অভিনেত্রী বিয়ন্সি-সবাই গায়ে তুলেছেন এই বিশেষ ধরণের ছাপ দেয়া কাপড়ের পোশাক।
বেশ কয়েক বছর আগে ‘বার্লেস্ক’ নামে বিশেষ ধরণের ব্যাঙ্গাত্নক এবং নগ্ন নাচের শিল্পী জো ওয়েলডনি এ ধরণের কাপড় এবং পোশাকের জনপ্রিয়তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। আর খুঁড়তে খুঁড়তে তিনি উদ্ধার করে ফেলেন এ্ই বাঘছাপ দেয়া কাপড়ের নানা কাহিনী। সব তথ্য জোড়া দিয়ে ওয়েলডিন লিখে ফেলেন বই ‘দ্য হিস্ট্রি অফ লেপার্ড প্রিন্ট’।বইটি প্রকাশ করেছে বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ‘হার্পার কলিন্স’।
এ ধরণের কাপড়ের ইতিহাস, জনপ্রিয়তার কারণ আর সামাজিক বাস্তবতা- এসবের পেছনের কারণটাও অনুসন্ধান করেছেন এই নৃত্যশিল্পী। তাঁর বইতে ওয়েলডিন লিখেছেন, এই বিশেষ ছাপ দেয়া কাপড়ের জনপ্রিয়তার পেছনেরে কারণটা অনেকটাই মানসিক। চিতাবাঘ প্রাণীটি ভীষণ ক্ষিপ্র আর সাহসী। লিখতে গিয়ে তিনি গবেষণা করে দেখেছেন, সেই চিতাবাঘের ছাপ দেয়া কাপড় পড়ার প্রবণতাটি নারীর কাছে জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হচ্ছে তারা নিজেদের মধ্যে চিতার সাহস আর ক্ষিপ্রতাকে উপলব্ধি করেন।চিতাবাঘের মতোই তারা নিজেদের শক্তিশালী আর স্বাধীনচেতা হিসেবে ভাবতে শুরু করেন। এরকম পোশাক বাড়িয়ে দেয় তাদের আত্নবিশ্বাসও।
ওয়েলডিনের বই জানাচ্ছে, ১৮ ও ১৯ শতকে চিতাবাঘের চামড়া তখনকার সমাজে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবেই পরিচিত ছিলো। বিংশ শতাব্দীতে এসে বাঘছাপ দেয়া পোশাকের জনপ্রিয়তায় ঘটলো বাঁক বদল।ওই সময়ে কাপড়ের ব্যাপক উৎপাদন শুরু হলো পৃথিবীর দেশে দেশে। আর কাপড় উৎপাদনের বাণিজ্যিক ধারায় জনপ্রিয়তা দিলো চিতাবাঘের ছাপ দেয়া এই বিশেষ কাপড়কেও।
সেই সময়ে অবশ্য এই পোশাকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলো বদনাম। তখন দেখা যেতো নারী তার যৌবন আর শরীরকে আরো আক্রমণাত্নক ভঙ্গীতে উপস্থাপনের জন্য এ ধরণের বিশেষ ছাপ দেয়া পোশাক পরিধান করছেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এ ধরণের ছাপ দেয়া পোশাকের মেয়েদের পাশ্চাত্যের সমাজে পতিতা হিসেবেও চিহ্নিত করা হতো। টেলিভিশনের পর্দায়ও কুচক্রী আর খল নারীদের শরীরে উঠতো এ ধরণের ছাপমারা পোশাক। কিন্তু সময় পাল্টালো। বিখ্যাত ফ্যাশন কোম্পানী ‘ক্রিশ্চিয়ন ডিয়র’ ১৯৪৭ সালে এগিয়ে এলো বাঘছাপকে জনপ্রিয়তা দিতে। তাদের তৈরী এ ধরণের প্রিন্টের কাপড়ের মডেল হয়ে গেলেন জোসেফাইন বেকার, এলিজাবেথ টেইলর, জ্যাকুলিন কেনেডি। ব্যাস, আর যায় কোথায়। রাতারাতি চিতাবাঘের চিত্তির পা রাখলো ফ্যাশনের দুনিয়ায়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিয়ন্সে থেকে শুরু অ্যানা উইনটুর আর মিশেল ওবামা এই চিতাছাপের পোশাককে অনেক বেশী জনপ্রিয় করে তুলেছেন। আরমানি, কাভালি আর গিভেনচি‘র মতো বিখ্যাত সব ফ্যাশন ডিজাইনাররা এখন এ ধরণের কাপড়ের পোশাক তৈরী করছে নতুন ডিজাইনে।
জো ওয়েলডনি মনে করেন, এই কাপড়ের একটা আলাদা ভাষা আছে। সেটা হতে পারে সাহস, হতে পারে বিদ্রোহী, হতে পারে আবেদনময়। কিন্তু এই বিশেষ ছাপ দেয়া কাপড় যে একটি ভাষা প্রকাশের ক্ষমতা রাখে তাতে ওয়েলডিনির কোনো সন্দেহ নেই। ইতিহাসও তাই বলে। নারীর ভেতরের শক্তি আর সৌন্দর্যের একটি অনুবাদ এই চিতাবাঘের চিত্তির ছাপানো বস্ত্র। ফ্যাশন দুনিয়ায় এই কাপড় আবারো নতুন করে নিজের জায়গা তৈরী করছে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ সিএনএন