নারীর চাই পুরুষের সমান অধিকার

রুখসানা আক্তার

(ইংল্যান্ড থেকে) : তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোতে পরিবারে , সমাজে এবং কর্ম ক্ষেত্রে নারীদের অবস্থান এখনো ও দ্বিতীয় সারির নাগরিকের ক্যাটাগরিতে । আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ গুলোর মধ্যে ভারত এবং পাকিস্তানে কি পরিমান নারী নির্যাতন হচ্ছে তার এখানে বিশদ বর্ণনা দেয়া বাহুল্য।  আর আমাদের বাংলাদেশে কি হচ্ছে ?এখানে  প্রতিনিয়ত নারীরা ঘরে বাইরে নির্যাতিত হচ্ছেন নানা ভাবে ।  ইদানীং কালের কিছু ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে  আমাদের দেশে নারী নির্যাতন বয়সভেদে  বহুগুনে বেড়ে গেছে ।  এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে ২০১৬ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত নারী নির্যাতনের  হার ৫৮শতাংশ। যে কোন বয়সের এমনকি একটা চার পাঁচ মাসের মেয়ে শিশুও রেহাই পাচ্ছে না এবং অনেক ক্ষেত্রে শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মেয়েরা যে রকম পৈচাশিক এবং লোমহর্ষক  কায়দায় নির্যাতিত  হয়েছে বা হচ্ছে  তা দেখে মনে হয়, মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়া একটা পাপ আমাদের দেশে ।

আমাদের সমাজে একটা পরিবারে দেখা যায় যে, পরিবারের মেয়ে সন্তানরা  ছেলে সন্তানদের  তুলনায় সবদিক দিয়ে কম সুবিধা বা কম অধিকার প্রাপ্ত। আবার বিবাহিত জীবনে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একটা মেয়ের বিয়ে তো হয় না আসলে কিছু খরচ পাতি করে স্থায়ী যৌন দাসী আর ঘর সামলানোর পার্মানেন্ট বাদী কিনে নিয়ে যাওয়া হয় ।

আবার রাস্তা ঘাটে  , কর্মস্থলে  এবং যানবাহনে  যেভাবে মেয়েরা যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছে, এতে মনে হয় যে (আমি সবার কথা বলছি না) দুর্বল চিত্তের , অসুস্থ  সেই সব পুরুষদের চোখের সামনে শুধু এক একটা ভোগ্যপন্য ঘুরে বেড়ায় , ফলে ভেতরের পশুটাকে দমিয়ে রাখতে পারেন না। আর তখন দায়ী করা হয় মেয়েদেরকেই যে, তাদের পোশাক এর জন্য দায়ী। অথচ পর্দানশীন বোরকা , হিজাব পড়া মেয়েরা ও এই জঘন্য অত্যাচারের শিকার অহরহ হচ্ছে।  এসব একটা সমাজের জন্য কতটুকু লজ্জাজনক ভাবা যায়!

মেয়েদের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে পরিবারে বেশির ভাগ মানুষেরই ,বলতে গেলে নারী পুরুষ উভয়ের মানসিকতাই হলো যে,মেয়েদের কোনো ইচ্ছা অনিচ্ছা থাকতে পারেনা । দুর্বল জাতি । মহাপরাক্রমশালী পুরুষ জাতি তার রুল চালিয়ে যাবে আর অবলা দুর্বল নারী জাতি তাদের প্রজা হিসাবে তাদের সুখ শান্তি আর আনন্দের জন্য পাথর ভেঙে  যাবে ।  নারীর আত্মমর্যাদা , আনন্দ ,অনুভুতি ,দুঃখ বেদনা ,ইচ্ছা অনিচ্ছা আবার কি? মানুষ হিসাবে  তার যে কিছু অধিকার আছে সেটা পর্যন্ত মানবিক বিবেচনার আওতায় আনা হয় না ।

আমাদের দেশে  ১৬ কোটি ১৭লাখ  ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে  যদি প্রাপ্ত তথ্যে ভুল না থাকে তবে সেই হিসাব অনুযায়ী ৪৯শতাংশ হচ্ছেন নারী । আমার প্রশ্ন হলো কয়টা মেয়ে  তার পরিবার এবং  সমাজের কাছে একজন মানুষ হিসাবে সমান মৌলিক অধিকার গুলো পায়? সম্মান দেয়ার আগে আসে অধিকারের প্রশ্ন । অধিকারের স্বীকৃতি এবং বাস্তবিকভাবে  পরিবারে এবং সমাজে এর একশত ভাগ প্র্যাকটিস মানেই   এই অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ।

একজন মানুষের বাঁচার জন্য তার ন্যায্য মৌলিক অধিকার গুলোর প্রয়োজন সব চাইতে আগে । শুধু প্রবন্ধে ,নিবন্ধে আর মিটিং সেমিনারে নারীর অধিকার নিয়ে বড় বড় কথা বলে যুগ যুগ ধরে যে অসম, অমানবিক এবং অন্যায় ও অনায্য মানসিকতা আমরা সমাজের সর্বস্তরে লালন করে আসছি এর সমাধান সম্ভব নয়।এই মানসিকতার ট্যাবু ভাঙতে আমাদের পুরানো ধ্যান ধারণা থেকে বের হয়ে নিজ মানসিক দৃষ্টির পরিবর্তন সহ  বাস্তবিক প্র্যাকটিস করতে হবে ঘরে এবং বাইরে। তবে ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। কয়েকটি ঘর পরিবার মিলেই একেকটা সমাজ আর সমাজ মিলে রাষ্ট্র । আমাদের দেশের নারী নির্যাতনের মূল কারণ হলো সমাজে নারীর নিম্ন সামাজিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক পরাধীনতা। তাই এই নির্যাতন বন্ধ করতে হলে প্রথমেই নারীর জন্য সমাজে পুরুষের সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা সহ সমাজের সর্বক্ষেত্রে নিরাপত্তার ব্যবস্থা এবং আর্থিক ভাবে তাদের স্বনির্ভর করে তুলতে হবে।
একটা দেশ বা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে নারী এবং পুরুষ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ একটা উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হচ্ছে।  একটা দেশের উন্নয়নে নারী এবং পুরুষের সমান ভাবে অংশ গ্রহন না হলে সেই উন্নয়ন বাধা প্রাপ্ত হবে। আর তাই আমাদের  জন্য সর্ব প্রথম নারী এবং পুরুষে সমতা সবচেয়ে জরুরী।

ছবি: গুগল