জীবন এখানে যেমন…

শিলা চৌধুরী

(ক্যালিম্পং থেকে): পাহাড়ের এই আদিবাসী গ্রাম স্যাংসেই-এ এসেছি মাস কয়েক হলো ।প্রতিদিনই রং বদলায় পাহাড়ের আবহাওয়া ।মুহুর্তেই রোদের ঝিলিক, ঠিক তার পর মুহূর্তেই মেঘেরা উড়ে এসে জুড়ে বসে…।

সব্জী

এখন এখানে বিদ্যালয় গুলোতে গরমের ছুটি চলছে। যদিও দিনরাত মেঘ বৃষ্টি রাজত্ব কায়েম করে ঝরেই চলেছে ।হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের ঝাউ-পাইন গাছের নৃত্যে একটা আলাদা সঙ্গীত মুখর বৃষ্টির আমেজ। খুব একটা খারাপ লাগে না ।যদিও জীবন যাত্রা প্রায় থমকে যায় এই মওশুমে এখানে ।একে পাহাড়, তাও এক দুই ফুট উঁচু নয় ,আট হাজার ফুট উচ্চতায় আমার ঘর। আদিবাসী ভুটিয়া, নেপালি, লেপচা সম্প্রদায়ের গ্রামে।জীবিকা বলতে এদের গাড়ি চালানো তাও কম সংখ্যক মানুষের ।বেশির ভাগেরই জীবিকা কৃষি

পনির

কাজ নয়তো অন্যের জমিতে জন (দিন মজুর )খাটা। যাদের ফষল ফলানোর এক চিলতে পাথুরে জমি আছে, তাতেই এরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে কিছু না কিছু চাষ করার । যদিও প্রচন্ড ঠান্ডা আর বৃষ্টির জন্যে এই সময়ে খুব বেশি ফলন হয় না এখানে । গরমের সময়েই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকে মেরেকেটে একুশ ডিগ্রি পর্যন্ত ।সর্বনিম্ন তাপমাত্রা এখন দশ থেকে দিনের বেলা চৌদ্দ পর্যন্ত ঘুরাফেরা করে ।অতিরিক্ত বৃষ্টিতে এখানে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকেও ঠিক মতো দেখতে পাওয়া যায় না বলাই চলে ।হেডলাইড জ্বালিয়ে ছুটে চলে ধীর গতিতে গাড়ি গুলো ।একটু এদিক ওদিক হলেই হাজার ফুট নীচে…। ঘর থেকে খুব কমই বেরুবার উপায় থাকে ।তাই অন্তত পেট চালানোর মতো সবজি  এরা বর্ষা মৌসুম শুরু হবার আগেই চাষ করে ফেলে।প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই একের অধিক গরু আছে।

দুটো পাহাড়ে  গরু পালন কারণে অনেক কষ্ট সাধ্য ।  তবু ও তারা পালন করে । দুধের চাহিদা তো পুরন হয়-ই সঙ্গে গোবর যা এখানে খুব মূল্যবান একটা জিনিস ।এই গোবরকেই সার হিসেবে ব্যবহার করে পাথুরে মাটিতে এরা সব ভেজাল মুক্ত শস্য উৎপাদন করে ।এখানে এখন প্রধান শষ্য হলো শশা/খীরা, স্কোয়াশ, ভুট্টা, মূলা,রাই সরষে শাক,করল্লা ।পাহাড়ে ভুটিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ সব ধরনের খাবার খায় ।তাজা মাছ এখানে পূর্নিমার চান্দের মতোই…।

শুটকি মাছ বাড়ি বাড়ি ফেরি করে বিক্রি হয় ।সব ধরনের মাংস এখানে হাতের মুঠোয় মেলে…।আর দাম খুবই সস্তা ।তবে বর্ষা শুরুর আগেই এরা মাংস শুকিয়ে মজুত করে আপদকালীন সময়ের জন্যে।বাজারে কিনতে ও পাওয়া যায় শুকনো মাংস । বাকি সব কিছুই এখানে দাম বেশি  ।নেপালিরা বেশিরভাগই নিরামিষাশী।সবজি যা বাইরে থেকে আসে তা একটু দামীই বটে…।এখানে সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায় খাঁটি দুধ আর দুধের তৈরি ঘি, পনির, চিজ, মাখন, ঘোল। তবে অবাক হয়েছি  একটা বিষয়ে এরা নিজেদের উৎপাদিত কোন সবজি বা দুধের তৈরি ঘি ,মাখন সহ কোন জিনিসের দর দাম করে না।কৃষক যা চাইবে দাম তা-ই নিঃশব্দে সবাই দিয়ে দেয় ।কারন জানতে চেয়েছিলাম তবে সবারই এক জবাব এরা কৃষক, নিজেদের জমিতে অনেক কষ্টে ফষল ফলায়,এই কষ্ট কে সম্মান করতে হয় ।সারা ভারতবর্ষে যেখানে কৃষকেরা ন্যায্য অধিকারের দাবিতে লড়াই করছে,ঋনের টাকা শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন সেখানে এই পাহাড়ের ছোট্ট গ্রামের প্রায় অধিকাংশ নিরক্ষর মানুষ কৃষকদের কষ্টকে মূল্যায়ন করে।

ছবি: লেখক