বাস্তব আর কল্পনায় ঘুরে বেড়ায় আমার মন

কাকলী আহমেদ

‘স্মৃতির পাখিরা’ এক ধরণের স্মৃতিগদ্য। যেন ফেলে আসা জীবনের সুখদুঃখময় বসবার ঘর। কত চরিত্র এসে বসে সেখানে, কত চরিত্র বিদায় নেয়। মাঝখানে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলা শহরের ঘ্রাণ হয়তো। কাকলি আহমেদ সেই বসবারঘরের গল্প বলতে চেয়েছেন প্রাণের বাংলার পাতায় তার ‘স্মৃতির পাখিরা’ কলামে।

খুব বেশি বাস্তবতা আর কল্পনাবিলাসে ঘুরে বেড়ায় মন আমার। ১৯৭৮ সালে আমার মা আমাকে একটি ডায়েরি এনে দিয়েছিলেন। তাঁর তিন কন্যার মাঝের জন আমি। আমাকে ঘিরে অনেক বেশি স্বপ্নবিলাসী ছিলেন মা। অন্য দুজনকে না-দিয়ে, স্নেহের সমতা রক্ষা না করেই এমনটা করেছিলেন বোধ করি। হালকা ছাই রঙের প্লাস্টিকের কাভারে মোড়ানো একটা ডায়েরি। কর্মসূত্রে আম্মা ‘বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক’-এ চাকরি করতেন। ডায়েরিটা হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ” তুমি প্রতিদিন যা মনে আসে লিখবে। হোক তা যা ইচ্ছে তাই”। আমি নিয়মিত স্কুলে যা হয় লিখে রাখি। হোক সেটা বন্ধু নাসিমা নুসরাতের উৎপাত। টীচারের বকা। বন্ধু ফারিয়ালের অদ্ভুত অদ্ভুত কাজ। মধু মোল্লা স্যারের আঁকা আঁকির কথামালা। আমাদের তিন বোনের তিনটি আলাদা পড়ার টেবিল ছিল না। একটি কাঠের কম দামি পড়ার টেবিলে আমার বই খাতা খুব গোছানো থাকত। অন্যান্যদেরটাও থাকতো ভাগাভাগি করে। স্কুল ব্যাগের মধ্যে রাখতো আমার বড়বোন। বড় বোনের এক ক্লাস নিচে আমি পড়তাম। বইয়ে একটি দাগ ও সে দিতো না। কারণ পরের বছর এই বইটিই আমি পড়তাম। ভালবাসার ডায়েরিটা থাকতো টেবিলের বাঁ পাশে সাজানো লেখাপড়ার খাতা আর বই ঘেঁষে। ১৯৭৮ সালে আমরা ৭৯ নম্বর কাকরাইলে বিঘা চারেকের জমির ভেতরে এক পাশে টিনের তিন কামরার বাসায় ভাড়া থাকতাম।

সামনে শান বাঁধানো বিরাট বারান্দা। জনপ্রিয় নায়ক জনাব আখতার হোসেনের পিতা বা প্রপিতার সম্পত্তি এই বিশাল বাড়িটি।পাঁচিলের ভেতর তাদের বাড়ির পেছনের দিকে আমাদের বাড়িটি। উল্টোদিকে কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল। বাড়ির সামনের ফটক ছিল টিনের।টিনের দরোজায় হাত দিয়ে বাড়ি দিতে দিতে লাল হয়ে গেলেও পেছনের দিকের সেই বাড়ি থেকে তা শোনা যেতো না। প্রায়শই আখতার চাচা( আমরা বাড়িওয়ালা চাচা-কে এমন করেই ডাকতাম)অথবা তাঁর বাড়ির অন্য কেউ দরজা খুলে দিতো। বাড়িওয়ালা ভাড়াটের সম্পর্ক এমনই সুমধুর ছিল। আব্বু, আম্মা অফিস থেকে নির্দিষ্ট সময়ে এলে কান খাড়া করে রাখতাম। আব্বু আমার বড় বোনকে আলো, আলো বলে মাঝে ডাকতো। বাড়িওয়ালা জনাব আখতার হোসেন সুচন্দার সঙ্গে “কাগজের নৌকা” ছবিতে প্রথম অভিনয় করে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। চাচার ছিল দুই ছেলে আবির ও আশিক। চাচা শ্যুটিং এ চলে গেলে আবির আশিক সারাদিন আমাদের স্নেহতলে থাকতো। আশিক ছিল একটু লাজুক প্রকৃতির। আবির ছিল স্নেহ কাতর। তাঁদের মা-কে কখনো দেখিনি। অনেকগুলো কুকুর ছিল ওদের। প্রায় সময় তিন চারটে কুকুরছানা টিনের বড় ফটকের সামনেই ঘোরাঘুরি করতো। ছোট বোন মুনিয়ার কুকুর ছানাআদর করার ব্যারাম ছিল। বড় বোন আলো বাচ্চাগুলোকে মাংসের হাড়গোড় খেতে দিতো। আব্বু এক কেজি মাংস কিনে ঘরে ফিরলেই আলো ব্যস্ত হয়ে যেতো “জ্যাকি”- কে কত টুকু হাড় দেবে সেই চিন্তায়। ( চলবে )

ছবি: গুগল