খোলা চিঠি ও চুমু

সেদিন বিকেলে আকাশ কালো করে আবার বৃষ্টি নামলো। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। এবার বিলম্বিত বর্ষায় বৃষ্টি দেখার সুযোগ তেমন মেলেনি তাই জানালা-ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়াই। খুব জোরে বৃষ্টি নয়। হালকা ঝিরঝির করে পড়ছে। হঠাৎ চোখ আটকে গেলো একশ হাত দূরে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়ানো উঁচু বাড়ির বারান্দায়। গ্রীলঘেরা বারান্দায় বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে জোড়া বুলবুলি পাখি। সন্ধ্যার দিকে ঝুঁকে পড়া বিকেল ছিলো। হয়তো সারাদিন দুজন মিলে ভিজেছে বেদম। তাই কেমন জবুথবু, কাকতাড়ুয়ার মতো অবস্থা। ডানা ঝাপটে পরিষ্কার করছে নিজেদের। কোনো কাজ ছিলো না। তাই চোখের লেন্সে মনযোগ ঢেলে দুই পাখিকে দেখতে শুরু করলাম। হঠাৎ দেখি একটি পাখি ঠোঁট দিয়ে আরেকটির ঠোঁট বারবার স্পর্শ করছে। তারপর নিজেই সঙ্গী অথবা সঙ্গিনীর শরীর পরিষ্কার করতে শুরু করলো। পাখির এই ভালোবাসা প্রকাশের, স্নেহ প্রকাশের ভাষা দেখতে ভালোই লাগছিলো। ভাবছিলাম পাখিদুটো কী একে-অপরের সঙ্গী? নাকি ওদের এই বৃষ্টিভেজা বিকেলেই প্রথম পরিচয়? কে জানবে উত্তরটা? অন্তত পাখিদের রাজ্যে কারো কি এই উত্তর জানার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? ওরা যে এরকম প্রকাশ্যে চুমু খেয়ে ফেললো আর আমি যে দেখে ফেললাম তাতে পাখিরাজ্য কি দুটি পাখি আর একজন মানুষের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে? ভাবছেন এসব কী উল্টোপাল্টা লেখা হচ্ছে, প্রসঙ্গের অবতারণাটাই কেমন খাপছাড়া। কিন্তু ওই যে শুরুতেই বলে রেখেছি লেখাটার মধ্যে চিঠি চিঠি একটা ব্যাপার আছে। খুব কেজো চিঠি না হলে তার ভাষা তো একটু বেলাইনে চলতেই পারে।  এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো চুম্বন বিতর্ক নিয়ে খোলা চিঠি।

জানালায় দাঁড়িয়ে পাখির ভালোবাসা দেখতে দেখতে একেবারে নিশ্চিতভাবে মাথার মধ্যে ফিরে এলো গত কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে যুবক-যুবতীর প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার দৃশ্য। সে দৃশ্য এক ফটো সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধারণ করে প্রকাশ করেছেন। আর তা নিয়ে এখন চলছে তুমুল বাদানুবাদ। ঘটনাটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য আর আলোচনা-সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। ঘটেছে মারপিটের ঘটনাও। প্রহৃত হয়েছেন ফটো সাংবাদিক জীবন আহমেদও। তাকে প্রহার করেছে তারই পেশাসঙ্গী অন্য ফটো সাংবাদিকরা সেই টিএসসি চত্বরেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র টিএসসিতে এক যুগলের চুম্বন দৃশ্য নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে বিভিন্ন মহলেও। সমালোচনাও কম হয়নি। কয়েকদিন আগে দুপুরবেলা বৃষ্টিভেজা ক্যাম্পাসে ওই তরুণ তরুণীর এমন একান্ত মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করেন সেই ফটো সাংবাদিক। সেদিন কয়েকদিনের প্রাণ অতিষ্ঠ করা গরমের পর ঢাকা শহরে নেমেছিলো স্বস্তিদায়ক বৃষ্টি। বৃষ্টি পরিবেশকে শীতল করলেও যুগলের ছবিটি ছড়িয়েছে উত্তাপ। ফটো সাংবাদিক ছবিটি ‘বর্ষা মঙ্গল কাব্য, ভালোবাসা হোক উন্মুক্ত’ ক্যাপশন দিয়ে প্রথমে নিজের ফেসবুক পেইজে পাবলিক পোস্ট হিসেবে শেয়ার করেন। তবে বৃষ্টিস্নাত এই যুগলের ছবিটি ধারণ করার আগে বা পরে তাদের অনুমতি নেয়া হয়েছিল কিনা, বিশেষ করে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের কোন অনুমোদন আছে কিনা এমন প্রশ্নও উঠেছে বিভিন্ন মহলে। প্রশ্ন উঠেছে নীতি এবং নৈতিকতা নিয়েও।
ঘটনাটি নিয়ে বিবিসি’র সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জীবন অবশ্য বলেছেন, ‘ওই যুগল দেখতে পেয়েছেন যে তাদের ফ্রেমবন্দি করা হচ্ছে। এবং ছবি তোলা হচ্ছে জেনেও এ বিষয়ে তারা কোন আপত্তি জানানন।’
কবি জন কীটসের একটি কবিতার লাইন বাংলায় অনুবাদ করলে এরকম দাঁড়ায়; ‘সে, শুধু সে-ই পারে পরতে অমরত্বের মুকুট, যে শুনেছে বাতাসের কন্ঠস্বর।’
পাখিরা বাতাসের কন্ঠস্বর শুনতে পায়? আমার জানা নেই। জানা নেই সেই কন্ঠস্বর শুনে তারা অমরত্ব পেয়ে গেছে কি না। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারি, প্রকাশ্যে চুম্বন করলেও পাখিকূলের সদস্যদের কোনো ঝামেলা হয় না। তাদের ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয় না, সমালোচনা, আলোচনা ডালপালা বিস্তার করে সংঘাতে গড়ায় না। যত ঝামেলা মনুষ্যকূলের। এতোসব ঘটনা চিন্তার স্রোতে ভাসতেই মনে পড়েছিলো ভারতীয় বাংলা গানের জনপ্রিয় গায়ত নচিকেতার একটা গানের লাইন; ‘প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ, ঘুষ খাওয়া কখনোই নয়।’ পরে দেখলাম লাইনটি লিখে ফেসবুকে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। আবার কেউ বাংলাদেশের সামাজিক মূল্যবোধ টেনে নানা নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। ফটোগ্রাফারের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি জনসমাগম স্থানে এভাবে আবেগের বহি:প্রকাশের বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন কেউ কেউ।পাশাপাশি কেউ আবার মন্তব্যে এই ছবিকে ভালবাসার নিষ্পাপ অভিব্যক্তি আখ্যা দিয়ে প্রশংসা করেছেন।এসব আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাও উঠে এসেছে। সেখানে এই যুগলের নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্মানের বিষয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মন্তব্যকারীরা বলেছেন, বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ছবিটি ওই যুবক-যুবতীকে বিপদেও ফেলতে পারে। আর এতোসব বাক্যযুদ্ধের মাঝে গুলিয়ে গেছে বৃষ্টিভেজা দুপুরে সেই যুগলের প্রগাঢ় চুম্বন। সেটাই কী ছিলো তাদের প্রথম চুম্বন? নাকি বিদায় চুম্বন, লাস্ট কিস? আমরা কেউ জানি না। এরপর এই যুবক-যুবতীর তো আর দেখা নাও হতে পার। অথবা এই চুমু হতে পারে তাদের ভালোবাসার প্রথম স্বীকৃতি। সারাদিন বেঁচে থাকার ধান্দায় উদ্ভ্রান্ত এই নগরী আর তার নাগরিকদের রুদ্ধশ্বাস ভীড়ে সেই যুগলের কাছে হয়তো অন্য এক জীবনের আমন্ত্রণের চিঠি। ভ্রু কুঁচকে ফেলতে পারেন পাঠক। আমি হয়তো সংস্কৃতি আর নৈতিকতার সীমা টপকে ছুটতে চাচ্ছি অন্য এক আলোমাখা মাঠে। হয়তো লেখা শব্দগুলো একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলছে। আমার পরিবারে কোনো বোন অথবা কন্যা এই কাণ্ড ঘটালে আমি কী করতাম এমন প্রশ্নও দেখা দিতে পারে কারো মনে। আগাম উত্তরে বলে রাখি, আমি স্বাগত জানাতাম। কারণ ভালোবাসার চুম্বন তো ব্যাংক জালিয়াতি করে সাধারণ মানুষের আমানত লুটে নেয়ার মতো সর্বনাশী প্রতিক্রিয়া নয়। প্রতিপক্ষকে মেরে হাড় গুড়ো করে দেয়ার মতো ভয় উদ্রেককারী ঘটনা নয়। হঠাৎ করেই পরিবারের নিরাপদ চৌহদ্দি থেকে চিরকালের জন্য উধাও হয়ে যাওয়া নয়। নয় কয়লা খনি থেকে কয়লা উধাও হওয়ার মতো উদ্বেগজনক ঘটনাও। চুম্বন তো সামান্য মানবিক প্রকাশভঙ্গী। ভালোবেসে এই একবিংশ শতাব্দীতে একজোড়া মানব-মানবীর কাছে আসা। ভালোবাসা কোনো কালে সামাজিক চোখ রাঙানীকে ভয় পেয়েছে? আমার জানা নেই। ভালোবাসা ভয় পেয়েছে আইনকে? এই প্রশ্নের উত্তরও আমার কাছে অজ্ঞাত। চুম্বন হল দুই ঠোঁটের স্পর্শ দিয়ে কাউকে আদর করা বা স্নেহ প্রকাশ করা। সাধারণভাবে প্রেম, কাম, স্নেহ, অনুরাগ, শ্রদ্ধা, সৌজন্য অথবা শুভেচ্ছা প্রকাশার্থে অন্য কারো চিবুক, অধরোষ্ঠ, করতল, কপাল বা অন্য কোন অঙ্গে ঠোঁট অর্থাৎ অধরোষ্ঠ স্পর্শ করা। সৌভাগ্য কামনায়, সম্মান প্রদর্শনার্থে বা কিছু প্রাপ্তির আনন্দ প্রকাশার্থে ওই বস্তুতে অধরোষ্ঠ স্পর্শ করানোও চুম্বন। স্নেহ-ভালবাসা প্রকাশার্থে চুম্বন একটি সাধারণ প্রথা। মানবসমাজে চুম্বনের শুরুটা কোথায়, আর কীভাবে? উত্তর দেয়াটা বেশ কঠিন। তবে ১৯৬০ সালে ইংরেজ প্রাণিবিজ্ঞানী ডেসমন্ড মরিস প্রথম প্রস্তাব করেন যে, চুম্বন সম্ভবত উদ্ভূত হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষ প্রাইমেট মায়েদের খাবার চিবানো আর সেই খাবার অপরিণত সন্তানকে খাওয়ানোর মাধ্যমে। শিম্পাঞ্জি মায়েরা এখনও এভাবে সন্তানদের খাওয়ায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও ব্যাপারটা ঠিক এভাবেই এবং এ কারণেই তৈরি হয়েছিল। আর এভাবেই একটা সময় চুম্বন মানববিবর্তনের একটি অংশ হয়ে ওঠে। এর পরিধি বৃদ্ধি পায় সন্তানের প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রেমিক-প্রেমিকার রোমান্টিকতায়, যার নানা ধরণের অভিব্যক্তি আমরা লক্ষ্য করি মানবসমাজের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে।
শরীর বিজ্ঞান বলছে, মানুষের ঠোঁট হল দেহের সবচেয়ে পাতলা ত্বক। দেহের বাইরের দিককার ত্বকের সবকটা অংশ করনিয়াম নামের আবরণে আবৃত থাকে। ঠোঁট এতে একমাত্র ব্যতিক্রম, তাইতো ঠোঁটের ত্বক এত বেশি কোমল, নমনীয়।ত্বকের সংবেদনশীলতা নিয়ন্ত্রণের যে সংবেদী ছোট ছোট অণু রয়েছে তাদের ঘনত্ব ঠোঁটের ত্বকে অন্য যে কোনো জায়গার চেয়েও অনেক বেশি। ঠোঁটের সংবেদনশীলতা সরাসরি মস্তিষ্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ঠোঁট মানবদেহের অন্য যে কোনো জায়গা অপেক্ষা অনেক বেশি স্পর্শকাতর।
খোলা চিঠি ফুরিয়ে এলো মনে হয়। মনে পড়লো সেই পাখি দুটির কথা। তারা বাতাসের কন্ঠস্বর শুনে অমরত্ব পেয়ে গেছে হয়তো। আর অমরত্ব তো স্বাধীনতা। জনম জনম বেঁচে থাকার বিশ্বাস। মানুষ অমরতা পায় না। পায় না স্বাধীনতাও। সেই যুগলের পরিণতি বিষয়ে আমার কাছে আর কোনো সংবাদ নেই। তবে এটুকু বিশ্বাস করতে চাই, ভালোবাসা যুগ যুগ ধরে তার মানবিক প্রকাশভঙ্গী নিয়ে এগিয়ে থাকুক। মানুষের মনে হিংসার বদলে জয়ী হোক ভালোবাসা।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃমানজারে হাসিন মুরাদ, গুগল