পচা হোক কলকাতা আমারই…

সুব্রত গোস্বামী

হতভাগারা পাঁচফোড়ন কী জিনিস জানেনা! কাল রাতে ভাবলাম একটা হাল্কা করে আলু-ঢ্যাঁড়শ ভাজা করি আর ডাল ভাত ডিমভাজা। এমনিতেই রাত হ’য়ে গেছে, এই সাঁটিয়েই চারজন শুয়ে পড়ব। এই পাঞ্জাবিবাগ এলাকার একটা দোকানেও পাঁচফোড়ন নেই। হয়ত গোটা মধ্যপ্রদেশেই পাঁচফোড়নের ব্যবহার নেই! আলাদা আলাদা করে মশলাগুলো নিয়ে যে বানিয়ে নেব সে উপায়ও নেই। কালোজিরে আর রাঁধুনি কী জিনিস বোঝাতে পারলাম না। মৌরিকে হিন্দিতে সফ বলে জানতাম। জিরে যখন জিরা, কালোজিরেও কালি বা কালাজিরা হ’বে। কিন্তু রাঁধুনি? বলেছিলাম না, যত বিটকেল কাণ্ড আমার সাথেই ঘটে? দোকানে এক ভদ্রমহিলা জিনিস কিনছিলেন। হয়ত জানেন ভেবে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম। জানতে পারলাম এখানেও একরকম পাঁচমশলা পাওয়া যায়। আমাদের তিনমশলার গরমমশলা, এদের পাঁচের। সঙ্গে পোস্ত আর গোলমরিচ। ভদ্রমহিলা আমাদের সমস্যার সমাধান দিতে পারলেন না। কিন্তু উনি বললেন, “আপ ইধার হোস্টেলমে রেতে হে? মে স্টুডেণ্ট লোগোকে গরমে খানা পাকাতি হু। আপ মুঝে রাখ সকতে হে।” বুঝলাম ইনি রাঁধুনি হলেও আমরা যে রাঁধুনি খুঁজছি তা তিনি নন। অগত্যা গোটা জিরে দিয়েই কাজ চালাব ঠিক করে নিলাম।

দোকানি আমাদের উড়িয়া ভেবেছেন দেখলাম। বললেন, “আপ ওডিসা সে হো?”
-“নেহি নেহি। বঙ্গাল সে।”
ব্যাস, অমনই উনি শুরু করে দিলেন।
“কলকাত্তা হাম তিন তিনবার ঘুমকে আয়ে। সব দেখা, সবকে সব দেখা। জেন টেম্পাল্ হে না উধার? আসপাস এক ফ্রুট মার্কিট হে। উধার ভি গে থে।”
কানের কাছাকাছি এসে একটা চোখ ছোটো করে বললেন, “সোনাগাচ্ছি ভি গে থে। মাগার কুছ মাইণ্ড মাত করো স্যর, কলকাত্তা হামকো আচ্ছা নেহি লাগা। উহা কা ইনসান ভি কুছ ঠিক নেহি লাগে।”

বাইরে এসে অন্যের মুখে এইরকম শুনলে মাথাটা বেশ গরম হ’তে থাকে। “কিউ, ক্যা কিয়া কোলকাতা ওয়ালোনে আপকে সাথ?”
-“দেখিয়ে, মে যব বোলা কি মে এক জেন সামুদায় কে আদমি হু, উনহে হামকো কুছ খাতিরদারি করনা চাহিয়ে থা কি নেহি?”
-“ক্যা খাতিরদারি করেঙ্গে আপকি? আপ অলগসে ক্যা এক্সপেক্ট করতে হ্যায়?”
-“নেই নেই, হাম যব পুছে কি হামকো ইয়ে জগহ্ যানা হে, ইয়ে নেই খানা হে, উনকো মালুম হোনা চাইয়ে থা কি নেই? ভাই হাম জেন সামুদায় কে আদমি হে?”
-“সুনিয়ে, ইয়ে যো আপনে পহেলেহি আপনা ধর্ম্ উধার খোল দিয়ে, আপ ওহিপে হি ফঁস গয়ে। হামারে কোলকাতামে কিসিকি খাতিরদারি করনে কে লিয়ে কোয়ি ধর্ম্ নেহি দেখতা হ্যায়। ওয়াহাঁ সারে ধর্ম্ একসাথ হ্যায়। আপকে ইয়াহাঁ য্যায়সা কোই ভেদভাও নেহি করতা হ্যায়। সমঝে?”

লোকটা পুরো চুপ করে গেলেন। কী যেন একটা ভাবতে শুরু করলেন। আমরা জিরে নিয়ে চলে এলাম। আমি জানি, আমি যে উত্তরটা দিয়ে ওকে চুপ করিয়ে দিলাম, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতে আমাদের শহরের প্রেক্ষিতেও এটা মিথ্যে হ’তে চলেছে। তবুও, জিততে হবে তো। আমার পচা কোলকাতা আমারই।

ছবি : লেখক