স্মৃতির পাখীরা

কাকলী আহমেদ

‘স্মৃতির পাখিরা’ এক ধরণের স্মৃতিগদ্য। যেন ফেলে আসা জীবনের সুখদুঃখময় বসবার ঘর। কত চরিত্র এসে বসে সেখানে, কত চরিত্র বিদায় নেয়। মাঝখানে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলা শহরের ঘ্রাণ হয়তো। কাকলি আহমেদ সেই বসবারঘরের গল্প বলতে চেয়েছেন প্রাণের বাংলার পাতায় তার ‘স্মৃতির পাখিরা’ কলামে।

কাকরাইলের এই বাড়িটাতে আমরা প্রায় পৌনে দু’বছর ছিলাম। ভাড়া বাড়িতে কোন না কোন অসুবিধের কারণে এক বাড়িতে বেশিদিন থাকা হতো না।নতুন যে কোন এক মহল্লায় এলে পাড়ার কিছু মানুষের সঙ্গে চেনা জানা,আলাপ পরিচয়, মনের কথা খুলে বলার মতো মানুষ তৈরী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ি ছেড়ে দেবার ঘন্টা বেজে উঠতো। কাকরাইলের এই বাড়িতে আমরা যখন এলাম সেটা ১৯৭৮ সালের এক জুলাই মাস। সাধারণত বাড়ি পাল্টাবার কাজটা আম্মা সব সময় জুন জুলাই অথবা জানুয়ারি মাসেই করার সিদ্ধান্ত নিতেন।এর কারণ বার্ষিক অথবা ষান্মাসিক পরীক্ষা হয়ে যাবার পর জুন/জুলাই অথবা ডিসেম্বর/জানুয়ারি মাসে লেখাপড়ার ঝঞ্জাট কম থাকতো। আমরা তিন বোন। আমার এক বছরের বড় আলো ঠিক আমার এক ক্লাস উপরে পড়তো। আমার ছোট বোন মুনিয়া আমার চেয়ে সাড়ে চার বছরের ছোট। অর্থাৎ আমার বড় বোনের চেয়ে সাড়ে পাঁচ বছরের ছোট। সে অনেকটা আমাদের হাতের তালুতে তুলো রাখার মতো করেই বেড়ে উঠেছে। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে বিরাট খোলামেলা এই বাড়িতে আমরা উঠে এলাম। বাড়িটার সৌন্দর্য্যই ছিল বিশাল খোলা জায়গা। কাকরাইলের বড় রাস্তার সঙ্গে টিনের প্রধান ফটক। চারিদিকে পুরো জায়গার সীমানা ইটের দেয়ালে ঘেরা। এ বাড়ির সীমানা শুরু হবার আগেই ছোট একটা গলি ঢুকে গেছে। গলির ভিতরে অনেকখানি জায়গায় কয়েকটি টিনের বাড়ি। এক একটা বাড়ির মালিক এক একজন। তারা সবাই আপন ভাই। জায়গা ভাগ করে নিয়ে নিজ নিজ বাড়ি তুলে নিয়েছে। টিনের দরজা খুলে বেশ খানিকটা হেঁটে গেলেই হাতের বাঁ দিকে একেবারেই মূল বাড়িওয়ালা আখতার হোসেন -এর বাড়ি থেকে আলাদা একটি রান্নাঘর। আকারে বিরাট হলেও, রান্না ঘরটি টিনের। চারিদিকে বেড়া দেয়া আর উপরে টিনের চাল। অধিকাংশ সময়ে রান্না ঘরের দরজা ভিড়িয়ে দেয়া থাকে। চার পাঁচটি কুকুরের উৎপাত থেকে খাবার বাঁচিয়ে রাখার তাগিদেই এ ব্যবস্থা নেয়া বোঝা যায়। গলির ভিতর দিয়ে কিছুদূর গেলে যে দুই বা তিনটে পৃথক পৃথক টিনের বাড়ি সে বাড়িগুলো আমাদের বাড়ি থেকে খুব কাছে। সীমানার কাছ ঘেষে। দেয়ালের একাংশ ভেংগে পড়ে যাওয়ায় আমাদের বাড়ির সঙ্গে আসা যাওয়ায় বেশ সুবিধে। আমার মা ছিলেন খুব কড়া মহিলা। চাকরি করে নিজ আত্মসন্মান বাঁচিয়ে তিনটে মেয়েকে কি করে নিয়ম কানুনের মধ্যে মানুষ করতে হয় সে বিষয়ে আম্মার কোন জুড়ি ছিল না। আমাদের সঙ্গে ছিলো বাড়ির সব কাজের সঙ্গী আকলিমা। আকলিমাকে আমার মা বাবা ঠিক মেয়ের মতই আদর যত্নে বড় করেছেন। যদিও পুরো বাড়ির দেখাশোনার কাজ সেই মূলত করতো। আখতার চাচার বাড়ি ছাড়িয়ে চার কদম গেলেই আমাদের বাড়িটা। লম্বা, পর পর স্কুল ঘরের মত অনেকগুলি ঘর। আমরা আড়াইটা রুম আর পিছনের দিকে বিশাল এক বারান্দা নিয়ে থাকতাম। বাড়িটার অনুপুংখ বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবে না। কাকরাইলের বড় রাস্তার সঙ্গের টিনের মেইন গেট খুলে দিলে সোজা এক পথ চলে গেছে। দুই দিকে কত যে বড় বড় গাছ। কড়ই গাছ আছে গোটা চারেক। তার বড় বড় শিকড় মাটির উপর দিয়ে উঠে গেছে। খুব খেয়াল করে না হাঁটলে হোঁচট খেতে হয়। কৃষ্ণচূড়া -র গাছ যখন ফুলে ফুলে লাল হয়ে থাকে, দুপুরের খর তাপে চোখ কুচকে হলেও বার বার সে রক্তিমাভার রূপ মেখে নিতে ইচ্ছে করে সারা গায়ে। বাংলাদেশে টেলিভিশন চালু হয় ১৯৬৪ সালের ২৫ শে ডিসেম্বরে। আমার বাবা তার মাস ছয়েকের মধ্যেই টেলিভিশন কিনে ফেলেন। অত আগে তখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না। সারা পাড়ার মেয়ে, বুড়ো অনেকে সন্ধ্যে হলেই ভিড় করে টেলিভিশন দেখতে চলে আসতো আমাদের বাড়িতে।এত মানুষ বসার অসুবিধার জন্যে ধুম করে আমার বাবা এক সেট সোফাও কিনে নিয়ে আসেন।সময়ের অনেক আগের প্রাপ্তি নাকি ক্ষণস্থায়ী হয় কেবল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের এই টেলিভিশন ফেলেই আমাদেরকে ছুটতে হয়। লুট হয়ে যায় টেলিভিশন। ১৯৭৮ সালেও আমাদের বাসায় টেলিভিশন নেই। ব্যাপারটা একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের বিনোদনে চরম ভাটা মনে হওয়াতেই কিনা বাড়িওয়ালা চাচা আমাদের তিন বোনকেই এক সন্ধ্যায় ডেকে নিয়ে গেলেন টিভি দেখার জন্যে। সেদিন টিভিতে উনার অভিনিত একটি নাটক চলছিলো। হয়ত সেটাও কারণ হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ বাড়ির গাছ পালা,বিরাট খোলা প্রান্তর আমাদের জন্যে চরম বিনোদনের এক পসরা সাজিয়ে বসলো।(চলবে)

ছবি: টুটুল নেছার ও শিলা চৌধুরী