ট্রেন গেছে ছেড়ে

সাব্বিরুল হক

ছোটকালের ট্রেনের রং ভুলে গেছি। এক-একবার একেক রংয়ের মনেহয়। একবার সোনালী। আরেকবার রূপালী। আবার মনেহয় লাল। না, এসব না। খয়েরি বর্ণের ছিলো ট্রেনের শরীর। হেলে দুলে চলার পথে ছড়িয়ে যেত কালো ধোঁয়া।

অনেক জোরে বাঁশী বাজতো ট্রেনের। শোনা যেত বহুদূর থেকে। আওয়াজের আমেজ ভীষণ একটানা। ট্রেন স্টেশনে এসে থামত ভোরে। আমাদের বাসার কাছেই সেই স্টেশন। ট্রেন আসার শব্দ শোনে ভোরেই ভেঙ্গে পড়তো ঘুম। কাঁচা ঘুম চোখে নিয়ে ছুটে গেছি স্টেশনের দিকে।

স্মৃতির ট্রেন চলেছে নিরপেক্ষ ধীরগতিতে।

তার একদমই তাড়া ছিলনা। কাউকে পায়নি সেই ট্রেন। কেউ জানেনি কোথায় গেছে। আছে শুধু তার তীব্র বাঁশীর মতো আওয়াজ।

স্মৃতির রেলগাড়িতে চড়ে যেতে চেয়েছি অনেক দূর। পিছু ডেকেছে তার ঝিক ঝিক্ সুরের ডাক। চলতি পথের সারি সারি ধানক্ষেত। দীঘিতে মাছ ধরার স্থিরচিত্র। মাঠের সারি, ঘাটের সারি।

স্মৃতির ট্রেনে চেপে যাত্রা ছিলো প্রতিনিয়ত।

সেই চলার পথে ফুল আর ছেড়া ফুলের মালা ছিল অগুনতি। ট্রেন চলার ছন্দময় গতির সঙ্গে চারপাশের সব স্মৃতি কথা বলে উঠেছে কতোবার।

ট্রেনের সঙ্গে ছুটে চলার ইচ্ছে করেছে প্রবল। দৌঁড়ে গেছে পিছু পিছু বালকের দল। ট্রেন কি  আর নিয়ে যায় সঙ্গে করে? ঝিকঝিক শব্দের তাল লয়ে ঘিরে ফেলেছে বালকের মনের চারিদিক। অসহায় তাকিয়ে থেকেছে সে ট্রেনের দিকে।

ছোটকালের ট্রেনের রংয়ের কথা স্মরণ না থাকলেও, মনেআছে তার ছেড়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস। মন খারাপে ভরিয়ে দিয়ে তার চলে যাওয়া। ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে রেল স্টেশনে ছুটে যাওয়া… ট্রেন এলো নাকি ? রূপালী বা সোনালী না হয় খয়েরি রংয়ের? তার ছেড়ে যাওয়া ধোঁয়া কালো !

জীবনে ট্রেন বারবারই এসেছে; স্টেশনের নীরবতা ভেঙ্গে দিয়ে, ছুটতে-ছুটতে ছুঁতে চেয়েছে বালকের দল, স্টেশন পেরিয়ে রেলগাড়ি থেমে শেষ হয়েছে যেখানে;

ট্রেন চলেও গেছে শতবার, ছোট ছেলেবেলার

সব দৃশ্যকে সামনে নিয়ে, চারপাশের সবকিছু পেছনে ফেলে দিয়ে, প্রলম্বিত ডাক ছেড়ে;  স্মৃতির অনেকদূর আড়ালে !