বাড়িফিরতে হবে…

সায়ন্তন ঠাকুর

ছাদের একপাশে হাওড়া ব্রিজ আর অন্যদিকে দ্বিতীয় হুগলী সেতু দোলা খায়। মাঝে মাঝে মেঘের ছায়া এসে ঢেকে দেয় দুজনকেই। তার নীচে ছোট ছোট ঘর বাড়ি, পুরনো ছাদে ওঠার লোহার প্যাঁচানো সিঁড়ি, যুবক বটের চারা হাত পা নেড়ে খেলা করে দেওয়ালের কিনারে।রাস্তা দিয়ে বয়ে যায় কত মানুষ, সাদা ট্যাক্সি, হলদে-লাল মিনি বাস কত হাতে টানা উঁচু রিক্সা। নতুন রঙ করা হগ সাহেবের বাজারের চূড়ো ছাড়িয়ে আরও ওপরের ওই পাবের ছাদে বসে থাকে দুজন অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে। সেই ছাদ যার দুদিকে দুটো ব্রিজ, কবেকার জলধারা পেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা। বিয়ারের গ্লাসে ফেনা ওঠে আর চিকেন ল্যাট মে কাইএর গন্ধ ছেলেমেয়ে দুটোর শরীরে ছুঁয়ে ভেসে বেড়ায় এক অলৌকিক শহরের আকাশে।

ওরা গল্প করে, কে কবে কাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল তার গল্প, কে এখনও ছেড়ে যেতে পারছে না সেই পুরনো কিসসা শোনায় পরস্পরকে। একসময় শেষ হয় গল্প। দুজন নেমে আসে নীচে পড়ে থাকা এবড়ো খেবড়ো রাস্তায়। জমে থাকে জল, বন্ধ দোকান বাজার, শ্রাবণের আকাশ ভারী মেঘের বাক্সে বন্দি, চুঁয়ে চুঁয়ে নেমে আসছে জলকণা, রাস্তার হলুদ আলো তাদের চারপাশে। সে সব পার হয়ে মেয়েটির কানের ঝুমকো কিনতে হেঁটে চলেছে দুজন! পুরনো এক শহরে বেজে ওঠে অদৃশ্য স্যাক্সাফোন। শুনশান সদর স্ট্রি ট। অসময়ের ছাতিম ফুটেছে কোথাও ? আততায়ীর মতো তখনই ধেয়ে আসে বৃষ্টি। বঙ্গোপসাগর থেকে এতদূর পাড়ি দিয়েও অক্লান্ত ভিজে বাতাস। জল ও বাতাসের আসন্ন এই দ্বৈরথে একটা ছাতা সম্বল করে ওরাই বা কতদূর যাবে!

ওদের মনে নেই, একদিন সেই কার্তিকের জ্যোৎস্না আর ভুতুড়ে কুয়াশা সম্বলিত ভুলোর চরে সনাতনের গোরুর গাড়ি, আবছা চারকেঁচের আলো, সেই বনমালী তুমি পরজনমে হইও রাধা, কিছুই মনে নেই।

ঘাটে ঘাটে বয়ে যাওয়া পানসি, সিরাজগঞ্জের ঘাট, সারাদিন ধরে কত বিকিকিনি, মাছ বিক্রি করে দিনান্তে ভেসে যাওয়া ক্লান্ত বৈঠা বেয়ে, ছইএর তলায় গরম ভাত আর কাঁচা লঙ্কা-কালো জিরে ফোড়নের গন্ধ মেশা নদীর দামাল বাতাস, সব বিস্মৃত হয়েছে ওরা।

কিছুই মনে থাকে না আমাদের। বারবার ভুলে যাই। মাটির দাওয়া, লাল রাস্তার শেষে একখানি খোড়ো চালের ঘর, ধূ ধূ মাঠ বেয়ে ধেয়ে আসা পৌষের রুখু বাতাস সব বিস্মৃত হই।

তারপর একখানি ছাতা সম্বল করে হেঁটে যাই, ওই যে গির্জার ঘন্টা শোনা যাচ্ছে, মারাঠা ডিচ খালের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রাস্তা, গ্যাসের বাতি জ্বলে উঠছে রাস্তায়, জানবাজারের মুখে বেলফুলওয়ালা বিক্রি করছে তার কুসুম, জুড়ি গাড়ি বাবুদের নিয়ে ছুটে যাচ্ছে হাড়কাটা, প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রি টে, স্টার থেট্যারে বেজে উঠল ক্ল্যারিওনেট, চৈতন্য লীলার পালা আজ, কত বিনোদিনী দাসী আর তিনকড়ি দাসীদের চোখের জল আজ আশ্রয় নিয়েছে মেঘের ওপারে….

আমরা হেঁটে যাই, গঙ্গার ঘাট পার হয়ে, ঘোলা জলের স্রোতে ভেসে যাই, আরও উত্তরে, বারাণসীর আরতি দেখা যায় ওই যে, আরও উত্তরে, গঙ্গা যেখানে সমতল স্পর্শ করলো, আরও ওপরে, ওই যে তুষারাবৃত হিমালয়….কোন যুগের বাতাস বয়ে আসছে

আমাদের আরেক টুকরো এসে পৌঁছায় মেট্রো স্টেশনে। বাড়ি ফিরতে হবে।

ছবি: লেখক