কার্ল মার্কসের মেয়ে

কার্ল মার্কস আর ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস-দুই বন্ধু মিলে সমাজতন্ত্রের যে কাঠামোটি গড়ে তুলেছিলেন তার প্রথম পাঠক ছিলেন ইলিনর। মার্কসের মৃত্যুর পর তাঁর লেখার অনুবাদ, ‘দাস ক্যাপিটালে’ গ্রন্থের সম্পাদনা এবং খোদ কার্ল মার্কসের জীবনীকারও সেই ইলিনর। পাশাপাশি পরিচয়ের সুবাদে অনুবাদ করেছেন হেররিখ ইবসেনের নাটক ‘অ্যান এনিমি অফ সোসাইটি’। তাঁর পুরো নাম জেনি জুলিয়া ইলিনর-কার্ল মার্কসের কনিষ্ঠ কন্যা।

এঙ্গেলস ও ইলিনর

ইলিনর জন্মেছিলেন ১৮৫৫ সালের ১৬ জানুয়ারী। ছয় নম্বর সন্তান হিসেবে কার্ল মার্কস চেয়েছিলেন পুত্র সন্তান। তাঁর বড় দুই মেয়ে ক্যারোলিন আর লরার বয়স তখন দশ-এগারো। মাঝে অকালে মারা গেছে এক পুত্র আর এক কন্যা। তারপর ভূমিষ্ঠ হলো এক কন্যাসন্তান-ইলিনর। শোনা যায় আবারো কন্যাসন্তানের জন্মে কার্ল খুব একটা প্রীত হননি।তবে এক বছর হওয়ার আগে থেকেই এই কন্যা হয়ে ওঠে কার্ল মার্কসের ভীষণ প্রিয়। বড় বোনদের মতো স্কুলে যেতে পারেনি ইলিনর। মার্কস পরিবারের তখন হতদরিদ্র দশা। খাওয়া জোটা নিয়েও আছে সংকট। সেই অবস্থায় বাবার কোলেপিঠে লেপ্টে থেকে বড় হয়েছে ইলিনর। বাবা তখন ‘দাস ক্যাপিটাল’ লিখছেন। বলা যায় এই কন্যা আর ক্যাপিটাল গ্রন্থের একই সঙ্গে গড়ে ওঠা। কার্লের বাড়িতে আর কিছু না থাক, ছিলো অসংখ্য বই। ছোটবেলা থেকে বাবার কল্যাণে ইলিনর শিখেছিলেন অনেক। শেক্সপীয়ারের নাটক ছিলো তার প্রিয়। কিশোরী বয়সে পৌঁছে সেসব নাটক মুখে মুখে আবৃত্তি করতে পারতেন তিনি। নাটকের প্রতি এই আকর্ষণ তাকে পরে নিয়ে গেছে নাটকের মঞ্চের দিকে।

কার্ল মার্কস

লন্ডনের সেই বাড়িতে তখন নিয়মিত আসতেন সে সময়ের বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত মানুষেরা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস আর উইলহেলম লাইব্লেখট।রাজনীতি নিয়ে সেই তুমুল বিতর্ক আর আলোচনাই ইলিনরকে আগ্রহী করে তোলে রাজনীতির প্রতি। ১৮৬৩ সালে পোলিশ বিদ্রোহের সময় ছোট্ট এলিনর চিঠি লিখেছিলো তার কাকুকে পোলিশ প্রোলেতারিয়েতদের সমর্থন জানিয়ে। চিঠি দিয়েছিলো আব্রাহাম লিঙ্কনকেও।

১৮৮১ সালে মারা যান জেনি। ১৮৮৩ সালের জানুয়ারি মাসে বড় দিদি ক্যারেলিন। দুটি মৃত্যুর ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই পৃথিবীকে বিদায় জানান কার্ল মার্কস। বাবা এবং কাকার কাছে সমাজতন্ত্রের যে শিক্ষা পেয়েছিলেন তা কাজে লাগাতে শুরু করলেন তিনি। লেখা, অনুবাদ আর বক্তৃতার কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বাবার জীবনী রচনার সময় বৃটেনে পরিচয় হয় প্রখ্যাত নাট্যকার হেনরিখ ইবসেনের সঙ্গে। তাঁর নাটক ‘অ্যান এনিমি অফ সোসাইটি’। পাঠ করেন ‘ডল‘স হাউজ’। মুখ্য তিন চরিত্রে ছিলেন জর্জ বার্নাড শ, ইলিনর এবং তাঁর স্বামী অ্যাডোয়ার্ড অ্যাভেলিং। প্রথমে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক ফেডারেশন নামে একটি দল গঠন করেন। ছিলেন সোশ্যালিস্ট লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও।

জেনি জুলিয়া ইলিনর

মার্কস-এর লেখায় যে বিষয়টি খুব জোরেশোরে উচ্চারিত হয়নি তা হচ্ছে নারী মুক্তির প্রসঙ্গ। নারী মুক্তির সেই প্রসঙ্গটিকেই পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে নিয়ে এলেন ইলিনর। ভিক্টোরিয় ইংল্যান্ডে নারীরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, বেশীরভাগ পেশা থেকে তাদের দূরে সরিয়ে রাখা হতো, ছিলো না ভোটের অধিকারও। নারীদের ভোটাধিকার নিয়ে তখন আন্দোলন শুরু হয়েছে। ইলিনর সমর্থন করলেন সেই সংগ্রামকে। যদিও মন থেকে তিনি বিশ্বাস করতেন, পুঁজিবাদী সমাজে মধ্যবিত্ত সমাজে মহিলাদের এটুকু সংস্কারের মাঝে হারিয়ে যায় আসল মুক্তির প্রসঙ্গটি। তাঁর কাছে আসল প্রশ্নটি ছিলো অর্থনীতি আর শ্রেণীবিন্যাসের। এই বিষয়গুলো নিয়ে তিনি লিখে ফেললেন সমাজতান্ত্রিক নারীবাদের প্রথম বার্তা-‘দ্য উওম্যান কোয়েশ্চেন’।

ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের পরিবারের সঙ্গে শৈশবে ইলিনর

ব্যক্তি জীবনের এলোমেলো হাওয়া এলোমেলো করেছিলো ইলিনরের জীবন। ১৮৯৫ সালে মৃত্যুর আগে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তাঁকে জানিয়ে যান মার্কস পরিবারের ঘরকন্না দেখাশোনার কাজে নিয়োজিত হেলেনের পুত্রের পিতা ছিলেন মার্কস স্বয়ং। খবরটি বিধ্বস্ত করে দেয় ইলিনেরের মন। তখন ঘরে তাঁর অসুস্থ স্বামী। ইলিনর জানতেন সেই মানুষটির আয়ু আর বেশীদিন নয়। আর সংসারে স্বামী তাকে দিতে পারেনি সুখের সন্ধান। গোপনে বিয়ে করেছিলেন এক যুবতী অভিনেত্রীকে। আর হয়তো এইসব হতাশা থেকেই মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে বিষ খেয়ে আত্নহত্যা করেছিলেন জেনি জুলিয়া ইলিনর। তবে ইতিহাসে তাঁর আত্নহত্যার কারণ কোনোদিন নিশ্চিত করেনি।

সর্বজয়া ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ এইসময়, কলকাতা

ছবিঃ গুগল