দুটি অণু গল্প

ফেসবুকে জনপ্রিয় পেইজ পোস্টবক্স। তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব এলো প্রাণের বাংলার পাতায় তাদের গল্প লেখকদের অণুগল্প ছাপার। যথারীতি গল্প আহ্বান করা হলো পোস্টবক্সে। বিষয়-এ কাপ অফ কফি, কফি খেতে খেতে জীবনের নানা কৌণিকে আলো ফেলে গল্পের খোঁজ। যথেষ্ট সাড়া মিলেছে। সেসব গল্প থেকে বাছাই করে প্রাণের বাংলায় গেল সপ্তাহে ছাপা হয়েছে দুটি গল্প। এবার মুদ্রিত হলো  ‘আ কাপ অফ কফি’গল্প পর্বের বাকী দুটি গল্প।

অপেক্ষার ডায়েরী

আবু সালেহ মোহাম্মদ সালেহীন

উত্তরার দিয়াবাড়ির একটি রুফটপ কফিশপে থেমেছি। শুক্রবার, তাই এখানে বসার কোন জায়গা ফাকা নেই। এক কোণায় রেলিং এর পাশে একটি টেবিলে বয়স্ক এক ভদ্রলোক বসা। গভীর দৃষ্টিতে সে বাহিরের দিকে আনমনে চেয়ে আছেন। থেকে থেকে কফির মগে চুমুক দিচ্ছেন। শান্ত এবং স্থির চুমুক। উনার সামনের সিটট ফাঁকা।

তারা কাছে যেয়ে জানতে চাইলাম ওখানে কি কেউ আছে কিনা। উনি হেসে হাতের ইশারায় বসতে বললেন। কিন্তু কোন কথা বললেন না। আধা পাকা চুল, মুখে গাম্ভীর্য। সর্বোপরি তার পোষাকে আশাকে ব্যক্তিত্বের ছাপ স্পষ্ট। তবু নীরব কেন তা বুঝতে পারছিনা। কিছুক্ষণ পর বিল চুকিয়ে উঠে পড়লেন।

ওয়েটারকে আমার জন্য এক কাপ ধোয়া তোলা ক্যাপাচিনো দিতে বললাম।

কফিশপটি খুব ছোট কিন্তু পরিচ্ছন্ন এবং খোলামেলা। একপাশে শান্ত-স্থির রাস্তা, পশ্চিম পাশে দুটো কৃষ্ণচূড়া গাছ। সেখানে শোভা পাচ্ছে ফুটে থাকা লাল রং এর হাজারো কৃষ্ণচূড়া ফুল। আজ দুপুরে বৃষ্টি হয়েছে, থেমে থেমে শীতল বাতাস বইছে। আমি আনমনা হয়ে প্রকৃতি দেখছি।

এমন সময় খেয়াল করলাম, টেবিলের কোণে ভদ্রলোকটির বসার জায়গায় একটি ডায়েরী পড়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে ডায়েরীটা অনেক দিনের পুরানো কিন্তু অতি যত্নে রাখা।

আশে পাশে উনাকে খুজলাম, কিন্তু ততক্ষণে উনি বের হয়ে গিয়েছেন।

কৌতুহলবশত ডায়েরীটা হাতে নিলাম। ভেতরে নাম ঠিকান বা ফোন নাম্বার কিছু লিখা নেই।

 

পাতা উল্টাতে চোখে পড়লো একটি কবিতা।

“আচ্ছা, খুব বেশি কি খারাপ হতো?

যদি তুমি আমার হতে, আমি তোমার হতাম?

না হয় থাকার ঘরটি ছোট্ট হতো,

মান অভিমানে পূর্ণ হতো।

এলোমেলো জীবন আমার,

তোমার ছোয়ায় গুছিয়ে যেত!

আচ্ছা, খুব বেশি কি খারাপ হতো?

যদি তুমি আমার হতে, আমি তোমার হতাম?

বিকেল বেলা শিউলি তলে,

হাটার ছলে তোমার সাথে গল্প হতো!

আচ্ছা, খুব বেশি কি খারাপ হতো?

যদি তুমি আমার হতে, আমি তোমার হতাম?

তোমার সঙ্গে কাঁশবনে,

নির্জনতায় হেটে বেড়াতাম!

আচ্ছা, খুব বেশি কি খারাপ হতো?”

কবিতাটির নাম দিয়েছেন “স্বপ্নজাল”।

আজ থেকে প্রায় দশ বছর পূর্বে লিখা।

এগুলো পড়ে খুব কৌতুহল জেগেছে। যে করেই হোক ডায়েরীটা এবার ভদ্রলোকের কাছে পৌঁছে দিতেই হবে।

পাতা উল্টাতেই দেখি খুব যত্ন করে কিছু লিখা আছে। অনেকগুলো ছোট্ট ছোট্ট কাহিনী। আরো কিছু পাতা উল্টানোর পর একটি লিখায় চোখ আটকে গেলো।

“জানো আমার একটি আকাশ আছে,

সে আকাশে থেমে থেমে বয়ে চলে মেঘ। কখনো বৃষ্টি ঝরতে চাইলেও আমি অনুরোধ করি থেমে থাকার জন্য, তোমার সঙ্গে ভিজবো বলে। জানো, পূর্ণিমায় সে আকাশে চাঁদ ওঠে, হাসনাহেনা তার সুবাস ছড়িয়ে দেয়।

আমি পূর্ণিমার চাদকে অনুরোধ করেছি থেমে থাকার জন্য, তোমার সঙ্গে তার সৌন্দর্য দেখবো বলে। জানো, হাসনাহেনা ফুল গুলোকেও অনুরোধ করেছি, যেন তার সুবাস জমিয়ে রাখে। পূর্ণিমা রাতে যখন তোমার সঙ্গে জোছনা দেখবো, তখন সে যেন সেগুলো প্রকৃতির মাঝে বিলিয়ে দেয়।

তোমার জন্য আমি অপেক্ষারত। আমার সঙ্গে আরো অপেক্ষারত ঝরে পড়ার অপেক্ষায় থেমে থাকা আমার অনুরোধের মেঘ, পূর্ণ সৌন্দর্যে জ্বলে ওঠা ভরা পূর্ণিমার চাঁদ, দক্ষিণ থেকে বয়ে আসা ঠান্ডা শীতল বাতাস।

জানি এ অপেক্ষা শেষ হওয়ার নয়, এ অপেক্ষা অনন্তকালের।

তোমাকে নিয়ে যেই কফিশপে ঘণ্টার পর ঘন্টা বসে কফি খেতাম, আর মুগ্ধ হয়ে তোমাকে দেখতাম, সেখানে এখনো প্রতি শুক্রবার আসি। যদি কোন সময় তোমার দেখা পাই! আচ্ছা, আজো কি তুমি আগের মতন কৃষ্ণচূড়া ফুল পছন্দ কর? জানো কফিশপের পাশে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছোট্ট  কৃষ্ণচূড়া ফুল গাছ দুটি এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। এদেরকে দেখার সময় শুধু তোমার মুগ্ধ চোখ গুলো আমার মনে পড়ে।

জানো তোমার কৃষ্ণচূড়া পছন্দ বলে গ্রামের বাড়িতে রাস্তার দু’ধার ধরে লাগিয়ে রেখেছি একশত বায়ান্নটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। প্রতি বর্ষায় এরা লাল রঙ ধারণ করে তখন এদের দেখতে আমি গ্রামে যাই। প্রতি বর্ষায় আমি এদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজি এবং প্রতিটি গাছের ভাজে তোমাকে খোঁজার চেষ্টা করি। তোমার সেই মুগ্ধ চোখের চাহনি আজো আমি সেই লাল রঙের মাঝে খুঁজে ফিরি। কিন্তু…………”

এখানেই থেমে গেলাম। ওয়েটারের কাছ থেকে জানতে পারলাম  ভদ্রলোকের নাম রায়হান । অনেক পুরাতন কাস্টমার এবং প্রতি শুক্রবার বিকেলে এখানে আসেন, অনেক্ষণ বসে থাকেন। সন্ধ্যা হলে চলে যান।

মনের মাঝে অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,

ভদ্রলোক কি আজো কারো ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন?

যার জন্য ডায়েরীটা লিখা, সে কি আদৌ ভদ্রলোকের এখনকার অবস্থা জানেন?

ভদ্রলোকের অপেক্ষার পালা কি আদৌ শেষ হবে?

পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে। বিকেলের আকাশ তার

চিরচেনা রঙ বদলে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। গোধূলী আলোয়  পাখিরা নীড়ে ফিরছে। আমার ভেতরে প্রশ্ন গুলো ঘুরে ফিরছে। এর উত্তর নেই কোন!

শেষ বিকেলের যাত্রী

ফিরোজ চৌধুরী

নিতু কফি শপে প্রবেশ করতেই রানাকে একটা টেবিলে বসে থাকতে দেখলো। কাছে এগিয়ে আসতেই রানা তাকে সামনের চেয়ারটায় বসতে ইশারা করলো। নিতু চেয়ারে বসে চারিদিকে একনজর বুলিয়ে নিয়ে রানার দিকে তাকিয়ে বললো ,  ‘ কেমন আছো তুমি ? ‘

রানা তার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে আবারও বলে উঠলো , ‘ কিছু খাবে ? ‘ প্রশ্নটা করেই রানা ওয়েটারকে ডেকে দুইজনের জন্য মাফিন , নিতুর জন্য ভেন্টি সাইজের কারমেল ফ্লেভার ও নিজের জন্য মোকাচিনো কফির অর্ডার দিলো।

কফি খেতে খেতে নিতু বলে উঠলো , ‘ তোমার ছেলেমেয়ে কয়জন রানা ? বৌটা দেখতে

কেমন ? খুব সুন্দরী বুঝি ! ‘

রানা আবারও তার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে কফির কাপে চুমুক দিতে লাগলো। একটু পর হঠাৎ করেই রানা নিতুকে জিজ্ঞাসা করলো , ‘ বাবুকে সঙ্গে আনলে না যে ! অনেক বড় হয়ে গেছে বুঝি ? ও এখন কোন ক্লাসে পড়ে ? ‘

‘ ক্লাস ফাইভে পড়ছে। প্রাইভেট টিচার পড়াতে আসবে দেখে আর সঙ্গে  নিয়ে আসিনি। ‘

নিতুর উত্তর শুনে রানা আবারও একটু মুচকি হেসে চুপ করে থাকলো। নিতু এতক্ষণ চুপ করে ছিল। কিন্তু রানা কোন কথা বলছে না দেখে এবার সরাসরি তাকে জিজ্ঞাসা করলো , ‘ কি কারণে এখানে ডেকেছো ? এমনিই অফিস থেকে এখানে আসতে আসতে রাস্তায় অনেক দেরি হয়ে গেল। বাবু ওইদিকে বাসায় একা আছে। যা বলার তাড়াতাড়ি বলো। ‘

রানা খানিকক্ষণ চুপ থেকে মনেমনে কথা গুছিয়ে নিয়ে বলে উঠলো , ‘ আমি আজ রাতের ফ্লাইটে সারাজীবনের জন্য আমেরিকায় চলে যাচ্ছি। আর হয়তো কোনদিন তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে না। তাই শেষবারের মতো তোমাকে ও বাবুকে একনজর দেখতে চেয়েছিলাম। ‘

নিতু একগাদা বিস্ময় নিয়ে রানার দিকে তাকিয়ে বললো , ‘ সারাজীবনের জন্য মানে ? তোমার বৌ বাচ্চা কি তোমার সঙ্গে যাচ্ছে ? ‘

রানা খানিকটা বিরক্ত হয়ে পকেট থেকে একটা খাম বের করে তা নিতুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো ,  ‘জানি তুমি বাবুর জন্য আমার কাছ থেকে কিছুই নিবে না। এমনকি সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকে ছেলেকেও একনজর দেখতে দাওনি। এইযে আজ তুমি বাবুকে রেখে একাই এসেছো , এর কারণও ওই একটাই। ‘

নিতু একটু গম্ভীর হয়ে ঠান্ডা গলায় বললো , ‘ তুমি ঠিকই বলেছো। আমি চাইনা বাবু তোমার কোন স্মৃতি মনে রাখুক। আমি তাকে আমার মতো করেই বড় করতে চাই। আমিতো তোমার পথের কাঁটা হয়ে থাকিনি। তোমাকে একেবারে মুক্ত করে দিয়েই বাবুকে নিয়ে এক কাপড়ে চলে এসেছি। ‘

রানা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললো , ‘ থাক এখন আর এসব কথা বলে কোন লাভ নেই। খামের ভিতর আমাদের বাড়ির দলিলটা আছে যা বাবুর নামে লিখে দিয়ে গেলাম। ‘

রানার কথা শুনে নিতু আবারও ভীষণ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো , ‘ বাবুর নামে লিখে দিয়েছো মানে ? তোমার বৌ বাচ্চা তাদেরকে বাদ দিয়ে বাবুকে কেন ? এতবছর পর তোমার বাবুর প্রতি কর্তব্য জাগলো বুঝি ? লাগবেনা তোমার বাড়ির দলিল পত্র। এগুলো তুমি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারো। এসবের আমাদের কোন প্রয়োজন নেই। ‘

রানা এবার বেশ খানিকটা বিরক্ত হয়ে বললো ,

‘ সারাজীবন তুমি আমাকে ভুলই বুঝে গেলে। তুমি এতদিন যা ভেবে এসেছো তা সঠিক নয়। আমি আর দ্বিতীয়বার বিয়ে করিনি নিতু। তাই বাচ্চা হওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। ‘

নিতু বিস্ময়ে বধির হয়ে কিছুটা জোরের সঙ্গেই বলে উঠলো , ‘ মিথ্যা কথা ! তাহলে ওই মেয়েটা কে ? যার জন্য তুমি আমাদের একলা ফেলে সেই রাতে ছুটে গিয়েছিলে ? বলো তুমি এসব কি মিথ্যা ! ‘

নিতুর উত্তেজিত চেহারার দিকে তাকিয়ে রানা বেশ শান্ত গলায় বললো , ‘ ওই মেয়েটা আমার বোন। বাবা সবার অজ্ঞাতে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন। মাও সেটা জানতেন না। তবে তিনি কিছু একটা সন্দেহ করতেন। আমারও কিছুই জানা ছিল না। বাবা মারা যাওয়ার আগের মুহূর্তে তিনি আমাকে সব জানিয়েছিলেন। সেদিনই প্রথম জানতে পারি আমার আরও একটা মা আছেন। এমনকি ওই পক্ষে আমার একটা বোনও আছে। বাবার মৃত্যুর কিছুদিন পর আমার ওই মাও মারা যান। সেদিন সেই রাতে তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে আমি তোমাদেরকে ফেলে সেখানে ছুটে যাই। একদিকে বাবার মানসম্মান , আরেকদিকে আমার বাপ মা মরা এতিম বোনটিকে কার কাছে রেখে আসবো বুঝতে পারছিলাম না। অবশেষে তার বছর দুয়েক পর আমার বোনের বিয়ে দিই। সে এখন তার স্বামীর সঙ্গে বিদেশে থাকে। সংসার ভেঙ্গে যাচ্ছে বুঝতে পেরে তোমাকে আমি সব খুলে বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কোনদিনও তুমি আমাকে সেই সুযোগটা একটিবারের জন্যও দাওনি। থাক আর এসব কথা বলে কোন লাভ নেই। আশাকরি এখন এই খামটা নিতে তোমার আর কোন আপত্তি থাকার কথাও নয়। তাছাড়া বাসায় বাবু মনেহয় একাই আছে। তাই তোমাকে আর দেরি করাবো না। আজ এতগুলো বছর আমরা দুজনই একা থাকতে থাকতে আমাদের দুইজনেরই হয়তো আলাদা দুইটা জগৎ তৈরি হয়ে গেছে। আশাকরি সেখানে তুমি ও আমি ভালই আছি। রাতে যেহেতু ফ্লাইট , তাই আমাকেও রেডি হতে হবে। আর কিছু বলার নেই আমার। আমি তাহলে উঠি কেমন। ‘ কথাটা বলেই রানা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিতুর বিস্ময় ভরা চাহনি উপেক্ষা করে ধীরে ধীরে কফি শপ থেকে বেরিয়ে যায়।

ছবি: গুগল