২২ শে শ্রাবণের দিকে…

জুলাই, ১৯৪১। উত্তরায়ণের ‘উদয়ন’ বাড়ির দোতলায় ‘কবিকক্ষে’ কবি।খুবই অসুস্থ। প্রায় প্রতিদিনই জ্বর আসে। খাওয়া-দাওয়াও রুচি নেই।আষাঢ় মাস।কবি হৃদয় চঞ্চল বর্ষা দেখার জন্য।কবিকক্ষে বসেই তিনি তাঁর প্রিয় ঋতু বর্ষার প্রাকৃতিক শোভা দেখেন।মাঝে মাঝে বলেন,কবে যে ছুটি পাবো- কোনো কাজ থাকবেনা। বসে বসে শুধূ আকাশ দেখবো।গাছ দেখবো।পথ দিয়ে লোকজন যাচ্ছে-এই দেখে দেখে কাটিয়ে দেবো।তা নয়, কেবল লেখা আর লেখা। আর ভালো লাগেনা।ছবিও আঁকতে পারছি নে।যখনই ভাবি আঁকি এইবারে-অমনি মনে হয় এই-এইকাজ বাকী আছে, সেসব সেরে আঁকবো।কিন্তু সেই বাকি বাকিই থাকে।কেমন সুন্দর মেঘলা করেছে। টিপ টিপ বৃষ্টি ঝরছে। এমন দিনে কোথাও চুপটি করে বসে এইসব দেখবো-না কাজ আর কাজ- লেখা আর লেখা।

আপন মনে কবি

কবির অসুস্থতা আরো বেড়ে গিয়েছে। তখন কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ও আশ্রম সচিব সুরেন্দ্রনাথ কর কয়েক জনকে নির্বাচিত করলেন কবির দেখভাল ও সেবাযত্ন করার জন্য । ‘উদয়ন’ বাড়িতে রোগশয্যায় কবিকে সেবা করার জন্য নিযুক্ত হলেন সুরেন্দ্রনাথ কর নিজে, বীরেন্দ্রমোহন সেন, অনিল চন্দ, বিশ্বরূপ বসু, সুধাকান্ত রায়চৌধুরী, সরোজরঞ্জন রায়চৌধুরী। মহিলাদের মধ্যে দায়িত্ব দিলেন নন্দিতা কৃপালনী, রানি মহলানবিশ, রানী চন্দকে। বিশ্বরূপ বসু ও নন্দিতা কৃপালনী বয়সে সবার চেয়ে ছোট ছিলেন। সকলে মিলে দু’বেলা পালা করে কবির দেখাশোনা করতেন। রথীন্দ্রনাথ এক বিদেশি মহিলাকেও নিযুক্ত করেছিলেন বাবার সেবার কাজে ।

কবির আরোগ্য লাভে সকলেই প্রায় সন্দিহান।কিছুতেই রোগের উপশম হচ্ছে না।হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি, কবিরাজি কিছুই বাকি নেই। যে যা বলেন তা-ই করা হচ্ছে। কিন্তু কবির কষ্ট দিন দিন বেড়েই চলছে।মুখবুজে সব সহ্য করছেন কবি।একমাত্র আশা তখন অপারেশন।আর এই অপারেশনেই কবির বড়ো অনীহা। বলেন,মানুষকে তো একাদিন মরতে হবেই। একভাবে না একভাবে শরীর শেষ হবেই। তা এমনি করেই হোক না।মিথ্যে কাটাকুটি ছেঁড়াছুড়ি করার কি প্রয়োজন?

১৬ জুলাই।ডা. বিধানচন্দ্র রায় ও আরও ক’জন চিকিৎসক শান্তিনিকেতনে এলেন ।তাঁরা কবির চিকিৎসা বিষয়ে আলোচনায় বসলেন।ডা. রায় ও তাঁর সহযোগীরা এলেন কবির কক্ষে।চিকিৎসা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে  বিধানচন্দ্র রায় কবিকে বললেন, আপনি আগের থেকে একটু ভালো আছেন।এখন আপনার অপারেশনটা করিয়ে নিতে পারলে ভালো হবে, আর আপনিও সুস্থ বোধ করবেন।

এবার কবিকে অপারেশনের জন্য কলকাতায় আনার কথাবার্তা চলছে।নিয়ে যাবার আয়োজনেরও তোড়জোড় ।

শান্তিনিকেতনে সভায়

শান্তিনিকেতনের সঙ্গে কবির যে নিবিড় সম্পর্ক।সবার মন খারাপ।শান্তিনিকেতন, বোলপুর, শ্রীনিকেতন, ভুবনডাঙা, সুরুল, মহিদাপুর, গোয়ালপাড়া, পারুলডাঙা, আদিত্যপুর-সহ সমস্ত এলাকার মানুষজন, ছাত্রছাত্রী, কর্মী, শিক্ষক, আশ্রমিক, সবার কাছেই খবরটা খুব দ্রুত পৌঁছে যায়, পর দিন সকালে কবিকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। স্বভাবতই সকলের মন ছিল বেদনায় ভারাক্রান্ত।তবুও সেই বিষাদময় আবহের মাঝখানেই চিকিৎসার কারণে কবিকে নিয়ে যেতে হলো কলকাতায়। এক করুণ ঢেউ হয়ে জেগে উঠেছিলো কবির শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে। বিকেলের পড়ন্ত বেলা, দিনের শেষে পশ্চিমের আকাশে রবি ঢলে পড়েছে। আর ঠিক সেই সময় সবার পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রাণের রবি ঠাকুরের আশ্রম ছেড়ে কলকাতা যাত্রার খবরে সবার মনট কেমন উদাস ও বিষণ্ণ হয়ে গেল। ।

২৫ জুলাই কবি খুব ভোরে উঠেছেন। তৈরি হয়ে, ‘উদয়ন’-এর দোতলায় পুব দিকের জানালায় আশ্রমের দিকে চেয়ে বসে আছেন। হয়তো ভাবছিলেন তাঁর প্রিয় আশ্রম ছেড়ে যাওয়ার কথা।শান্তিনিকেতনের মাটিতে সেদিনই তাঁর শেষ স্পর্শ।ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মী ও আশ্রমিকের দল সমবেত কণ্ঠে ‘এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার’ গানটি গাইতে গাইতে উত্তরায়ণ বাড়ির ফটক পেরিয়ে, লাল মাটির কাঁকুরে পথ ধরে উদয়ন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। আশ্রমগুরু রবীন্দ্রনাথ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে একান্ত চিত্তে বৈতালিকের সঙ্গীত-অর্ঘ্য গ্রহণ করেন।

ক্রমে কবির কলকাতা যাত্রার সময় এগিয়ে আসছে। একে একে আশ্রমিকেরা বেদনার্ত হৃদয়ে জড়ো হচ্ছেন উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণে। অন্তরঙ্গ সেবকরা খুবই সাবধানে বিশেষ ভাবে তৈরি একটি স্ট্রেচারে করে কবিকে দোতলা থেকে নীচে নামিয়ে আনলেন। উদয়ন বাড়ির নীচের বারান্দায় একটি আরামকেদারায় প্রায় অর্ধশায়িত ভাবে বসানো হয়েছে। তাঁর চোখে নীল চশমা, সমস্ত শরীরে ক্লান্তির সুস্পষ্ট ছাপ।

উদয়ন-এর সামনে এসে দাঁড়াল আশ্রমের মোটরগাড়ি। কবিকে যাতে সরাসরি স্ট্রেচারে করে গাড়িতে তুলে দেওয়া যায়, তাই গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দেওয়া হয়।

উদয়ন থেকে উত্তরায়ণের গেট অবধি রাস্তার দু’ধারে শ্রদ্ধানত আশ্রমবাসীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন অশ্রুসজল চোখে। আকাশে মেঘ, প্রতিটি মানুষের মনেও অস্ফুট ব্যাকুল গুঞ্জরণ। তারই মধ্য দিয়ে কবির গাড়ি ধীরে ধীরে বোলপুরের দিকে এগিয়ে চললো। আশ্রমিকরা তখন সমস্বরে গাইছেন, ‘আমাদের শান্তিনিকেতন…’ আশ্রম থেকে বোলপুর আসার রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ, খানাখন্দে ভর্তি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ চিকিৎসার জন্য কলকাতা যাবেন, খবর পেয়ে বীরভূমের তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড কর্তৃপক্ষ রাতারাতি রাস্তা সংস্কারও করলেন যতটা সম্ভব।

২৫ শে জুলাই শুক্রবার অসুস্থ কবি এলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে।কবি আসছেন কলকাতায় এ খবর জনসাধারণের কাছে গোপন রাখা হয়।তাই ভীড় জমেনি ষ্টেশন বা জোড়াসাঁকোর বাড়িতে।সারাদিনের জার্নিতে, ট্রেনের গরমে কবি ক্লান্ত।যে স্ট্রেচারে করে আনা হয়েছে তাতেই কবি শুয়ে রইলেন।বললেন আর নাড়াচাড়া করোনা। এভাবেই থাকতে দাও।পুরানো বাড়ির দোতলায়, পাথরের ঘরেই তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হলো।

ট্রেনে কলকাতার পথে

বিকেলে দু’একজন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলো। তিনি তেমন কথাবার্তা বলতে পারলেন না।সন্ধ্যার দিকে স্ট্রেচারেই ঘুমিয়ে পড়লেন।রাত সাড়ে সাতটার দিকে ঘুম ভাঙলে বললেন, ভালো লাগছেনা আমার।পাশের ঘরে ডাক্তাররা কেউ না কেউ সব সময়ই থাকছেন।ডাক্তার এলেন নাড়ী দেখলেন।ওষুধ খাওয়ালেন। বললেন, ভয়ের কিছু নেই।খুব দূর্বল হয়ে পড়েছেন কবি।

রাতে তাঁকে স্ট্রেচার থেকে খাটে তুলে শোয়ানো হলো।সে রাতে বেশ ভালো ভাবেই ঘুমালেন কবি।

২৬ জুলাই।সকালে খুব প্রফুল্ল দেখাচ্ছিলো কবিকে।ক্লান্তিটাও অনেক কেটে গেছে।সবার সঙ্গে স্বাভাবিক কথা বললেন।দুপুর নাগাদ ভালোই ছিলেন।বিকেল ৪টার সময় ৫০ সি.সি গ্লুকোজ ইনজেকশন দেয়া হলো কবির ডান হাতের শিরায়।তাতে বেশ ব্যথা পেয়েছেন।হঠাৎ কবির সারা শরীরে ভীষন কাঁপুনি উঠলো।তিন চার জন তাঁকে চেপে ধরে রইলেন।আধঘন্টা ধরে ঠকঠক করে কাঁপলেন তিনি।তারপর ঘুমিয়ে পরলেন।কাঁপুনি ইনজেকশনের জন্যই হয়েছিলো্।খুব কষ্ট পেলেন কবি।জ্বর উঠে গেলো ১০২.৪ ।সেদিন সারারাত তিনি ঘুমিয়েই কাটালেন।

২৭ জুলাই।কবিকে বেশ প্রসন্ন দেখাচ্ছে।বললেন, ডাক্তাররা আমাকে নিয়ে বেশ বিপদে পড়েছে।ওরা কতো ভাবে রক্ত নিচ্ছে। পরীক্ষা করছে কিন্তু তাতে কোন দোষ পাচ্ছে না।এ তে বড়ো বিপদ হলো ডাক্তারদের।রোগী আছে রোগ নেই, ডাক্তাররা তো ক্ষুন্ন হবেই।

অসুস্থতার কারণে আধশোয়া ভাবে বিছানায় ঘুমাতেন কবি।এতে কোমর থেকে ঘাড় অবধি অনেকগুলো বালিশ জমা করে রাখা হতো।হাঁটুর নীচে থাকতো একটা মোটা বালিশ।অপারেশনের পর কিছুদিন সোজা হয়ে শুয়ে থাকতে হবে।তাই ডাক্তাররা বললেন, দু’একটা বালিশ কমিয়ে অভ্যাস করে নিতে।বিকেলে পায়ের নীচের বালিশটা ঠিক করে দিতে গেলে কবি বলেন, আর কেন?পা তুলে থাকা আমার আর চলবে না, উঁচু ঘাড়ও আমার আর সাজবে না।যে ঘাড় কোনদিন নামাই নি আজ ডাক্তাররা বলছে, ঘাড় নামাও-পা সোজা করো। কি অধঃপতন হলো আমার বলো দেখি!

২৯ জুলাই।দু’দিন ধরে কবি খুব বিমর্ষ হয়ে আছেন।অপারেশন নিয়ে ভাবনায় পড়েছেন।বললেন, অপারেশন যখন করতে হবেই তখন তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা চুকে গেলেই ভালো।

রোজ গ্লুকোজ ইনজেকশন দেয়া হচেছ।কবি ডাক্তারদের বলছেন বড়ো খোঁচার  ভূমিকা স্বরূপ ছোট ছোট খোঁচা আর কতদিন চলবে? সবাই জানে কালই অপারেশন হবে কিন্তু কবিকে জানতে দেওয়া হয়নি।কবি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ডেকে নানা ভাবে প্রশ্ন করেন।তিনিও নানা ভাবে এড়িয়ে যান।অন্য গল্প করেন।কবি অপারেশনের ব্যাপারে জানতে চান।বলেন, কতোদূর কি হবে আমাকে বুঝিয়ে বলো আমি আগে থেকে বুঝে রাখতে চাই।জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বলেন,আপনি টেরও পাবেন না।এমনও হতে পারে অপারেশন টেবিলে একদিকে অপারেশন হচ্ছে আর অন্যদিকে আপনি কবিতা বলে যাচ্ছেন।জ্যোতিরিন্দ্রনাথের এরকম কথাবার্তায় কবি বেশ খুশি হয়ে ওঠেন।

রোগশয্যায় কবি

৩০ জুলাই।আজ অপারেশন। সকাল থেকেই তোড়জোড় চলছে।কবি জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে ডেকে বলেন, বলো তো ব্যাপারটা কবে করছো? জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বলেন, এখনও ঠিক হয়নি। ললিতবাবু যেদিন ভালো বুঝবেন সেদিনই হবে।কবি চুপ করে আছেন। যেন কিছু ভাবছেন।

বেলা সাড়ে দশটায় অপারেশনের সবকিছু ঠিকঠাক করে ললিতবাবু কবির ঘরে ঢুকলেন।এবার কবিকে বললেন,আজ দিনটা ভালো আজই তাহলে সেরে ফেলি- কি বলেন?কবি একটু হকচকিয়ে গেলেন।বললেন, আজই? তা হঠাৎ হয়ে যাওয়াই ভালো্।

বেলা ১১টার সময় স্ট্রেচারে করে কবিকে অপারেশন টে্বিলে আনা হয়।এগারোটা কুড়ি মিনিটে অপারেশন শেষ হয়। সেলাই ব্যাণ্ডেজ শেষ হতে আরো আধাঘন্টা লাগে।সব বেশ ভালোভাবেই হয়।

দিনেরবেলা কবি ঘুমালেন।মাঝে মাঝে দু’একটা কথা বলতে চাইলেন। ডাক্তারের নিষেধ তাই থামিয়ে দেওয়া হলো।বিকেলের দিকে বার কয়েক বললেন, জ্বালা করছে। ব্যথা করছে।অন্যদিনের তুলনায় জ্বরও কম ছিলো সেদিন।রাতে ভালোই ঘুমালেন।

৩১ জুলাই।সকালে দু’টো কথাই বললেন মাত্র , জ্বালা করছে। ব্যথা করছে। দুপুর থেকে নি:সাড় হয়ে আছেন।দিনে বেশ ঘুমিয়েছেন। রাতে ভালো ঘুম হলোনা।

১ আগস্ট। সকাল থেকে কবি কোন কথাই বলছেন না।অসাড় হয়ে আছেন।থেকে থেকে যন্ত্রণাসূচক শব্দ করছেন।দুপুরের দিকে কিছু বললে মাথা নাড়ছেন।অল্প অল্প জল আর ফলের রস খাওয়ানো হলো।ডাক্তাররাও বেশ চিন্তিত।

২ আগস্ট।সারারাত আচ্ছন্ন থাকলেও সকালে দু’চারটা পরিস্কার কথা বলছেন।কিছু খাওয়াতে গেলে বিরক্ত হচ্ছেন।দুপুরের দিকে কবি আবার আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। হিক্কা উঠেছে মাঝে মাঝে কাশিও উঠেছে।সারারাত এভাবেই কাটে।

৩ আগস্ট।গত রাতের চেয়ে একটু ভালো।তবে ওষুধ বা কিছু খাওয়াতে গেলে বিরক্ত হচ্ছেন।দুপুর থেকে আবার আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন।

৪ আগষ্ট।সকালবেলা কিছুক্ষন একটু আধটু কথা বলেন।ডাকলে সাড়াও দিলেন।ফিডিং কাপে করে কফি দিলে চার আউন্সের মত খেলেনও।ডাক্তাররা  ‍দু’বেলাই আসছেন।রাত এগারোটার সময় একবার ডানহাত তুলে আঙ্গুল ঘুরিয়ে বললেন, কি হবে কিছু বুঝতে পারছিনে- কি হবে-।তারপর সারারাত আর কথা নেই।

শেষ যাত্রায় কবি

৫ আগস্ট।কবির অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই।সন্ধ্যায় স্যার নীলরতনকে নিয়ে বিধানবাবু এলেন।স্যার নীলরতন কবির পাশে বসে তাঁকে দেখলেন।অন্যান ডাক্তারদের কাছ থেকে কবির অবস্থার কথা শুনলেন।যতক্ষন স্যার নীলরতন কবির কাছে ছিলেন কবির ডানহাতের উপর তিনি তাঁর হাত বুলাচ্ছিলেন।

রাতে স্যালাইর দেয়া হলো কবিকে।অক্সিজেনও আনিয়ে রাখা হযেছে।ললিত বাবু দিনের বেলা অপারেশনের একটা সেলাই খুলে দিয়ে গেলেন।

৬ আগস্ট।সকাল হতে বাড়ি লোকারণ্য।আজ দিনটা যদি কেটে যায় তাহলে হয়তো ভরসা পাওয়া যেতে পারে।

কবি একবার জোরে কেশে উঠলেন।থেকে থেকে হিক্কাও চলছে সমানে।তাছাড়া আর কোন সাড়া নেই কবির।বিকেলও কাটলো একইভাবে।সন্ধ্যে হতে অনেকে ঘরে এসে তাঁকে দেখে যেতে লাগলেন।

রাত ১২টায় কবির অবস্থা বেশ খারাপের দিকে গেলো। কবির শিয়র বরাবর বাইরে পুবের আকাশে পূর্ণিমার ভরা চাঁদ।

৭ আগস্ট ১৯৪১ সাল ২২শে শ্রাবণ।  ভোর হতে মোটরের আনাগোনা জোঁড়াসাকোর সরু গলিতে।নিকট আত্মিয়, বন্ধু পরিজন সব আসছে দলে দলে।পুবের আকাশ ফর্সা হলো।সাদা শাল দিয়ে ঢাকা কবির পা দু’খানির উপর চাঁপাফুল ছড়ানো।বেলা ৭টায় রামানন্দবাবু কবির খাটের পাশে দাঁড়িয়ে উপাসনা করলেন।শাস্ত্রীমশায় পায়ের কাছে বসে মন্ত্র পড়ছেন।বাইরের বারান্দায় ধীরে ধীরে মৃদু কন্ঠে কে যেন গাইছেন-কে যায় অমৃতধামযাত্রী।

বেলা ৯টায় অক্সিজেন দেওয়া শুরু হলো।কবির নিশ্বাস একই ভাবে পড়ছে।ক্ষীণ শব্দ নিশ্বাসের। সেই ক্ষীন স্বাস ক্ষীণতর হয়ে এলো।

বেলা ১২টায় কবির শেষ নিশ্বাস পড়লো।বাইরে জনতার কোলাহল। তারা শেষবারের মত একবার দেখতে চাইছেন তাদের কবিকে।

শেষ শয্যায় কবিকে সাদা বেনারসি জোড়া পরিয়ে সাজানো হলো। কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবী,পাট করা চাদর গলার নিচ থেকে পা অব্ধি ঝোলানো।কপালে চন্দন, গলায় গোড়ে মালা, দু’পাশে রাশি রাশি শ্বেতকমল রজনীগন্ধা।বুকের উপরে রাখা হাতের মাঝে পদ্মকোরক।দেখে মনে হলো রাজাবেশে রাজা ঘুমচ্ছেন রাজশয্যার উপরে।

একে একে প্রণাম করে যেতে লাগলো নারী-পুরুষ। ব্রম্ক্ষসঙ্গীত হতে লাগলো একদিকে শান্তকন্ঠে।কবি যুক্ত হলেন মহাকালের সঙ্গে।

আবিদা নাসরীন কলি

ছবি:গুগল

তথ্যসূত্র: আনন্দ বাজার পত্রিকা ও রানি চন্দের বই গুরুদেব