দশটা চ্যাপ্টার …

সায়ন্তন ঠাকুর

আমার সব মনোযোগ তখন তাদের ছেড়ে রওনা দিয়েছে অন্য এক ভূখণ্ডে। প্রতিদিন সকাল হয়, আস্তে আস্তে আলো ফুটে ওঠে, আকাশে ভেসে বেড়ায় হাল্কা মেঘের দল, রোদ্দুরের সঙ্গে জেগে ওঠে ঘন নীল এক পুরনো আকাশ। দৃষ্টিরেখার বাইরে কোথাও নিশ্চয় ফুটেছে কাশ। আমাদের দূর মফস্বলে ভাঙা পুরোনো বাড়ির উঠোন জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সাদা আর কমলা বোঁটার শিউলি। ট্রেন রাস্তার দু’পাশে ভরা হাওর, তার একটু পর নাবাল জমি তারও পর অনেক শাদা মেঘ ছড়ানো আকাশ পার হয়ে মানুষজনের ফিরে যাওয়া। হরেক কিসিমের ট্রলি আর সুটকেস। আমার ভাবতে ভালো লাগে ওইসব ব্যাগের পেটের ভেতর লুকিয়ে আছে উপহার। প্রিয় মানুষের জন্য বয়ে নিয়ে চলা উপহার। মধ্যবিত্ত সংসারের উপহার।

এসবের পাশেই ফুটে ওঠে আমার দুশ্চিন্তার সকাল। দুবছরের ছেলেকে একটা ক্যাপ বন্দুক, প্লাস্টিকের কিনে দিতে ইচ্ছে হয়, একটা নতুন জামা কিনে দিতেও মন চাই, কিন্তু সেসব সকালে ওত পেতে বসে থাকে এক যুদ্ধবাজ মিগ ফাইটার। যার ডাক নাম অর্থ। রঙিন কাগজের কিছু টুকরো। চাল ফুরিয়ে এসেছে, মুসুরির ডাল, পোলট্রির ডিম, সর্ষের তেল,কিনতে হবে। পুজোর মাঝে একদিন মাংস।

সেসব সকালে ক্রমাগত হাতছানি দিতে থাকে ওই অসমাপ্ত দশটা চ্যাপ্টার। ফোনের ওপার থেকে সন্মাত্রানন্দ বলে চলেন, তোমাকে লিখতে হবে। লিখতেই হবে। মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে অমিতাভ, আমার উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। সেও আমার মতোই অসহায়। তাকে কথা দিয়েছিলাম নিয়ে যাব বস্তার জেলার গভীরে, অবুঝমারিয়াদের ঢোল আর বাঁশির শব্দে জেগে ওঠা এক অন্য চরাচরে। যেখানে ডোঙ্গরদেহি রচনা করেছেন তাঁর মায়া। খুঁজে এনে দেব সেই অলৌকিক নীল রঙ। কিন্তু তাড়া করে ফেরে আমাকে ওই ফাইটার মিগ। দুপুর আসে, রোদ্দুরের গায়ে হলদে ছায়া ফেলে বিকেল, তারও পর সন্ধে। শাঁখ বেজে ওঠে কোথাও। নীল তারা ঢেলে দেয় অস্পষ্ট আলো। আয়ু থেকে মুছে যায় আরও একটা দিন। কিছুই করা হয় না আমার। অসহায় বসে থাকি ওই দশটা চ্যাপ্টারের সামনে। গিলে খেতে আসে অক্ষর।

মনে পড়ে সেই অলৌকিক বাগান ঘেরা বাড়ি। সেও তো আছে। গমগমে। আত্মীয় স্বজনের ভিড়ে ভর্তি। শিউলি গাছটাও আছে। তবে কেউ আর কুড়োয় না। উঠোনে শুয়ে থাকে অনাদরে। একটু আগেই মিথ্যে বললাম। খাঁ খাঁ সে বাড়ি একলা চুপ করে বসে থাকে। আমারই মতো। জেঠু আর হাঁটতে পারেন না। ক্যাপ বন্দুকের দোকানও উঠে গেছে যেন কবে। সে মফস্বলে আমি আর ফিরে যাই না। রোদ্দুর মেঘ আর জোছনা ভেসে যায় আনমনে।

তারপর একদিন গভীর রাতে কলিংবেল বেজে ওঠে। দরজা খুলে দেখি, দাঁড়িয়ে আছে সে। কালো মেহগনি কাঠের মতো চামড়ার রঙ। একফালি সাদা কাপড় কোমড়ে জড়ানো শুধু।খালি গা। কাঁধে সেই পুরনো টাঙি। কণ্ঠায় শিকারি পাখির উল্কি। গমগমে গলায় বলে ওঠে
—অমিতাভ বাবু কোথায় ?
মৃদুস্বরে বলার চেষ্টা করি
—আমি জানি না, আমি পারছি না, আমাকে ক্ষমা করো
—আমি নিতে এসেছি বাবুকে
কথা শেষ করতে দেয় না আমাকে। শিকারি পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা যায় আমার ড্রয়িংরুমে, চারপাশের দেওয়াল ভেদ করে ভেসে আসে টাটকা মহুয়া আর বুনো শালপাতার কাঁচা গন্ধ। ছমছমে আলোয় ভরে ওঠে আমার চেনা পৃথিবী। বুঝতে পারি, আমাকে ফিরতে হবে। ফিরতেই হবে। অক্ষরের কাছে। ডোঙ্গরদেহির কাছে।

দুহাজার কিলোমিটার পথ পার হয়ে আমার জন্যই উঠে এসেছে সে। অনেক দিনের বন্ধু। বলিরাম ভাতরা। আমাকে সঙ্গে নিয়ে সে ফিরে যাবে অবুঝমারের ওই মায়া চরাচরে।

ছবি: টুটুল নেছার