কতটা পথ পেরোলে বলো প্যারিস যাওয়া যায়-পর্ব ছয়

শ্যামলী আচার্য

আখাম্বা উঁচু একখানি লোহার টাওয়ার। বেশ তেকোনা হয়ে খোঁচা মারছে আকাশের আঁচলে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সৌন্দর্য সব মিলিয়ে উপভোগ্য তো বটেই। আরো বেশি করে মনে থাকে, কারণ বিকেলের দিকে তাতে বেশ সাঁ করে উঠে পড়া যায়। কমজোরি হাঁটু বা যন্ত্রণাকাতর কোমর নিয়ে আমা-হেন পাপী দিব্যি তাতে চড়ে নেচে-কুঁদে একসা। এঃ। আইফেল টাওয়ারে হেঁটে হেঁটে উঠবো কেন? প্যারিসের একটা ইজ্জত আছে না! ওদের মান-সম্মানের দিকটাও তো দেখতে হবে! ওদের কথা ভেবে লিফটেই উঠলাম। বেশ বড়সড় ঘরের মত, চারদিক জালে ঘেরা একখানি লিফট। নিজেকে খাঁচা-বন্দি ছাগল-গরু-গাধার সমতুল্য মনে হয়। লিফট-চালিকা অপূর্ব সুন্দরী। কোট-টাই ইত্যাদি ইউনিফর্ম শোভিত। প্রচণ্ড কেতাদুরস্ত। ম্যানিকিউর করা নখে দামিনী চমকিত। মাইক্রোফোন (থুড়ি, ল্যাপেল) নিয়ে বুঝিয়ে বলেন, আমরা কত তলায় আছি। কোথায় নামছি বা উঠছি। কোথা থেকে কি কি দেখা যায়। ভাবতে থাকি, আহা কি চমৎকার চাকরি। মধু-মাঝির নৌকা না চড়ে আগামী দিনের কোনো জেন-ওয়াই নিশ্চয়ই আইফেল টাওয়ারের লিফট চালিয়ে আকাশে ছড়ানো মেঘেদের কাছাকাছি পৌঁছতে চাইবে! ক্ষতি কি?

শোনা যায়, ১৯৪০-এ প্যারিস যখন জার্মানির অধীনস্থ, ফরাসিরা টাওয়ারের লিফটের তার কেটে দিয়েছিল। ফলে এডলফ হিটলারকে পায়ে হেঁটেই এর চূড়ায় উঠতে হয়েছিল। তখন এমনটিই বলাবলি হতো যে হিটলার ফ্রান্স জিতলেও আইফেল টাওয়ার জয় করতে পারেন নি। আহা রে!

বেশ মাথা ঘোরে। ওই যে আগেই বললাম। ভার্টিগো। ওপর থেকে নীচে চাইলে, নীচ থেকে চূড়োয় তাকালে… বাবাগো! ১০৫০ ফুট উঁচু। গুস্তাভো আইফেল রেলের ব্রিজ বানাতেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই ৩০০ শ্রমিক নিয়ে ১৮৮৯ তে এই ভদ্রলোক তাঁর নকশা অনুযায়ী তৈরি করেন পৃথিবীর এই সর্বোচ্চ টাওয়ার। অবশ্য সবাই কি আর সারাজীবন ‘ফার্স্ট’ হয়ে থেকে যেতে পারে? মার্কিন দেশের নিউ ইয়র্ক শহরে ১৯২৫ সালে ক্রাইসলার ভবন তৈরি হওয়ার আগে পর্যন্ত আইফেল ছিল সবার চেয়ে বড়ো। গুস্তাভোর কৃতিত্ব অমর হয়ে আছে তাঁর প্ল্যানিঙে তৈরি টাওয়ারের নামের সংগে। একবার ভাবতে চেষ্টা করলাম উপনিবেশ ভারতবর্ষে একের পর এক সৌধ বা তোরণে কি কখনো খোদাই করা হয়েছে কারিগরের নাম? কেউ কি জানি, তাজমহল বা ভিক্টোরিয়ার মূল ব্লু-প্রিন্ট কোন স্থপতির তৈরি?
দূর। ওসব জেনে কী হবে?জেনারেল নলেজের দুটো এক্সট্রা প্রশ্ন বৈ তো নয়।

আইফেলে চড়া সহজ। আগে থেকে টিকিট কেটে রাখাই ভাল। ইন্টারনেটে সবই সহজলভ্য। এ যাত্রা টিকিট কাটাও ছিল। তবে কিনা সারা সকাল মঁমার্তে কাটিয়ে স্যুররিয়ালিস্ট শিল্পীর মতো আপনা ভুলিয়া মগ্ন হইয়া কিছু ভুলভাল ঘটছিল। বাসে ওঠা। দুম করে ভুল স্টপে নেমে পড়া। আবার আর একটি বাস। সেটি খানিক দূর গিয়ে জানায়, রাস্তায় মিছিল। বাস আর যাবে না। চলো এবার মেট্রোয়। খানিক বাসে, খানিক ট্রেনে, খানিক হেঁটে, তাপ্পর দৌড়ে, বাকিটা গড়িয়ে শেষ অবধি চড়া গেল সেই আইফেলে। বাপস! সগগে পৌঁছনো এর চেয়ে সহজ।

খুব হাওয়া। উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো। রেলিং আর গ্রিলে ঘিরে রাখা চারদিক। অতীতে বহু অ্যাডভেঞ্চার-পিপাসু লোকজন প্যারাস্যুটসহ বা প্যারাস্যুট ছাড়াই লাফ-ঝাঁপ দিয়েছেন বলে বিশ্বস্তসূত্রে খবর। এখন চাপের ব্যাপার। হাজার হাজার ছবি তোলা ছাড়া করণীয় কিছু নেই। চমৎকার দৃশ্যপট। যতদূর চোখ যায় পটে আঁকা শহর। নদী-বাড়ি-রাস্তা।

টাওয়ারের চারপাশে ঘাসে ঢাকা জমি। সাজানো-গোছানো। শুয়ে-বসে-গড়িয়ে নিই খানিকক্ষণ। চ্যাম্প দ্য মার্সে বিশ্রাম নিয়ে কেটে যায় ২৮ মে’র বিকেল।
এখানে চীনেবাদাম ভাজা, ভেলপুরি, ফুচকা, ঝালমুড়ি— কিস্যু পাওয়া যায় না!
যাচ্ছেতাই।

ছবি:লেখক ও গুগল