জীবন একটা বৃত্ত এঁকে শেষ হয়ে যায়

জুনায়েদ সজীব

রাত দুটা। মহাখালি ফ্লাইওভারের পাশে ল্যাম্প পোস্টের গাঁয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নূর জাহান। নামের আগে নূর শব্দটা থাকলেও নূরের ছিটে ফোটাও নাই শরীরের কোথাও। ভিতরটা যেমন ক্ষত বিক্ষত বাহিরটাও তেমন, জায়গায় জায়গায় চামড়া ঝুলে গেছে। কড়া মেকাপে শরীরে ভেসে ওঠা বিশ্রী দাগ গুলো ঢাকা গেলেও নিজের মুখ দেখে নিজেরই কেমন বমি বমি লাগে। এই নূর জাহানকে এক সময় রাস্তায় দাঁড়াতে হতোনা। বড় বড় হোটেল, লাউঞ্জ, বার কোথায় না গিয়েছে সে! কত নামী দামী পুরুষেরা মাত্র একটা রাত নূর জাহানকে কাছে পেতে মুখিয়ে থাকতো। সময় বদলেছে এখন কোন দালাল ধরেও কাজ হয় না। মাত্র পঞ্চাশ টাকা বা একশ টাকাতে রাজী হয়ে গেলেও অনেকেই কাজ শেষে গালি দিয়ে যায়। বুড়া মাগি একটা। টাকাটাই জলে গেল!

নূর জাহান এখন ভ্যানওয়ালা রিকশাওয়ালার অপেক্ষায় ল্যাম্প পোস্টের নিচে দাঁড়ায়। না দাঁড়ালেই বা কি করে চলবে, শরীরের যে পঁচন ধরে গেছে। পায়খানার রাস্তা দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত ঝরে, কোন কিছুই গলা দিয়ে নামেনা। জোর করে গিলতে গেলেও বমি হয়ে যায়। বিছানায় পড়ার আগে যদি একটু চিকিৎসা করা যায়! মেহের আফরোজ। বয়স ৩৯। এই বয়সেই তিনি শয্যাশায়ী। আজ দুই বছর ধরে প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। পাশের ঘরে টিভি চলে গান বাজে। নিজের একমাত্র ছেলের গলা শুনতে পান, ছেলে বউ নাতি সবার শব্দ পান তিনি, আর নিজে পড়ে থাকেন নিশ্চুপ হয়ে। কেউ তাকে দেখতে আসেনা, আসবে কি করে দু’দিন যাবৎ বিছানাতেই সব ত্যাগ করছেন, গন্ধে ঘরে ঢোকা দায়। কাজের বুয়া টাও নাকি না করে দিয়েছে এই সব কাজ সে আর করতে পারবেনা। মেহের আফরোজ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন, জলে ভেজা ঝাপসা চোখে দেখেন মাথার কাছে তার শাশুড়ি বসে আছেন। খুটুর খুটুর শব্দে এক মনে সুপারি ভেঙে যাচ্ছেন। মেহের আফরোজ প্রশ্ন করে – কেমন আছেন মা? আমি ভাল আছি বৌ মা।

তুমি কি বিরক্ত হয়েছো ? আমার সুপারি ভাঙ্গার শব্দে বোধ হয় ঘুম ভেঙ্গে গেল! মেহের আফরোজ আবার কেঁদে ওঠেন। মা আমাকে মাফ করে দিবেন। আপনি বেঁচে থাকতে অনেক অবহেলা করেছি। একলা ঘরে দিনের পর দিন পড়ে ছিলেন উঁকি পর্যন্ত দেইনি। আপনার সুপারি ভাঙ্গার শব্দে বিরক্ত হয়ে কত দূর্রব্যাবহার করেছি। আজ সব কড়ায় গণ্ডায় ফেরত পাচ্ছি। শুন্য দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বৃদ্ধা মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আবার মনযোগ দিয়ে পান ছেঁচা শুরু করলেন। মা… মাগো…. গল্প লিখতে লিখতে গল্পে ডুবে গিয়েছিলাম। আমার গল্পের শেষটা সুন্দর হয়। আজ কেন জানি শেষের কথা গুলো খুঁজে পাচ্ছিনা। শেষটা আপনারা নিজের মত করে দিয়ে নিয়েন। প্রকৃতি কখনো কাউকে ঋনী করে রাখেনা, করায় গন্ডায় হিসাব বুঝিয়ে দেয়। যে বিন্দু থেকে চলা শুরু হয় এঁকে বেঁকে যেদিকেই যাও না তুমি, দেখবে সেই বিন্দুতেই এসে থেমেছো আবার। জীবন একটা বৃত্ত এঁকে শেষ হয়ে যায়, বৃত্তের মাঝে লেখা থাকে – যেমন কর্ম তেমন ফল!!

ছবি: টুটুল নেছার