শৈশবের টিভি দেখা…

কাকলী আহমেদ

আমাদের বাড়ির সীমানা শেষ হতেই অনেকটা বস্তির মতো। একদিন দেখি বস্তি মাড়িয়ে নাবিলা আপা বিকেলবেলা হন হন করে হেঁটে আমাদের বাড়িতে হাজির। নাবিলা খান, উনি আমার বড় বোনের সহপাঠী। ভিকারুন নিসা নুন স্কুলে ক্লাস এইটে আমার বড় বোনের ক্লাসেই পড়েন।আবার বোনের খুব কাছের বন্ধু। তখনকার সময়ে ঢাকার দুই একটি নাম করা স্কুলে যারা পড়তো তাদের পাড়াতে ভাল ছাত্র ছাত্রী হিসেবে নাম ছড়িয়ে যেতো। আমরা দুই বোন তখন ভিকারুননিসা নুন স্কুলে। মুনিয়া তখনো পুরানা পল্টনের ভীষণ নামকরা স্কুল লিটল জুয়েল’স স্কুলে পড়ে। আমরা ঠিক তার আগের বছর খুব কঠিন ভর্তি পরীক্ষায় টিকে এই স্কুলে ভর্তি হয়েছি। লেখাপড়ায় আমি সারাজীবন খুব মনোযোগী ও ফাঁকিবাজ। দুটোই কাট কাট সত্যি। স্কুল থেকে দুপুরে ঘরে ফিরে একটা গোসল খানায় লাইন দিয়ে বসে থাকা বড়ই বিরক্তিকর। খুব ছটফটে আমি দশ থেকে পনের মিনিটে গোসল সেরে ভাত খেয়ে ঘন্টা দেড়েকের মধ্যেই পড়া শেষ করে ফেলতাম। আলো ছিলো অনেকটাই ঢিলা ধরণের। আম্মা চাকরিতে থাকার কারণে পিছনে লেগে থাকার কেউ ছিল না। আলো স্কুল ড্রেস পরেই খাওয়া দাওয়া কিছু না করেই এলোপাথাড়ি হেঁটে বেড়াতো। ঘরে ঢুকেই প্রতিদিনের পেপারে চোখ বুলাবার ছিলো ঝোঁক। আমার পড়া শেষ হয়ে যাবার কিছু সময় পর আবির আশিক স্কুল থেকে এসে হাজির হতো। বাচ্চা দুটো স্কুল ব্যাগ বুড়ো চাচার হাতে দিয়েই দৌড়ে আমাদের বাসায় চলে আসতো। বুড়ো চাচার শত ডাকাডাকিতেও তারা কিছুতেই আমাদের বাসা ছেড়ে যেতো না। না পেরে বুড়ো চাচা হাতে একটা লাঠি নিয়ে মিছেমিছি ভয় দেখিয়ে তাদের নিয়ে যেতো। আমার মাথায় কিছুতেই আসতো না যে, এত ছোট ছোট ছেলে দুটোর মা কোথায়? সামনের টিনের বাড়িতে থাকা মেয়ে স্বর্ণার সঙ্গে খুব অল্প দিনের মাঝেই আমাদের ভাব হয়ে গেলো। স্বর্ণা একদিন আমাকে আর আলোকে এক পাশে ডেকে নিয়ে বললো, আবির আশিকের মা ওদের ছেড়ে চলে গেছে। আবির ছিল তখন অনেক ছোট। ওদের মা কেন চলে গেছে বিষয়টা আমার মনের মধ্যে অনেক তোলপাড় করলেও।

এত ছোট ছোট ছেলে দু’টোর মা কোথায় গেলো? আবির ছিল তখন অনেক ছোট। ওদের মা কেন চলে গেছে বিষয়টা আমার মনের মধ্যে অনেক তোলপাড় করলেও। এটুকু বুঝতে পারলাম, এই জীবনে এমন অনেক কিছুই কারণে ও অকারণে হয়। যার খুব সঠিক কারণের ব্যাখ্যা থাকে ব্যাখ্যাতীত। আশিকের চেয়ে আবির ছিল বেয়াড়া আর ঘ্যান ঘ্যানা ধরণের। অথচ এই ছোট্ট ঘটনাটি ম্যাজিকের মত এই ছেলে দুটিকে আমার খুব আপন করে দিলো। আমি যেন ওদের আপন বড় বোন, শুভাকাঙ্ক্ষী, অভিভাবক সব জায়গাতেই একটু একটু করে ভাগ বসিয়ে ফেললাম। রাতে ওদের ঘরে টিভি দেখার আগে চাচা দুই ছেলেকে তাদের স্কুল ব্যাগ আর বাড়ির কাজ করার জন্যে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। বিকেলে এক স্যার আসতো দুই ভাইকে পড়াতে। কিছুদিন না যেতেই দেখলাম চাচা তাকে বিদায় করে দিলেন। আম্মা এই সন্ধ্যার সময় নিজেদের লেখাপড়া রেখে পাশের বাসার বাচ্চাদের পড়ানোর ব্যাপারটা খুব বেশি মন থেকে মেনে নিতে পারতেন না।

তবে বাচ্চাগুলোর লেখাপড়া দেখার কেউ নেই বলে মুনিয়ার পাশে বসিয়ে দুটো বাচ্চাকে খুব তাড়াতাড়ি পড়া করিয়ে দিতেন। সবার পড়া হয়ে গেলে রাত সাড়ে আটটায় আমরা আবির আশিকদের বাড়িতে টিভি দেখতে যেতাম। রাত আটটার খবর আমাদের মোটেও মোহগ্রস্ত করতো না। আমরা ওদের সোফায় প্রতিদিন এক সিরিয়ালে বসে যেতাম। প্রতিদিন এই বাসায় এসে টিভি দেখার ব্যাপারে আমাদের তেমন লাজ লজ্জাও ছিল না। আম্মা ব্যাপারটা নিয়ে দুই একদিন আপত্তি করে এক সময় হাল ছেড়ে দিয়েছেন। আব্বু বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় দিন দশটা গড়িয়ে যায়। আব্বু প্রতিদিন তাঁর পুরানা পল্টনে বন্ধু জাফুরুল্লাহ চাচার বাড়ি হয়ে আসেন। সেখানে চা সিগারেট আর বিকেলের নাস্তা খেয়ে আড্ডা পিটিয়ে তবেই আসেন।সপ্তাহের মাঝে এমন যাওয়া প্রায় দুই তিন দিন। আব্বুর অনুপস্থিতিতে পাশের বাড়ি গিয়ে টিভি দেখা তো নয় অনেকটা ভক্ষণ করার মতই আমরা দেখে আসি। আর পরের দিন টিফিন পিরিয়ডে স্কুলে এই ইংরেজি ছবি অথবা বিটিভি-র বিখ্যাত সব নাটক ছিল আমাদের গপ্পোগুজবের প্রধান বিষয়। (চলবে)

ছবি: টুটুল নেছার