সুন্দর একটা বিকালের সুন্দর কিছু সময়

সুলতানা শিরীন সাজি

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আমরা রেললাইন দেখলেই থমকে যাই

রাশীক আর রাইয়ানসহ দূরে কোথাও যাওয়া হয়না আজকাল। রাশীক কাজ এ ব্যস্ত থাকে। আর আশেপাশের যাওয়া শহর গুলোতে ও আর যেতেও চায়না। এই সপ্তাহে আমাদের ইচ্ছে ছিল কুইবেক সিটি হয়ে আরো দূরে Tadoussac যাওয়া। রাশীক যেতে চাইলোনা। পরে কথা হলো বড় ভাইকে ওয়াটারলু থেকে উঠিয়ে নায়েগ্রা হয়ে বাফেলো ঘোরা। তাও হলোনা। রাইয়ান এর পাসপোর্টের মেয়াদ চলে গেছে। তাই। ওর নতুন পাসপোর্ট থাকলে Pennsylvania তে শায়েক,তাসনুভাদের ওখানেও ঘুরে আসা যেতো!

কি আর করা! আমার ছেলে,আমারই মত।রাশীক মন্ট্রিয়লের কথা শুনলেই রাজী হয়ে যায়। ওর জন্মস্থান বলেই হয়তোবা। আর এই শহরটার অদ্ভুত এক টান আছে। পথে ৩/৪ টা গাড়িকে থামিয়ে টিকিট দিতে দেখলাম। লঙ উইক এন্ড এ রাস্তায় অন্য সময়ের চেয়ে পুলিশ বেশি থাকে। আমরা সোজা ডাউন টাউন এ চলে গেলাম। একটা আন্ডার গ্রাউন্ড পার্কিং এ গাড়ি রেখে নিশ্চিন্তে ঘোরা শুরু। St Catherine স্ট্রীট এর আকর্ষণ হলো ,ওখানে সারাক্ষন নানা রকম মানুষের ভীড় থাকে। ফ্রেঞ্চ মেয়েরা যে কি সুন্দর।

রাশীকের প্রিয় কিছু দোকান আছে ওই রাস্তায়। রাইয়ান এর কাপড় জুতা আগে আমি কিনতাম ।ইদানিং ও রাশীকের মত হয়ে যাচ্ছে। এক কালার এর টিশার্ট এ ঝুকছে। Christ Church Cathedral এর সামনে দিয়ে যাবার সময় দেখি দরজা খোলা। কখনো ঢোকা হয়নি। এই প্রথম ঢুকলাম। অনেক পুরানো চার্চ। সেই ১৮৫৯ এর স্থাপনা। একটা মহিলা পিয়ানো বাজাচ্ছিলো।

সেন্ট লরেন্ট এ হাঁটলে আমরা কত রকম স্মৃতির মধ্যে দিয়ে হেঁটে বেড়াই। প্রথম দেশ ছেড়ে আসার পর আমরা দুজন কতদিন এই পথে হেঁটেছি। স্মৃতি হাতড়ালে মনেহয় এইতো সেদিন। চোখের সামনে ঘটে গেলো কত কিছু। আমাদের পাশে হাঁটে আমাদের দুই ছেলে।

কার্টুন ক্যারেক্টার এর সাথে । নাম জানিনা। রাইয়ান এর একটুও ইচ্ছা ছিলোনা ছবি তোলার।

হেঁটে Old Montreal এর দিকে যাওয়া শুরু করি আমরা। কি ভালো যে লাগে। সুন্দর একটা দিন। তেমন গরম ও ছিলোনা। একটা পার্কে বসি । গাছের ছায়ায় পার্কটা অন্ধকার হয়ে ছিলো। রোদ এর আলো এখানে ওখানে উঁকি দিচ্ছিলো।কয়েকটা কাঠবিড়ালী মনের আনন্দে নেচে বেড়াচ্ছিলো এ ডাল থেকে ও ডাল। আমি বসে ভাবছিলাম ,জীবনের রঙ ভরা দিনগুলো চলে যাচ্ছে ।খুব দ্রুতই চলে যাচ্ছে আসলে!

পুরানো শহরটায় ইট বিছানো পথ এ হাঁটলে সবসময় আমার প্যারিস এর কথা মনে পড়ে। কখনো যাইনি। অথচ মনেহয় প্যারিস এ যদি কোনদিন যাই,ঠিক এমনি অনুভবের মধ্যে দিয়ে যাবো হয়তোবা। রাশীকের বাবা মন্ট্রিয়ল এ এলে খুব খুশি হয়। চেনা পথ,চেনা সুখ বলেই হয়তোবা। অলিগলি দিয়ে একসময় old port এ পৌছে যাই।

ছোট্ট একটা মেয়ে আমাদের ছবিটা তুলে দিলো।

দূর থেকে Ferris Wheel (La Grande Roue de Montreal) দেখে রাশীক এর বাবা ওখানে উঠতে চায়। রাশীক,রাইয়ান বাবার আগ্রহ দেখে আর না করেনা। সুন্দর একটা বিকালের সুন্দর কিছু সময়। বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হয়না । Gondola র ভিতরে এসি চলছিল। চারিদিকে গ্লাস দেয়া। ৬০ মিটার উঁচু থেকে চারিদিকের ভিউ দেখা যায়। একপাশে সেন্ট লরেন্স নদী অন্যপাশে শহরের বিল্ডিং গুলো। অসম্ভব সুন্দর লাগছিল। ২০ মিনিটের রাইড। তিনবার এই চক্কর দেয়া। ছোটবেলার মেলায় চড়া চরকীর মতই কিন্তু অনেক সুন্দর।

আমার অস্ট্রেলিয়ার পার্থ এর কথা মনে হচ্ছিল। Fremantle Esplanade Ferris Wheel এ চড়ে সমুদ্র দেখেছিলাম উপর থেকে। রাতের বেলা সে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। হুইল এর ওখানে আমাদের ছবি তুলেছিল ওটাও কিনলাম।

এরপর সবাই মিলে পানির ধারে বসলাম। রাশীকের বাবা প্যাডেল বোট এ চড়ার জন্য অস্থির হলো। রাশীক রাইয়ান এর কোন আগ্রহ নাই দেখে,পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকলো। আমিও ওর পাশে বসলাম। বাচ্চাদের চেয়ে ওর আগ্রহ সবকিছুতে বেশি। একথা বললে হাসছিল। একটা জাহাজ পোর্ট ছেড়ে গেলো। মনেহলো টাইটানিক এর কথা।রাশীককে দূরে একটা রেষ্টুরেন্ট এর বেলকোনিতে বসে থাকা মানুষদের দেখিয়ে বললাম,ওখানে বসে একটা বিকাল কাটাতে ইচ্ছা করেনা? ও হাসলো। ওকে আরো কত কথা বললাম। জীবনের নানা বোধ এর কথা। ও নানান গল্প করলো। রাইয়ান ছোটবেলায় এখানে আসলে হাঁস এর পিছনে ঘুরতো। এখন কত শান্ত হয়ে গেছে।

দূরে প্যাপিইয়ু সেতু মন্ট্রিলজ

সন্ধ্যার একটু আগে আবার হাঁটা শুরু করলাম। খেয়ে তারপর Place Des Arts এর কাছে ফিরতে হবে। পথে রেল লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। রেললাইন দেখলে কি যে নস্টালজিক হই। আমার ছেলেরাও জানে।
রাশীক বলেছিল চায়না মার্কেট এ ডিনার খাবার কথা। এত্ত যে ভীড় হবে জানা ছিলোনা। লাইন এ দাঁড়াতে হলো।কার্টুন ক্যারেক্টার সেজে ঘুরছিল অজস্র মানুষ ,মনেহয় কোন ফেস্টিভ্যাল ছিলো।
খেয়ে আবার হাঁটতে হাঁটতে ফিরলাম গাড়ির কাছে। ছেলেদের নিয়ে ওদের ছোটবেলার মত একটা দিন কাটালাম। আমাদের খুব সাধারন জীবনের আর একটা অসাধারন দিন কেটে গেলো। রাশীক ফেরার পথ এ সবার পছন্দের গান বাজাচ্ছিল। সেই careless whisper থেকে শুরু করে ,সুমনের,প্রথমত তোমাকে চাই সহ আরো কত গান। রাশীক যে কত কিছু মনে রেখেছে। গানের সুরে সুরে পুরো নস্টালজিক এক ভ্রমন হলো আমাদের। দুই ঘন্টার পথ নিমেষেই যেনো শেষ হয়ে গেলো।
তবে আমেজ থেকে গেলো। ভালোলাগা হলো ফুলের মত। সুবাস রেখে যায়। আর এই সুরভীতে মাখামাখি করে কাটতে থাকে আমাদের জীবনের দিনগুলো।
আমরা সবাই যেনো ভালো থাকি।
নিরাপদ থাকি।
আমাদের সন্তানরা সবাই যে যেখানে আছে ,ভালো থাকুক বাবামায়ের স্নেহ আদরে।

ছবি: লেখক