আমাদের কমিকস

ইরাজ আহমেদ

তখনও স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। ঢাকা শহরের স্টেডিয়াম পাড়ায় ছোট্ট এক বইয়ের দোকান ‘কথাকলি’। অদ্ভুত এক আনন্দের উৎস হয়ে ছিলো তখন জীবনে। তখনো বাবার হাত ধরেই বইয়ের দোকানে যেতাম।খুব বেশী বিদেশী বাংলা বই ঢাকায় পাওয়া যেতো না তখন। ইংরেজি রূপকথার বইয়ের সঙ্গে ‘কথাকলি’ দোকানটায় ছিলো ইংরেজি কমিকসের রাজ্য। মাটিতে একটা বড় কাঠের তক্তার উপর প্রচুর কমিকস স্তুপ করে রাখা থাকতো। সেই কমিকস কেনা আর ঘাটাঘাটি করাটা ছিলো তখন জীবনে এক মহা প্রাপ্তি। মনে আছে, সাধারণ নিউজপ্রিন্টে ছাপা চাররঙা ঝলমলে সেইসব কমিকসের কভার হতো একটু শক্ত কাগজে। মলাটে আঁকা ছবিগুলো আশ্চর্য এক অজানা পৃথিবীর ঘ্রাণ আর স্বপ্ন উড়িয়ে নিয়ে আসতো।এই কমিকসের কল্যাণে তখনই পড়া হয়ে গিয়েছিলো ‘চার্লস ডিকেন্সের ‘টেল অফ টু সিটিজ’, ভিক্টর হুগো‘র ‘লে মিজারেবল’, এমিলি ব্রন্টি‘র ‘উইদারিং হাইটস’, জুল ভের্নে‘র ‘টুয়েন্টি থাউজ্যান্ড লীগস আন্ডার দ্য সি’ আর অনন্য ‘রবিনহুড’।

এক টাকা পঁচিশ পয়সা ছিলো একটা কমিকের দাম। আমেরিকার নিউইয়র্কের ‘ক্লাসিকস ইলাসট্রেটেড’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা বিশ্বের বিখ্যাত সব উপন্যাসের গল্প সংক্ষিপ্ত করে কমিক আকারে প্রকাশ করতো।তাতে থাকতো হাতে আঁকা ছবি আর রঙের অপূর্ব ব্যবহার। নিউইয়র্ক শহরের ফিফথ এভিনিউতে ছিলো এই প্রকাশনা সংস্থার অফিস। সম্ভবত সেখান থেকেই আমদানী করা হতো কমিকস।আরেকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কমিকস আসতো ঢাকায়। নাম ছিলো ‘মার্ভেল কমিকস গ্রুপ’। ছোটবেলায় মার্ভেল কমিকস পড়ার অনুমতি ছিলো না বাসা থেকে। সেসব কমিকস ছিলো মারামারি আর সাইন্স ফিকশন জাতীয় গল্পে ভর্তি। এখন শিশুরা বড় পর্দায় ‘থর’ অথবা ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’ নামে যেসব সিনেমা দেখে সেই কমিকসের গল্প লেখা হতো এই চরিত্রগুলোকে কেন্দ্র করে।সেসব কমিকসের রঙ আর ছবি আজো চোখে লেগে আছে।এই মার্ভেল কমিকসের সাবেক নাম ছিলো টাইমলি কমিকস।

আরেকটু বড় হয়ে হাতে আসে ‘আর্চি’ কমিকস; পেয়ে যাই ‘ডিসি’ কমিকস। ঢাকার নিউমার্কেটে ‘জিনাত বুকস’ আর ‘বুক বিউটি’ দোকান দুটিতে মিলতো কমিকসের নেশা লাগানো সম্ভার। সেই দুটি দোকানেই প্রথম হাতে পাই ওয়েস্টার্ন কমিকস। কাউবয় আর বন্দুকধারীদের অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি।এই কমিকস কেনার জন্য আমার কাছে অবশ্য কথাকলি ছিলো স্বর্ণখনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছুদিন চলে কথাকলির শাটার নামলো চিরকালের জন্য। তারপর আমার কমিকস সংগ্রহের জায়গা হয়ে ওঠে নিউ মার্কেটের বইয়ের দোকান। একদা বলাকা সিনেমা হলের একটা দোকানে কমিকস পাওয়া যেতো। তখনও ওই জায়গায় পুরনো বইয়ের দোকানের এতো রমরমা হয়নি। তখন এখনকার বিজয় নগরের কয়েকটি ম্যাগাজিনের দোকানে আর  বেইলি রোডে একটা নিভু নিভু বইয়ের দোকানে মিলতো কমিকসের দেখা।

স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে কমিকস আদানপ্রদান হতো।স্কুল ব্যাগে লুকিয়ে নিয়ে যেতাম নতুন কেনা কমিকস।অন্যরাও তাদের গুপ্তধন নিয়ে আসতো। আমরা অদলবদল করে ক্লাসে বসেই পড়তে শুরু করতাম কমিকস। এই কমিকস পড়া নিয়ে আমাদের মধ্যে কত মান-অভিমান যে জমা হতো। বন্ধুদের মধ্যে কথা বলাও বন্ধ হয়ে যেতো।

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি এসে পশ্চিম বাংলা থেকে প্রকাশিত দেশ পত্রিকায় পড়তে শুরু করি অরণ্যদেবের এক পাতা কমিকস। আশির দশকের একেবারে গোড়ার দিকে ঢাকায় এলো কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘ঈন্দ্রজাল কমিকস’। এই বাংলা কমিকসের সম্ভারও একদা মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলো।

কমিকস কার মনরাজ্যে কী আন্দোলন নিয়ে এসেছিলো জানি না, আমাকে ছবি আঁকার দিকে ঝুঁকিয়েছিলো। কমিকসের ছবিগুলো দেখে দেখে মন ডুব দিতো অজানা, অচেনা এক রাজ্যে। খাতায় সেসব চরিত্রের অনুকরণে ছবি আঁকার চেষ্টা করতাম। আমি আজো কোনো ফুটপাতে পুরনো কমিকস পেলে কিনে ফেলি। শৈশবের সেই রঙীন দিনগুলো এক ঝটকায় মনের মধ্যে ফিরে আসে।সেই শহরে আশ্চর্য সব ছবির বই আজো মনকে ফিরে যাবার কথা বলে পুরনো সময়ে। কিন্তু সে তো আর কেউ পারে না। কমিকসের বাঁধানো বইগুলো মাঝে মাঝে নেড়েচেড়ে দেখি। পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে হয়তো দেখে নিতে চাই ফেলে আসা শৈশবকে।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা