কাঁটাতার ,শরনার্থী ও নাগরিকত্ব. …

শিলা চৌধুরী
(ক্যালিম্পং থেকে)

ভাগ হয়েছে ভূমি ভাগ সীমানা

ভাগ করতে পারো নি ভাষাকে

ভাগ হয়নি এই আকাশ হাওয়া কিবা পাখী
হৃদয় কি কাঁটাতার নির্মাণ হয়েছে ?
 ভাষা , সাহিত্য , সংস্কৃতি কি কলা
ভাগ করতে পেরেছো কি কাজী কিবা রবি
কবিতা কিবা সাহিত্য যায় না বাধা শিকলে
তার ডানা নেই কোন তালা সে তো চির স্বাধীন !!
সীমান্তের অশ্রু গড়া দুঃখ
কেউ কি জানিতে পারে
হৃদয় পেরাগ যেন শূলে ছড়া
কোন নিঅপরাধ !
পেটের টানে কত লাশ ঝুলতে দেখি
সীমান্ত দেখি বারুদ গুলি
ক্ষুধার্ত মানুষের পা কাপে না
কচি শিশুর ভাত ভাত চিৎকারে !!
ভালোবাসা কি নির্মম পরিহাস
রাজনীতি কি এত অভিশাপ
সীমান্ত জীবন
যেন নরকের বাস্তবতা !!
আমি অবিশ্বাসী আমি প্রতিবাদী
এই বিশ্ব নেই ভালোবাসা নেই প্রেম
আছে শুধু ধনীর পুজিতন্ত্র আর ধর্মের বিষ
তাই পৃথিবী এত নিষ্ঠুর !!

 সেই থেকে শুরু,…দেশ বিভাগ ,উনিশ সাতচল্লিশ সাল…।শুরু জায়গা নির্বাচন, নির্ধারণ. .কে থাকবে কোন দেশে ? শুরু হলো সেই সঙ্গে বিভাজন, হিন্দু, মুসলিম ভাগাভাগি, সেই সঙ্গে দেশ ভাগাভাগি ।তারপর এলো উনিশ একাত্তর, বাংলাদেশ  লড়াই করে যাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা জন্যে…।

লাখো লাখো শরন…
অতপর সাল ১৯৮৫ ।
 অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (আসু) নেতা (বর্তমানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী) সর্বানন্দ সোনোয়ালের উপস্থিতিতে আসু ও ভারত সরকারের মধ্যে এক চুক্তি সম্পাদিত হয়। এ চুক্তি মোতাবেক যারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত আসামে বসবাসরত একমাত্র তারাই ভারতের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী নিজে এ চুক্তি সম্পাদনের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং পার্লামেন্টে এ চুক্তিটি পাস করিয়ে নিয়ে আইনে রূপান্তর করেন। এই চুক্তি যখন পাস করানো হয় তখন বাংলা-র বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী কংগ্রেস দলেরই সাংসদ। সেসময় উনিও তো সম্মতি জানিয়েছিলেন। সেই চুক্তির ভিত্তিতেই তো আজকের এই পদক্ষেপ। তবে, কেন এখন উল্টো সুর গাওয়া?
২১ জুলাই ১৯৯৩।
 সকলের জন্য সচিত্র ভোটার কার্ড বাধ্যতামূলক করতে হবে। এমনই দাবীতে সেদিন মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে পথে নেমেছিল যুব কংগ্রেস। আজ কেন তবে, মরাকান্না কাঁদা?
৪ অগাস্ট ২০০৫
অনুপ্রবেশ নিয়ে আলোচনা চেয়ে আর্জি জানিয়েছিলেন তৃণমূল সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় লোকসভায় উপস্থিত না থাকায় ডেপুটি স্পিকার চরণজিত সিং অটওয়াল খারিজ করে দিয়েছিলেন তৃণমূল একমাত্র সাংসদের প্রস্তাব। ওই ঘটনায় ক্ষুব্ধ মমতা একগুচ্ছ নথি সম্বলিত কাগজ ডেপুটি স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, আইনসভায় তাঁকে কথা বলতে না দেওয়ার কারণ হিসেবে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়ে পদত্যাগ পত্রও জমা দিয়েছিলেন। মমতার দাবি ছিল, বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম একটা বড় সমস্যা এবং এই অনুপ্রবেশকারীরাই সিপিএম তথা বামেদের ভোটব্যাঙ্ক।
জুলাই ২০১৮।
 আসামের বাস্তুহারারা যাতে বাংলায় অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে ব্যাপারে রাজ্যের তিনটে জেলার আধিকারিকদের সতর্ক করে দিয়ে এখন মিডিয়ার দৌলতে রুদালী সাজছেন?মুসলমানের নাম দিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে NRC ডেকে এনে না! মুসলিমরা বাংলাদেশ থেকে আসে না এরা মুলনিবাসী ! আখের সকল মানুষের রাষ্ট্র কতৃক নিপীড়ন হবে ধর্মের নামে! ধর্মের নামে মানুষের প্রতি ঘৃণা ত্যাগ করুন মানুষকে ভালোবাসতে শিখুন!
“কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ , অর্চনা পাল, প্রশান্ত চক্রবর্তী, প্রকৃতিশ চন্দ্র বড়ুয়া, ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ, গোবিন্দ দাস, মহম্মদ আজমল হক, তপোধীর ভট্টাচার্য, চিন্ময় ভৌমিক- এদের নাম শুনেছেন? অর্চনা পাল বিজেপি এম এল এর স্ত্রী।কমলাক্ষ বাবু প্রাক্তন এম এল এ।প্রশান্ত চক্রবর্তী কটন কলেজের অধ্যাপক।প্রকৃতিশ বড়ুয়া প্রমথেশ বড়ুয়ার ভাই, গৌরীপুরের মহারাজার ছেলে।ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি।বড়খলার গোবিন্দ দাস নাগরিকত্বের মামলায় ১৯৮৮ এবং ২০১৫ সালে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণিত হয়েছেন আদালতেই।মুহম্মদ আজমল হক ৩০ বছর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে জওয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।তপোধীর ভট্টাচার্য আসাম বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রাক্তন উপাচার্য এবং ওনার পিতা ছিলেন নির্বাচিত বিধায়ক।চিন্ময় ভৌমিক হলেন কার্গিল যুদ্ধের ভারতীয় বাঙালী শহীদ।এমনি  পরিবার আছে আসামের ওই ৪০ লাখের কয়েকজন। একই নথিতে একজনের নাম উঠেছে, আরেকজনের ওঠেনি। স্বামীর নাম উঠেছে, স্ত্রীর নাম ওঠেনি। বাবার নাম আছে, ছেলেমেয়েদের নাম নেই। আর এই অসম্পূর্ণ তালিকা নিয়ে শুরু হয়েছে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি। যদিও এই লিস্ট অসম্পূর্ণ বলে আশ্বাস দিচ্ছে সরকার, তা সত্ত্বেও দিকে দিকে বাঙালীদের উপর আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। বাঙালী বিদ্বেষী বিজেপির সভাপতি এই ৪০ লক্ষ অসহায় মানুষকেই অনুপ্রবেশকারী হিসেবে অপবাদ দিয়েছেন। এই ৪০ লাখের একটা বড় অংশই বাঙালী হিন্দু। আর বিজেপি সকলকে বোঝাতে চেষ্টা করছে বাংলাদেশী মুসলমানদের তাড়াতেই এই NRC.  ঘৃণ্য রাজনীতি ।
ঐক্যবদ্ধ বাঙালীর শক্তি ওরা জানে। তাই ওরা বাঙালীকে আরেকবার হিন্দু-মুসলমানে বিভক্ত করতে চায়। তারপর দুর্বলতর বাঙালীকে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে উৎখাত করতে চায়। সেজন্যে এত মিথ্যাচার। সত্যিটা এটাই যে আজ জাতি হিসেবে বাঙালীর সঙ্কট।
অাসামের বর্তমান যে ভূমি তার একটা বড় অংশ স্বাধীনতাপূর্ব বাংলারই অংশ ছিল যাতে অাসাম অংশ ছিল বাংলার। ব্রিটিশরা অাসামকে আলাদা করার সময়েই বেশ কিছু বাঙালী অধ্যুষিত জেলা অাসামের অংশ করে দেয়। তারপর দেশভাগের সময় ভারতে বাঙালীর মূল আবাসভূমি পশ্চিমবঙ্গের থেকে দূরে হয়ে যায় ঈশানবঙ্গ। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী আসামের বর্তমান ভূমিতে বাঙালীর বাস।
স্বাধীনতার পর বাঙালীর উপর প্রথম খড়্গ নেমে আসে বাঙ্গাল খেদাও আন্দোলনের মাধ্যমে যার নেতৃত্বে ছিল সর্বানন্দ সোনোয়াল। ইনিই বর্তমান আসামের মুখ্যমন্ত্রী। বাঙালীবিদ্বেষী এই মুখ্যমন্ত্রী যে NRCর সুযোগে আবার বঙ্গাল খেদাও করতে চাইছে এটা বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যেসব নথিপত্র দিয়ে  বাঙালীকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বলা হচ্ছে তার অনেক কিছুই প্রাক ‘৭১ সালে সাধারণ গরীব মানুষের থাকার কথাই নয়। অাসামীয়াদেরও নেই। কিন্তু অত্যাচারিত বাঙালীই। কারণ অাসামীয়াদের  OI অর্থাৎ Original Inhabitants তকমা দিয়ে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। কি ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র ভাবুন। শুরুতেই এরা বাঙালীদের সন্দেহভাজনের তালিকায় তুলে দিল। যাতে অত্যাচার করতে সুবিধে হয়। এখন আবার ডিটেনশন ক্যাম্প করেছে নাৎসি কায়দায়। বাঙালীদের অত্যাচার করে ধ্বংস করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র!
আজ ভারতবর্ষে বাঙালীর জাতিগত সঙ্কটকাল। শত্রু চিনে নিক বাঙালী। হিন্দু-মুসলমানে বিভাজন আর নয়। বাঙালী পরিচয়ে বলীয়ান হয়ে উঠুন। ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে হবে বাঙালীর অস্তিত্বরক্ষায়।
৫ লক্ষ নমশূদ্রের জন্য মতুয়ারা আন্দোলনে। কখনো কি ৩০ কোটি বাঙালী একসুরে কথা বলবে?
জয় বাংলা..
সহকারী লেখক : ভাঙো ঘুম ও হ্যাপী সরকার ।