বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু একটি ইতিহাস

লুৎফুল কবির রনি

বিচারক ছিলেন জনৈক ব্রিটিশ মি. কর্নডফ এবং দুইজন ভারতীয়, লাথুনিপ্রসাদ ও জানকিপ্রসাদ। ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনের ৩০২ ধারা অনুযায়ী প্রানদণ্ডের রায় শোনার পরে ক্ষুদিরামের মুখে হাসি দেখা যায়। তার বয়স খুব কম ছিল। বিচারক কর্নডফ তাকে প্রশ্ন করেন, তাকে যে ফাঁসিতে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে কিনা?

১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর পাঁচটায় ব্রিটিশ সরকার ১৮ বছরের এক তরতাজা যুবককে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করালো। কারাফটকের বাইরে তখন হাজারো জনতার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে ‘বন্দেমাতরম’ স্লোগান।

ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে কারা কর্তৃপক্ষ যুবকটির কাছে জানতে চাইল, মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ ইচ্ছা কী?

যুবকটি এক সেকেন্ড অপেক্ষা না করেই নিঃশঙ্কচিত্তে বলে উঠলেন, ‘আমি ভালো বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই।’ উপস্থিত কারা কর্তৃপক্ষ সেদিন বিস্মিত হলো যুবকটির মানসিক দৃঢ়তা আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি তীব্র ঘৃণাবোধ উপলব্ধি করে।

গল্প আছে , মা লক্ষ্মীপ্রিয় দেবী পরপর অনেক কজন সন্তানকে হারানোর পর ক্ষুদিরাম কে হারাবার ভয়ে মাত্র তিন মুঠো ক্ষুদের বিনিময়ে তাকে তার দিদি অপরূপা দেবীর কাছে বিক্রি করে দেন , সেই থেকেই তাকে সবাই ক্ষুদিরাম বলে চেনে।

১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল। বাইরে আগে থেকেই দুই বিপ্লবী প্রস্তুত ছিলেন। গাড়িটি ফটক পার হতে না হতেই প্রচণ্ড শব্দে পুরো শহর কাঁপিয়ে একটি বোমা বিস্ফোরিত হলো। কেনেডির স্ত্রী ও তার মেয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। বিধ্বস্ত গাড়িটি এক পাশে উল্টে পড়ে। যাকে হত্যার জন্য বোমার বিস্ফোরণ, সেই কিংসফোর্ডের গাড়িটি অক্ষত অবস্থায় মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে।

বোমা নিক্ষেপ করেই দুই বিপ্লবী ছুটলেন দুই দিকে।ক্ষুদিরাম রেল লাইনের পাশ ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে পাড়ি দেন প্রায় ২৪ মাইল পথ। সারা রাত এভাবে ছুটে চলার পর ভোরে পৌঁছে যান ওয়েইনি রেল ষ্টেশনের কাছে। কিশোর ক্ষুদিরাম ভেবেছিল বিপদ কেটে গেছে। সারা রাতের ধকল সামলানোর জন্য কিছু খেতে ঢুকে পড়েন একটা রেস্তোরায়। সেখানেই কয়েকজন পুলিশের খপ্পরে পড়ে যান ক্ষুদিরাম। পিস্তল দিয়ে নিজেকে গুলি করার আগেই ধরা পড়ে যান ক্ষুদিরাম।

ক্ষুদিরাম গ্রেপ্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা শহর যেন মুহূর্তে ভেঙে পড়ল। পুলিশবেষ্টিত ক্ষুদিরামকে একনজর দেখতে হাজারো লোক ভিড় জমালো ওয়াইসি রেলস্টেশনে। উৎসুক জনতার উদ্দেশে ক্ষুদিরামের কণ্ঠে তখন ধ্বনিত হলো বজ্রনিনাদ বন্দেমাতরম…!

ধরা পড়ার পর বোমা নিক্ষেপের সমস্ত দায় নিজের ওপর নিয়ে নেন ক্ষুদিরাম। অন্য কোন সহযোগীর নাম বা কোন গোপন তথ্য শত অত্যাচারেও প্রকাশ করেননি। মজফফরপুর আদালতে ক্ষুদিরামের বিচার কাজ শুরু হলো ০৮ জুন ১৯০৮। কিন্তু সারা পশ্চিম বাংলা থেকে কোন আইনজীবী মামলায় আসামী পক্ষের হয়ে আদালতে দাঁড়াতে সাহস পাননি। তখন পূর্ব বঙ্গ থেকে রংপুর বারের উকিল সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী, কুলকমল সেন ও নগেন্দ্রনাথ লাহিড়ী ক্ষুদিরামের পক্ষে মামলায় পরিচালনায় এগিয়ে আসেন। ইতোমধ্যে বিচারকের অনুরোধে কালিদাস বসু নামে স্থানীয় এক আইনজীবী এগিয়ে আসেন আসামী পক্ষে। ৬ দিন চললো বিচার অনুষ্ঠান। বিচারের শুরুতেই ক্ষুদিরাম স্বীকারোক্তি প্রদান করেন।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু একটি ইতিহাস । সম্ভবত তিনি ছিলেন এই আন্দোলনের সর্ব কনিষ্ঠ বিপ্লবী ।

লাল সালাম তোমায়, বিপ্লবীর মৃত্যু নেই।

ছবি: গুগল