শুভ জন্মদিন ফিদেল কাস্ত্রো

পৃথিবীর ইতিহাস তাকে চিহ্নিত করেছে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এক অনন্য যোদ্ধা হিসেবেই। কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং কমিউনিস্ট নেতা, তিনি ফিদেল কাস্ত্রো। ১৯৫৩ সালে কিউবায় স্বৈরাচারী বাতিস্তা সরকার উৎখাতের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। এজন্য তাকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৫৬ সালে চে’ গুয়েভারাকে সঙ্গে নিয়ে বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে শুরু করেন গেরিলা যুদ্ধ। ১৯৫৯ সালে বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটলে তিনি কিউবার হাল ধরেন। এরপর ৫০ বছর কিউবা শাসন করেন ফিদেল কাস্ত্রো। বারবার হত্যাচেষ্টা, ক্ষমতাচ্যুতি আর ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ডিঙ্গিয়েছে অকুতোভয় এই বিপ্লবী। কেউ তাকে বলেছেন, কিউবার হৃদয়, কেউ বলেছেন, একনায়ক।

আজ এই মহান বিপ্লবীর জন্মদিনে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

১৯৫৩ সালে সশস্ত্র দল নিয়ে মনকাডা আর্মি ব্যারাকে হামলা করেন কাস্ত্রো। সংঘর্ষে কাস্ত্রোর দল পরাজিত হয়। সামরিক শাসক বাতিস্তার নির্দেশে কাস্ত্রোর ৮০ জন সহযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে বাস্তিতার হত্যার আদেশ থেকে বেঁচে বেসামরিক কারাগারে ঠাঁই পান কাস্ত্রো। কিন্তু কারাগারেও তাকে বিষ খাইয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। শেষ পর্যন্ত বিশ্ব জনমতের কথা বিবেচনা করে কাস্ত্রোকে হত্যা না করে বিচারের মুখোমুখি করেন বাতিস্তা। মনকাডা হামলায় অভিযুক্ত হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ফিদেল যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তার মধ্য দিয়ে কিউবার রাজনৈতিক সংকট এবং তার সমাধানের পথ নির্দেশ করেন তিনি। তার এ বক্তৃতা আলোড়ন তোলে গোটা কিউবায়, জননায়কে পরিণত হন ফিদেল। বিচারে তার ১৫ বছরের কারাদণ্ড হলেও প্রবল জনমতের কাছে মাথা নত করে দুই বছরের মাথায় তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন বাতিস্তা।

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বিপ্লবী দল গড়ার লক্ষ্যে মেক্সিকোয় পাড়ি জমান কাস্ত্রো। সেখানে একটি গেরিলা দল গঠন এবং পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র জোগাড়ের পর চে’ গুয়েভারা, জুয়ান আলমেইডাসহ একটি বিপ্লবী দল নিয়ে ১৯৫৬ সালে কিউবায় ফিরে আসেন কাস্ত্রো। ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই মনকাডায় সেই হামলার নামানুসারে ফিদেল কাস্ত্রোদের এই গেরিলা দল ‘জুলাই টুয়েন্টি সিক্স মুভমেন্ট’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে জেনারেল বাতিস্তা গেরিলা নিধন অভিযান আরও জোরদার করেন। গেরিলারা সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বত ছেড়ে একের পর এক শহর দখল করতে থাকে। স্থানীয় জনতা গেরিলাদের অভ্যর্থনা জানায়। ১৯৫৮ সালের মাঝামাঝি বাতিস্তার প্রায় এক হাজার সেনা গেরিলাদের হাতে প্রাণ হারালে যুক্তরাষ্ট্র বিমান, বোমা, জাহাজ ও ট্যাংক পাঠিয়ে গেরিলাদের হটানোর চেষ্টা চালায়। কাস্ত্রোর সেনারা চারদিক থেকে রাজধানী হাভানাকে ঘিরে ধরতে শুরু করলে ১৯৫৯ সালের পহেলা জানুয়ারি কিউবা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়  জেনারেল বাতিস্তা।

ফিদেল কাস্ত্রো বিংশ শতাব্দীর অন্যতম রাষ্ট্রনায়ক। যিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একাধারে প্রায় চার যুগ বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। এক সময়কার বিপ্লবী কাস্ত্রো সুদীর্ঘকাল কিউবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের পর অসুস্থতার কারণে ২০০৮ সালের শুরুতে ছোট ভাই রাউল কাস্ত্রোর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।

১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কিউবার পূর্বাঞ্চলে স্পেনীয় বংশোদ্ভূত এক অভিবাসী পরিবারে কাস্ত্রোর জন্ম।  আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর হাভানায় আইনজীবী হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন তিনি। তার দরিদ্র মক্কেলদের পক্ষে লড়ে অল্প সময়ের মধ্যেই সুনাম এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সেখান থেকেই সক্রিয় দলীয় রাজনীতি শুরু করেন। এরপর ১৯৪৭ সালে নবগঠিত কিউবান পিপলস পার্টিতে যোগ দেন কাস্ত্রো। রাজনীতিতে যোগ দিয়েই তুখোড় বক্তা কাস্ত্রো তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ১৯৫২ সালে তিনি প্রথমবারের মতো দলীয় কংগ্রেসের সদস্য প্রার্থী হন। নির্বাচনে পিপলস পার্টি যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই জাতীয় নির্বাচনের আগে জেনারেল বাতিস্তা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কিউবার ক্ষমতা দখল করেন। ফলে নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়। রাজনৈতিক সুবিধাবঞ্চিত কাস্ত্রো তাই হাতে তুলে নিলেন অস্ত্র। শুরু হলো বিপ্লবী কাস্ত্রোর নতুন জীবন।

২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে অসুস্থতার কারণে ফিদেল কাস্ত্রো কিউবার প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দেন। ২০০৬ সালের জুলাইতে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর থেকে ফিদেল কাস্ত্রো অনেকটাই নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। ওই সময় তার জরুরিকালীন অস্ত্রোপচারের পর বেশ কিছুদিন জীবন-মৃত্যুর দোলাচলে থেকে ফিদেল কাস্ত্রো কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেও জনসমক্ষে তার উপস্থিতি ক্রমশ কমে আসতে থাকে।

বিংশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামী মানুষের নায়ক ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো। ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর ৯০ বছর বয়সে এই বিপ্লবী মানুষটি মহাকালের সঙ্গে যুক্ত হন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট

ছবিঃ গুগল