অপেক্ষা এবং. ..

শিলা চৌধুরী

(ক্যালিম্পং থেকে): রাজেন্দ্রপুর রেল ষ্টেশনের ষ্টেশন মাষ্টার বারবার ঘড়ি দেখছিলেন আর সামনে রাখা টেলিফোনটার দিকে তাকাচ্ছিলেন কেননা অনেক আগেই বলাকা নামক রেলগাড়িটা আসার সময় পেরিয়ে গিয়েছিল ।এমনিতেই এই পথে গাড়ির সংখ্যা খুব কম।অতঃপর অপেক্ষা শেষ.. ষ্টেশন মাষ্টারের সামনের টেলিফোনটায় ক্রিং ক্রিং করে কর্কশ স্বরে আগমন বার্তা জানায় ।গার্ড সবুজ পতাকা হাতে বাঁশিতে ফু দিতে দিতে লাইন ধরে রেল ক্রসিং -এর দিকে এগুতে থাকেন।যাত্রীগন সচকিত হয়ে বাক্স পেটরা, লাকড়ির বোঝা নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে আসা লাইনের দিকে উঁকি ঝুঁকি দিতে লাগলো ।ষ্টেশন মাষ্টার লাইনের স্লিপার দিয়ে বানানো ঝুলিয়ে রাখা ঘন্টাটা বাজিয়ে গেলেন ।সেই ঘন্টার আওয়াজ আর রেলগাড়িতে ঠেলে উঠবার উত্তেজনায় আমি বাবার হাতটাকে খামচে ধরলাম ।তার আগে রেলগাড়িতে চড়লেও মনে নেই সেটা…।যাচ্ছিলাম টঙ্গী হয়ে কালিগঞ্জ পুবাইল,সঙ্গে ঠাম্মী,দাদু,পিসিমা আর কল্লোল।রেলগাড়িটা প্ল্যাটফর্ম বিহীন ষ্টেশনে ঢুকতেই হুড়াহুড়ি শুরু হয়ে গেল যাত্রীদের গাড়িতে উঠার জন্যে।গাড়িটার শরীর জুড়ে গজারির লাকড়ি ঝুলানো।আমি উঠার চেষ্টা না করে সেসবই দেখে যাচ্ছিলাম ।সবাই উঠে পড়েছে আমি সেই বাবার হাত ধরেই, আর কল্লোল আমার জামা টেনে টেনে পিছু পিছু ।দরজা দিয়ে উঠতে ব্যর্থ …এদিকে গাড়ি ছেড়ে দেবার জন্যে গার্ড বাঁশিতে আবারো ফুঁ দিয়ে যাচ্ছিলো ।অবশেষে বাবা আমাকে আর কল্লোলকে জানালা দিয়েই তুলে দিয়ে কোনমতে নিজে উঠলেন ।তখন আর কতটুকুই বড় হয়েছে. ..সময় চলে যায়, নিঃশব্দে চলে যাচ্ছে. ..।মাঝে মাঝেই মুহুর্তগুলো মনে পড়ে,জানান দিয়ে যায় ঢংঢং করে ষ্টেশন মাষ্টারের বাজানো সেই ঘন্টার মতোই ..অপেক্ষার…প্রথম মস্তিষ্কে গেঁথে যাওয়া জানালা দিয়ে রেলগাড়িতে চড়া। দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা আয়নায় মাঝেই খুব শখ নিজেকে দেখি..

সাজবার বাসনাতে না…পাকা চুল নতুন করে কটা বাড়ছে তা দেখতে..! আমরা ভাইবোনেরা বছরে এক বার করে সাত দিনের জন্যে মামা বাড়ি যেতাম বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা শেষে…সারা বছরই পড়তে বসলে হাতের আঙ্গুল গুনতাম কদিন গেল আর কদিন বাকি সেদিনের ।বেশিরভাগ সময়েই দাদু আমাদের ভাই বোনদের মাকে সহ দিয়ে আসতো আর বাবা গিয়ে নিয়ে আসতো।আজো ভেবে পাই না, সারা বছর যে দিনের জন্যে হাতের আঙুল গুনতাম সেইদিন যখন আসতো তার আগের দিন থেকে খুব কান্না পেতো…একবার ইচ্ছে করতো যেতে আবার মনে হতো না গিয়ে ঠাম্মীর সঙ্গেই থেকে যাই।সবার সঙ্গে মিলে পুকুরে সাঁতার কাটবো, লুডু খেলবো,ক্যারামবোর্ড খেলবো,গোল্লাছুট খেলবো,দাঁড়িয়াবান্দা খেলবো,সন্ধ্যাবেলা বাবা বিস্কুট নয়তো লজেন্স নিয়ে আসবে সেসব খাবো ,রাত্রিরে ঠাম্মীর কাছে শুয়ে পান্তাবুড়ি নয়তো চিলনি ( চিল ) মায়ের রাজকন্যাকে কুড়িয়ে পেয়ে গাছের মধ্যে মানুষ করার গল্প শুনবো…। আবার মনে হতো নাহ না যাওয়াটা ঠিক হবে না. ..ওরা সবাই গিয়ে কত্তো আনন্দ করবে।বাস থেকে নেমেই টাট্টু ঘোড়ার গাড়ি টমটমে চড়বে। মামা নয়তো দাদু চমচম আর দই নিয়ে আসবে। সেসব কল্লোল একাই খাবে? বিকেল বেলা মটরশুটি খেত থেকে তুলে মাটির হাড়িতে ক্ষেতের মধ্যেই খড় দিয়ে পুড়িয়ে খাবে মামা বাড়ির পাড়ার সব সমবয়সী মামা মাসিদের সঙ্গে। ছোট মামার জমিয়ে রাখা মার্বেল গুলো একাই সব নিয়ে নেবে কল্লোল। বড়মা,দিম্মার টিনভর্তি বানিয়ে রাখা ঢ্যাঁপের মোঁয়া। ইসস কত্তো কিছু… না গেলে কি করে হয় ।মনের ভেতর দো’টানায় দম আটকে রাখা কষ্ট চেপে যেতাম…।ঠিক ফেরার সময় এগিয়ে এলেই দুঃখভরা মন নিয়ে অপেক্ষা করতাম কারন আর কিছুই ছিল না, সেটা বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল।কত নম্বর পাবো,অংকে কতো পাবো? ( বরাবরই অংকে আমি মহা পন্ডিত ছিলাম তো তাই ) প্রথম, দ্বিতীয় না তৃতীয় হবো আবার?

সকাল সন্ধ্যা বই নিয়ে পড়তে বসা,ননী দাদা ,ক্ষমা দিদি দু বেলা করে আসবে পড়াতে। তারপর সেই বিদ্যালয়ে আবার পড়া..। নারায়ণ স্যার (দাদা) আসবে বেতের লাঠি নিয়ে। যতই ভালো পড়ি আর পারি না কেন আশির মধ্যে উনআশি পেলেই হাতের তালুতে সেই বেত্রাঘাত,কেন উনআশি পেয়েছিস আশি নম্বর কেন পেলি না? তারপর আফাজউদ্দিন স্যার …আবারো বুক ধরফর…কতো ভালো করে শেখা জ্যামিতি, পাটিগনিত,বীজগণিত. ..হায় রে …স্যার কে দেখলেই কোথায় যে হাপিস হতো সেই সব। সামনে শুধু বেতের ছবিটাই ভাসতো ।তারপর আসবে মাজম আলী স্যারের প্রানী বিজ্ঞান ,উদ্ভিদ বিজ্ঞান. ..সেই ক্লাসে সমস্যা নেই. ..খুব ভালো করেই ব্যাঙ আঁকতে পারবো…বৈজ্ঞানিক নামগুলো ও সমস্যা নেই ।আজিজ স্যারের ভুগোল ওটা তো ডাল ভাত আমার জন্যে. ..।সেসব ভাবতাম আর বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করতাম. ..। সকাল শুরু হতো দাদুর শরীর চর্চা দেখতে দেখতে …ইংরেজ আমলে সেনাবাহিনীতে ছিলেন ,আর অভ্যাস বলে কথা..।তারপর আধো ঘুম চোখে অপেক্ষা করতাম বাবা কখন অফিসের জন্যে তৈরী হয়ে আমাদের ঘুম ভাঙ্গাতে আসবে …।ভাইবোনরা ঘুমাতাম দাদু ঠাম্মীর সঙ্গে ।বাবা দাঁত ব্রাশ করিয়ে আমাদের সঙ্গে নিয়ে খেয়ে অফিসের জন্যে বেরুতো আর তারপর ছোটকাকুর সকাল শুরু হতো..।ছোটকাকুর অভ্যাস ছিল রোজ সকালে ক্যাসেট প্লেয়ারে ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের সানাই ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ি কামানো…।আমরা ভয় পেতাম সবচেয়ে বেশি ছোটকাকুকে…।তাই শান্ত সুবোধ বালক বালিকা সেজে পড়তে বসতাম আর অপেক্ষা করতাম কখন অফিসের গাড়ি কাকুকে নিতে।ছোটকাকু কখন পড়ার ঘরে আসবে তার জন্যে মুখে পড়ার শব্দ থাকলেও চোখ কান সজাগ রাখতাম। যে প্রথমে টের পেতাম সে সবাইকে টেবিলের নিচে পা দিয়ে লাথি মেরে কাকুর আগমন বার্তা পৌঁছে দিতাম। নয়তো কানমলা যার কপালে জুটতো কাকু অফিসে বেরুলেই সে খামচি দিতো অন্যদের তার ফলাফল হিসেবে. ..।

সন্ধ্যা হলেই ঠাম্মীর হাঁকডাক শুরু হতো…মুরগী খোঁয়াড়ে ঢুকাবার মতো…।সন্ধ্যা পূজো দেবার সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে খেলার মাঠ ছেড়ে পড়ার টেবিলে হাজির হতে হতো…।মুড়ি মাখা নয়তো মুড়ির সঙ্গে আখের কিংবা খেজুরের গুড় দিতো মা। তাই খেতে খেতে পড়তে বসতাম…।কল্লোল বাহানা খুঁজতো ননী দাদার থেকে পালানোর জন্যে…।কোনদিন তার পেট ব্যাথা, নয়তো চোখ ব্যথার বাহানা তার লেগেই থাকতো। সেসব কাজে না লাগলেও বাথরুম যাওয়া আটকাবার সাধ্য ননী দাদার ছিল না…।আর সেখানে একবার পৌঁছালেই হতো কল্লোল বাবুর। ফিরতো ননী দাদার যাবার সময় হলে।মার খাওয়া থেকে বাঁচতে প্রতিদিন সে যথারীতি ভেঙ্গে রাখতো লাঠি ।তারপর অপেক্ষা করতাম কখন ঘরের বারান্দায় চলা টেলিভিশনে নাটক শুরুর আওয়াজ আসবে তার।গ্রামের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না আর কারো তাই উঠানে খেজুরের পাতা দিয়ে বোনা পাটি বিছিয়ে সবাই টেলিভিশন দেখতে বসতো।টেলিভিশন চলতো ব্যাটারি দিয়ে ।বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না গ্রামে আমাদের তখন।তাই আগে চালানো হতো না, কারণ কখন ব্যাটারির চার্জ খতম হয় সেই ভয়ে ।চার কিলোমিটার দূরে রাজেন্দ্রপুর থেকে চার্জ করিয়ে আনতে হতো ব্যাটারি। তাও আমাদের সুধীর সবচেয়ে বেশী খুশী হতো সেই কাজ করতে।(সুধীর ছিল আমাদের বিশ্বস্ত গৃহকর্মী…।নিজের জীবনের চেয়ে ও বেশি ভালোবাসতো আমাদের ভাইবোনদের)তারপর অপেক্ষা করতাম কখন সবাই শুয়ে পড়বে সেজন্যে ।আমাদের ভাইবোনদের জন্যে ছিল দোতলা খাট।উপরের টা ছিল আমার বরাদ্দ. ..নয়তো মাটিতে বিছানা ।হারিকেনের আলো কমিয়ে চুপি চুপি পড়ার নাম করে পড়ে যেতাম শরৎচন্দ্র থেকে বাংলাদেশের জেমস বন্ড মাসুদ রানা পর্যন্ত. ..।আর কান অপেক্ষা করতো সচকিত হয়ে কখন পাশের ঘরে বাবা,কাকুদের দরজা খোলার আওয়াজ হয়, নয়তো রাত জাগার জন্যে কপালে. …। নিঃশব্দে সময় দিনের পর দিন,

বছরের পর বছর পেরিয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝেই স্বপ্নে দেখি সেসব দিনের। ফেরা হবে না জানি সেসবদিনে আর তবুও অপেক্ষায় থাকি!! যদি তার পরও দাদুর রোজ সকালের শরীর চর্চা দেখতে পাই। ঠাম্মীকে রাতে গল্প শোনাতে শোনাতে ঘুমিয়ে পড়া থেকে ধাক্কা দিয়ে আবারো জাগিয়ে দিতে। বাবার সঙ্গে সকালে ঘুম চোখ নাস্তা খেতে। অপেক্ষায় …আবারো. .. কোনখানে সেই সময়ে ফেরার…।

ছবি: লেখক