অর্কর ঘরটা শূন্য পড়ে থাকে…

জসিম মল্লিক,টরন্টো থেকে

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

এক.

অরিত্রির সঙ্গে আমি

আমি প্রথম সিগারেটে টান দিয়েছিলাম বিচিত্রা অফিসে। সে সময় আমরা যারা তরুণরা বিচিত্রায় কাজ করতাম প্রায় সবাই স্মোক করতো এবং আমরা প্রায় প্রত্যেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলাম। এর মধ্যে ইরাজ, আসিফ, সেলিম ওমরাও, মাহফুজ, শামীম, ইমরান, শিবলি স্মোক করতো। এমদাদ, আশরাফ, মোর্তোজা বা মন্টি ছিল অধুমপায়ী। আরো হয়ত কেউ কেউ ছিল। অপেক্ষাকৃত সিনিয়রদের মধ্যে সাবের ভাই ছিলেন চেইন স্মোকার। মিনার ভাইও। একদিন হঠাৎ শুনি সাবের ভাই সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। হুট করে সিগারেট ছাড়া সাবের ভাইর পক্ষেই সম্ভব। কখনো দেখা হলে জিজ্ঞেস করবো সিগারেট ছেড়ে কেমন লেগেছিল।
আমি একটু লাজুক ও ভীতু প্রকৃতির। তাছাড়া আমি এসেছি মফস্বল থেকে। বিচিত্রার মতো পত্রিকায় লিখতে পারছি এটাই বড় আশ্চর্য্য ঘটনা। ভয়ে ভয়ে অন্যদের সঙ্গে কথা বলি। কি জানি কোনো ভুল ভাল হয়ে যায় কিনা। নাগরিক হালচাল তখনও শিখে উঠতে পারিনি। কেমন করে কথার পিঠে কথা বলে নিজেকে চৌকস করে তুলতে হয় জানি না। বিচিত্রায় তখন ভয়াবহ সব কভার স্টোরি ছাপা হতো। আমি বিস্মিত হয়ে ভাবতাম এটা কিভাবে সম্ভব! এতো ইনফরমেশন কোথায় পায় রিপোর্টাররা!
সিগারেট খাওয়ার হাতেখড়ি কেমনে হলো সেটা বলি। বিচিত্রা অফিস সিগারেটের ধোঁয়ায় ’ম ’ম করে সারাক্ষন। আগে কখনো সিগারেটে টান দেইনি। অন্যরা খায় আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি। ধোঁয়ায় কেমন নেশাতুর লাগে আমার। একদিন ইরাজ বললো, মল্লিক একটু টান দিবা! আমি আমতা আমতা করে বললাম কখনো তো টানিনি। ইরাজ বললো ট্রাই করো। এরপর যেটা হলো সেটা হচ্ছে ইরাজ একটা মহা বিপদে পড়ে গেলো। ক্যাম্পাসে দেখা হলেই বলতাম দোস্ত দাওতো একটু টান দেই। পরিস্থিতি এই পর্যায়ে গেলো যে আমাকে দুর থেকে দেখলেই ইরাজ বলতো ওই যে জইস্যা এখন সিগারেট চাইবে। আমরা প্রায়ই সিগারেট ভাগাভাগি করতাম। আমার যে সিগারেট কেনার পয়সা ছিলনা তা ইরাজ জানতো না ।
দুই.

অর্ক আর তার বউ

আজকে লেখার প্রসঙ্গ আসলে সিগারেট না। আমি কি আজকাল বেশি বেশি স্মৃতিকাতুরে হয়ে যাচ্ছি! এইসব এলেবেলে লেখা পড়ে কেউ কেউ হয়তো মহা বিরক্ত হবে আমার উপর। আসলে আমি অনেক একলা হয়ে গেছি। জেসমিন যেমন সবকিছু সহজভাবে নিতে পারে, আমি পারি না। সন্তানরা বড় হলে কি একটু দুরের হয়ে যায়! আচ্ছা ছেলেরা বিয়ে করলে কি বাবা মায়ের কাছ থেকে দুরে সরে যায়! কোনটা বড় তাদের কাছে স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা, নিজের সংসার না বাবা-মা-ভাইবোন! অর্ক এবং অরিত্রি দুজন ভিন্ন। প্রতিটা মানুষই আসলে আলাদা। ভিন্ন একক। ভিন্ন ব্যাক্তিত্ব, চেহারা ভিন্ন, অভ্যাস ভিন্ন। কেউ কারো মতো না।
আচ্ছা পুরুষরা কি একটু আত্মকেন্দ্রিক! বিশেষকরে নর্থ আমেরিকায় যারা থাকে! হয়ত এখানকার কালচারটাই এমন। এভাবেই এরা বেড়ে উঠেছে, সেল্ফ ইনডিপেনডেন্ট হয়ে। আপাতঃ স্বার্থপর মনে হলেও এতে ওদের কোন দোষ দেখিনা আমি। ওদের মন নরম, বুঝিয়ে বললে বুঝতে পারে। জেসমিন যেমন পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে আমার একটু অসুবিধা হয়। নর্থ আমেরিকা বলেই না, আমি কি সব ফেলে দুরে চলে যাইনি! স্বার্থপরতা আমার মধ্যেও কি নাই! আছে। নিজের সুখের জন্য সবাই সব করে। আমার বড় ভাইতো আমাদের অকুল সমুদ্রে ফেলে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। আবার আমার মেঝ ভাই হাল ধরেছিল সংসারের। জীবন এমনই। এসব নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নাই।
অর্ক খুবই সরল টাইপ। পিতা পুত্রের সম্পর্ক যেমন হয় আমাদেরও তেমনি। হৃদয়ের ভিতরে স্নেহ মমতার ফল্গুধারা বহমান থাকলেও কোথায় যেনো একটু দূরত্ব তৈরী হয়ে যায়। অর্ক যেমন সব ব্যাপারে জেসমিনের সঙ্গে কমিউনিকেট করে। আমি আবার ওর কাছ থেকে জানতে পারি। আমার সঙ্গে যখনই দেখা হয় দু’চারটে হালকা কথা হয় শুধু। অর্ক কখনো কোনো ব্যাক্তিগত প্রশ্ন করে না। আমিও কোনো বৈষয়িক ব্যাপার অর্কর সঙ্গে শেয়ার করি না। বরং নতুন মুভি কি আসল, বার্সেলোনার ক্যাপ্টেন মেসি হয়েছে এসব হালকা কথা হয় আমাদের।
দেখা হলে আমি বলি, হাই ম্যান হোয়াটসআপ!
এইতো। তুমি কেমন আছ বাবা! তোমার লেখালেখি কেমন চলছে!
ভাল। তোমার চাকরি কেমন চলছে!
ভাল।
তারপর আমি আগ বাড়িয়ে কিছু কথা বলি। অর্ক রিপ্লাই দেয়।
তিন. 
অর্কর তখন সাত আট বছর বয়স। একদিন প্রেসক্লাব থেকে ওকে নিয়ে ফিরছি। আমি তখন একটা টয়োটা স্টেশন ওয়াগন চালাই। অর্ক আমার পাশের সীটে। আমি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। অর্ক তৎক্ষনাৎ আমার মুখ থেকে সিগারেটটা নিয়ে বাইরে ফেলে দিল। সেদিন আমি ভীষন লজ্জা পেয়েছিলাম। অরিত্রির বয়স তখন পাঁচ। একদিন সিগারেটের প্যাকেট বেসিনে ফেলে দিয়ে পানি ঢেলে দিলো। বললো,

আমরা

বাবা তোমার যদি কিছু হয় তাহলে আমরা কিন্তু তোমাকে দেখতে হাসাপাতালে যাব না। সেদিন থেকে সিগারেট খাওয়া বন্ধ। এর ঠিক কয়দিন আগেই অর্ককে বুঝিয়েছিলাম কখনো কোনোদিন কোনো বাজে অভ্যাস করবা না। অর্ক কথা রেখেছে। সে এমনকি চা কফিও খায় না। আজও না।

অর্ককে বই কিনে দিলেই সে খুশী থাকতো। এখনও বইই তার সব। একটু উদাসীন, একটু অস্থির প্রকৃতির মানুষ। আমার মধ্যেও অনেক অস্থিরতা আছে, চাঞ্চল্য আছে। যারা আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছে তারা আমার এই স্বভাব জানে। তবে আমার চাঞ্চল্য বোঝা যায় না অর্করটা বোঝা যায়। হয়ত কাল অর্কর একটা ইন্টারভিউ আছে; অর্ক সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে পায়চারি করবে। কোথাও যাবে জাষ্ট টাইমে গাড়িতে গিয়ে বসে থাকবে। এখন যেমন প্রতি রোববার আসে দেখা করতে। আসার আগে অন্ততঃ চার পাঁচবার জেসমিনকে ফোন দেবে। মা আমি পাঁচটায় আসব। দেখা গেলো ঠিক পাঁচটা বাজার তিন চার মিনিট আগেই হাজির।
অর্কর ঘরটা এখন খালি পড়ে আছে। বইয়ের স্তুপ ঘরময়। কিছু কাপড় চোপরও রয়ে গেছে। বাসার একসেট চাবি যেটা ওর ছিল সেটা রয়ে গেছে ওর কাছে। গ্যারেজে ওর পার্কিং স্পটটাও খালি। যখন ইচ্ছা আসবে। প্রায় প্রতিদিন আমি ওর বইগুলো পরিষ্কার করি। অকারনে বিছানার চাদর টান টান করি। ওর আর খাতিজার যুগল ছবিটা পরিষ্কার করি। অর্কর ছয়মাস বয়সের আমার কোলে থাকা ছবিটা ছুঁয়ে দেখি। বুকের মধ্যে হু হু করে ওঠে যখন ওর খালি ঘরটায় ঢুকি… ।

ছবি: লেখক