আমাদের টিনের বাড়ি

কাকলী আহমেদ

টিনের বাড়িতে আসায় এক অদ্ভুত লজ্জাবোধে সিঁটিয়ে থাকলাম। স্কুলে কেউ জিজ্ঞেস করে বলি,নতুন এলাকায় বাসা বদলে যাচ্ছি। কিশোরী বন্ধুদের কৌতুহল কেমন বাড়িতে যাচ্ছি। অল্পবিস্তর বর্ণনা দেই। নিজেরাই দেখিনি। আব্বু আম্মা খুঁজে স্কুলের কাছাকাছি এক বাড়ি বের করেছে। মানুষের শখ ও সাধ্যের মাঝে জীবনব্যাপী এক বিস্তর ব্যবধান রয়ে যায়। মনের মত না হয় ছেলের বৌ,জামাই,সন্তান এমনিতর কতকিছুই। সে জায়গায় ভাড়া বাড়ি অনেক দূর।
সব বলি,মনের কষ্টের কোণে সাবধানে লুকিয়ে রাখি বাড়িটা টিনের। টিনের বাড়িতে থাকাটাকে তখন এক ধরণের লজ্জা মনে করতাম। আজ এত বছর পর স্বাধীনতা পরবর্তী যতগুলো বাড়িতে ভাড়া থেকেছি এ বাড়ির নকশা, বিশাল প্রান্তর স্মৃতিতে বিশাল আলাদ্দীনের অট্টালিকা বললে কম বলা হবে। বন্ধু নুসরাতের কৌতুহলের মাত্রা পরিধিহীন অগত্যা একদিন বলেই ফেললাম বাড়ি কিন্তু টিনের। নুসরাত ছোট ফর্সা,চৌকো মুখাবয়বের একটি মেয়ে। ঘাড় সমান চুল। অল্প চুল কিন্তু বিদেশি মেয়েদের মত পাতলা পাতলা সিল্কী লালচে। । পড়াশুনায় ভাল। অসাধারণ রসিকতা ও মজার বুদ্ধিতে ভরপুর। চট করে সে বলে দিলো, কি মজা বৃষ্টির সময় তোরা টিনের চালে বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে পারবি। বাকি বন্ধুরা বলল তাই তো। আমি জীবনে কখনো টিনের বাড়িতে থাকিনি। বন্ধুদের নতুন বাড়ি নিয়ে আগ্রহ আর স্বতঃস্ফূর্ত বন্ধুত্বের ভালবাসায় ছোট থেকেই ভর ভরন্ত আমি।
জুলাই মাসে এ বাড়িতে আসার পর প্রথম বৃষ্টির শব্দ। আমার কানে সময়ে সময়ে এখনও বাজায় ঘুংগুর নাচন। আমরা তিন বোন পেছনের লম্বা টানা বারান্দার তিন সিঁড়ি দিয়ে নেমে পেছনের বিঘা দুয়েক খালি ঘাস ওয়ালা খোলা প্রান্তরে কি না ভেজাভেজি। পিতা মাতা অনেক সময়ই সন্তানদের শাসন না করে এমন দৃশ্যে নিজেদের শৈশব কৈশোর এত উজ্জ্বল আলোতে দেখে ভীষণ আহলাদিত হয়ে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে থাকেন। টিনের চালের বৃষ্টির সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের পর কতই না গোপন আলাপন রয়েছে মনের সিন্দুকে। থাক না কিছু যত্ন আত্তিতে।
জীবনবোধে কত কিছুই না যোগ হয়। বিয়োগও হয় ম্যালা। এক জীবনে জীবনবোধে সামষ্টিক খুব কি বেশি? তবু জানা হয় বাড়ি নয় মানুষ ভালবাসে মানুষকে। তার পোশাক,বাড়ি,গাড়ি দেখে নয়। তৃতীয় নয়ন ঠিক ঠিক ভালবেসে ফেলে।  বিভিন্ন বয়সে, সময়ে, কালের আড়ালে নানাভাবে ভালবাসা ও লাগার মানুষগুলো জড়ো হয়। মাঝে মাঝে এমন মুখগুলো সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেলেও ডুবুরির মত ভেসে উঠে তাদের কথা মনে করে নিজেও কতই না মন গহীনের নীচে ডুব দিয়ে ঝিনুক,মুক্তা,মানিক তুলে আনি।
ছেলেবেলায় খুব ছোট ছোট ঘটনা কিন্তু বড়ই সুখের মনে হয়। জীবনপথের আলো কি যে তীব্র। সময় গড়িয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তা বোঝা যায়।
সে সময়ে কাকরাইলে ছয় তলা একটি বাড়ি। অবাক বিস্ময়ে আমরা তাকিয়ে থাকি। এক,দুই,তিন,চার,পাঁচ,ছয় করে গুণি। এ বাড়ির একতলায় সামনে মনোয়ারা শিশুবাগ নামে একটি স্কুল। সকালে কিচির মিচির শুনি। ছয় তলায় যারা থাকে তাদের দেখি। অবাক বিস্ময় এই ছয় তলা। ঢাকায় সুউচ্চ দালান তখন বিরল। বসত বাড়ি তো একেবারেই নেই। মতিঝিলে অফিস ভবন আছে কিছু। তাও হাতে গোনা কয়েকটি কেবল।
কারা যেন থাকে আমাদের বয়সী। বড় আগ্রহী। মেয়েটা বা ছেলেমেয়েরা যদি আমাদের বয়সী হয়। বন্ধুত্ব করবার সে কি আহাজারি। বিকেলে খেলাধুলা করা যাবে। পাড়ায় বন্ধুত্ব একটি হয়ত এক সময় বইয়েই লেখা থাকবে। কিন্তু সে সময়ে এটি ছিল এক ধরণের সৌহার্দের জাল। বিশেষ করে মা,খালা চাচীদের যে বন্ধন ছিল। আজ এত বছর পর কি মিস্টি এক ছোঁয়া দিয়েছে। কারো বাড়িতে ম্যাচ নেই। সন্ধ্যের পর হারিকেন জ্বালাতে হবে। ভুলে চুকে আনা হয়নি। পাশের বাড়ি থেকে নিয়ে আসতাম।ফেরত দেবার সময় তিনবার আসা যাওয়া। চৌধুরী চাচী ফেরত নেবেন না। এই তিনবারের আসা যাওয়া আমাদের দিতো বাইরে যাবার সুযোগ।
পাড়ার অভিমান করে চলে যাওয়া আমাকে বড্ডো ভারী করে তোলে। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে। পাড়ার ভাবী। আবার কেউ কেউ গপ্পী ভাবি বলে তাকে একটু এড়িয়ে চলা এমন দেখেছি। এ মজাগুলো টুপ করে ডুবে গেল কেন? সুউচ্চ দালানে পাশাপাশি থেকেও একজন আরেকজনকে চিনি না। এ কি হয়!! কি জানি পাখিরাও তো এক ডাল থেকে আরেক ডালে যায়। দেশ থেকে অন্য দেশে যায়। বড় কাল বুঝি অনেক কিছুই খোঁজে যা নস্টালজিয়া বলে মনে হয় কেবল সবকিছু।
গাছ পালার সঙ্গে যে কত কথা বলেছি। এক দুপুর গড়িয়ে বিকেলের কথা বলছি। কড়ই গাছের মোটা শিকড়ে বসে আছি। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। মনে আছে আকাশের দিকে আমি এক দেড় ঘন্টা তাকিয়ে ছিলাম। খোলা আকাশ আমাকে এত ভাললাগা দিয়েছিল ওই দিনটিতে। কারণ সে যে কিশোর বয়স। আমি তখন কেবল কিশোরী।

ছবি: সজল