নকশাল আন্দোলনের সেই মেরি টাইলার

ভারতের প্রখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা, প্রাবন্ধিক উৎপল দত্ত ভারতের বুকে নকশাল আন্দোলন বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ হয়ে ফেটে পড়ার সময়ে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘একদিকে নকশালবাড়ি অন্যদিকে বেশ্যাবাড়ি। বুদ্ধিজীবীদের বেছে নিতে হবে তারা কোন বাড়িতে উঠবেন।’ উৎপল দত্তের এই আহ্বান তার কানে পৌঁছায়নি সেটা নিশ্চিত ভাবেই বলে দেয়া যায়। কিন্তু তবুও তিনি এক অজানার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। আর সাড়া দিয়ে এসে পৌঁছে গিয়েছিলেন ষাটের দশকে অগ্নিগর্ভ ভারতের পশ্চিম বাংলায়। মিশে গিয়েছিলেন সেই উত্তাল আন্দোলনের আগুনে স্রোতে। তিনি মেরি টাইলার।

চারু মজুমদার

মেরি টাইলার থাকতেন ইংল্যান্ডের এসেক্স-এ। বাবা কাজ করতেন কাছেই টেলবেরি নামে বন্দরে। ছোটবেলা থেকেই বন্দর এলাকায় বেড়ে ওঠা বলেই মেরির কাছে বিচিত্র মানুষ আর তাদের জীবন ছিলো আকর্ষণীয়। মাত্র তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সেই স্কুলের হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে ছুটিতে দেশের বাইরে ঘুরতে যেতেন মেরি। মেরির শৈশব ইংল্যান্ডে কাটলেও লেখাপড়া শেষ করেছেন জার্মানীর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেও নানা দেশ থেকে আসা মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটেছিলো। লেখাপড়া শেষ করে মেরি ফেরেন নিজের দেশে। কাজ নেন স্কুলে পড়ানোর। উত্তর লন্ডনের উ্ইসডেন এলাকায় বাচ্চাদের স্কুলে পড়াতে গিয়েই জাতি-সম্পর্ক বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। সম্ভবত বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েদের পড়াতে গিয়েই বিভিন্ন দেশ এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার পরিধি বাড়তে থাকে তার। মেরি জড়িয়ে পড়েন ‘ক্যাম্পেইন এগেইনস্ট রেসিয়াল ডিসক্রিমিনেশন’ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে। সময়টা ১৯৬৭ সাল। জার্মানীতে ছুটি কাটাতে গিয়ে মেরির সঙ্গে পরিচয় ঘটে ভারতীয় শিক্ষানবিশ প্রোকৌশলী আদর্শবাদী যুবক অমলেন্দু সেনের সঙ্গে।আর এই পরিচয়টাই ঘুরিয়ে দিলো মেরি টাইলারের জীবনের গতিপথ।

তাদের দু’জনের পরিচয় হয়েছিলো ট্রেনে। সেখানেই যেতে যেতে আলাপ সমাজ আর রাজনীতি নিয়ে।ছাত্র বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে তখন ইউরোপ। দুজনের কথাবার্তা আর মত খুব কাছাকাছি চলে আসায় বন্ধুত্বও চলে আসে আলোচনার সূত্র ধরে।কিন্তু হঠাৎ অমলেন্দু সেন সিদ্ধান্ত নেন জার্মানির চাকরি আর ইউরোপের স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে যাবেন। কাজ করবেন পশ্চিমবঙ্গে। অমলেন্দুর এই সিদ্ধান্ত অবশ্য দূরে ঠেলতে পারেনি মেরিকে। বরং অমলেন্দুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মেরি রাজি হয়ে যান ভারতে আসতে। ১৯৬৯ সালে অনুবাদক আর শিক্ষকতার চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ ঘুরে ১৯৭০ সালের ৮ জানুয়ারি মেরি টাইলার দিল্লি থেকে কলকাতাগামী ট্রেনে উঠে বসেন। তার ভাবনায় তখন আছে শুধু অমলেন্দু সেন। মেরি ভাবছিলেন, কলকাতা থেকে তারা দু’জন একসঙ্গে দার্জিলিং বেড়াতে যাবেন। নিজের আত্নজীবনী ` মাই ইয়ার্স ইন অ্যান ইন্ডিয়ান প্রিজন’ বইতে তিনি এরকমই লিখেছেন।১৯৭৭ সালে পেঙ্গুইন বুকস থেকে তার জীবনী প্রকাশিত হয়।তবে অমলেন্দু কেন জার্মানি ছেড়ে কলকাতায় ফিরেছিলেন সে প্রসঙ্গের কোনো উল্লেখ নেই তাঁর বইতে। হয়তো কিছুটা আড়াল করতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু কলকাতায় পা দিয়ে বারুদের গন্ধ মেরি ঠিকই টের পেয়েছিলেন। চোখ গিয়েছিলো দেয়ালের লেখায় ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’।

মেরি টাইলারের আশ্রয় হয়েছিলো কলকাতা শহরের পুকুর-নারকেল গাছের ছায়াঘেরা উদ্বাস্তু কলোনীতে। সেখানে ছিলো অমলেন্দু সেনের পৈত্রিক নিবাস। অদ্ভুতভাবে তখনকার কলকাতা শহর, অমলেন্দুদের পরিবারের রীতিনীতি, খাদ্যাভ্যাস, পরিবারের মানুষ আর পুলিশি নজরদারির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। ওই সময়ে মেরি টাইলার ভারতের পুরী, বোম্বে, মাদ্রাজ ভ্রমণ করেন। চলে যান পাশের দেশ নেপাল আর শ্রীলংকায়। ভারত ভ্রমণে মেরি শুধু মন্দির আর স্থাপত্যকলা দেখে বেড়াননি। তার দৃষ্টি ঠিকই খুঁজে নিয়েছিলো দারিদ্র্য আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় পুড়তে থাকা ভারতের অন্য এক ছবি। তখন থেকেই তিনি ভাবতে শুরু করলেন কীভাবে ভারতের যুবসমাজের আন্দোলনের সঙ্গী হওয়া যায়। কিন্তু লন্ডনের সুচারু জীবন ফেলে কলকাতায় বসে বিপ্লব করা কি সহজ কাজ? মেরি টাইলারের মাথায় এই প্রশ্নটাই ঘুরছে তখন। অমলেন্দু কলকাতায় এসে বিশাল এক চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন। কিন্তু দিনবদলের স্বপ্ন যার চোখে সে চাকরির পেছনে ছুটবে কেন? অমলেন্দু চাকরির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন।চাকরির বদলে তিনি নিজের জীবনে চাইলেন মেরি টাইলারকে। বিয়ের প্রস্তাব দিলেন অমলেন্দু মেরিকে। খুব অল্প দিনের পরিচয়ে এক যুবককে বিয়ে করার প্রস্তাবে মেরি হয়তো প্রথমে একটু চমকে উঠেছিলেন। কিন্তু শেষে জয় হলো ভালোবাসা আর বিপ্লবের। ১৯৭০ সালের ১০ এপ্রিল মেরি টাইলার চিরকালের আত্নীয়তার সেতু বাঁধলেন অমলেন্দু সেনের সঙ্গে। আর বিয়ে করেই তারা মধুচন্দ্রিমা উদযাপনের জন্য বেছে নিলেন ভারতের বিহার রাজ্যের সীমান্ত এলাকার একটি গ্রাম। সেখানে সাধারণ কৃষকদের মধ্যে শ্রেণী চেতনা ছড়িয়ে দিতে এবং কৃষক সংগ্রামের গুরুত্ব বোঝাতে হাতে কলমে কাজ শুরু করেন। পান্তাভাত খেয়ে কৃষকদের মধ্যে কাজ করে তাদের সময় কাটছিলো। ঠিক তখনই মেরি টাইলারকে গ্রাম থেকে গ্রেফতার করে ভারতীয় পুলিশ। অমলেন্দুও আটক হন। শুরু হয় ভারতীয় জেলে মেরি টাইলারের ৫ বছরের কারাজীবন।

ছোট করে কাটা চুলের মেরিকে দেখে পুলিশ প্রথম বুঝতেই পারেনি তিনি নারী। তার পাসপোর্ট দেখে বিষয়টা তাদের কাছে পরিস্কার হয়। সেখানে নেপাল ও পাকিস্তানের ভিসা দেখে গোয়েন্দারা ধরেই নেয় মেরি চীন থেকে চোরাই পথে ভারতে অস্ত্র আমদানী করছে। তাদের ধারণা হয়েছিলো ভারতের বুকে সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত একজন বড় গেরিলা নেতাকে তারা ধরতে পেরেছে। পুলিশের খাতায় মেরি টাইলারের বিরুদ্ধে বোমা মারা, থানা আক্রমণসহ নানা ধরণের অভিযোগ লেখা হয়ে গিয়েছিলো। ১৯৫ সালে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর লেখা আত্নজীবনীতে মেরি অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। মেরি টাইলারের চরিত্রের আদলে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক তার ‘যুক্ত তক্কো গপ্পো’ সিনেমায় এক বিদেশী নারী বিপ্লবীর চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন।সিনেমায় সেই চরিত্রের নাম হেলো বারবারা।

মেরিকে প্রথমে রাখা হয়েছিলো হাজারিবাগ-জামশেদপুর জেলে।সেখানে মেরির প্রথম কাজ ছিলো ভারতীয় জীবনধারাকে বুঝতে চেষ্টা করা। কারণ একটা বিষয় তার তখনই বোঝা হয়ে গিয়েছিলো, জেল থেকে সহজে ছুটি মিলবে না। জেলে বসে অন্য মেয়েদের কাছে হিন্দী ভাষাও শিখতে শুরু করেন মেরি। অন্য সাধারণ বন্দীদের কাছে তখন ফর্সা ত্বকের এই নারী হয়ে ওঠে ভীষণ কৌতুহলের বিষয়। তার স্বামী অমলেন্দুকে রাখা হয়েছিলো একই জেলের পুরুষ ওয়ার্ডে। জেলে মেরি আক্রান্ত হন ডায়েরিয়া আর জন্ডিসে।

মেরি টাইলারের আটক হবার খবর চারদিকে ছড়াতে শুরু করেছিলো আরো আগেই। সংবাদপত্রে তখন মেরি ছিলেন গরম খবর। সম্ভবত সেই সূত্র ধরেই লন্ডনেও খবরটা পৌঁছে যায়। তার মুক্তির জন্য সেখানে বন্ধুরা একটি সংগঠন তৈরী করে ফেলে। অমলেন্দুর বাবা-মা জেলে দেখা করতে যেতেন তাদের পুত্রবধূর সঙ্গে। এদিকে বৃটিশ হাইকমিশন থেকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মেরির প্রত্যাবাসনের প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু তখন বেঁকে বসেন মেরি টাইলার। দাবি তোলেন তার সঙ্গে সহবন্দীদেরও মুক্তি দিতে হবে। ফলে পিছিয়ে গেলো তার মুক্তির প্রক্রিয়া। এরই মাঝে ১৯৭০ সালের ৬ জুলাই হারাজরীবাগ জেলে মেরির চোখের সামনে কারারক্ষীদের আক্রমণে খুন হয় ৬ নকশালপন্থী যুবক। ওই সময়ে ভারতের নানা জেলে নকশালবাদী তরুণরা জেল বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন। মেরির মুক্তির প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে থাকে। পাশাপাশি নকশাল আন্দোলনের আগুনও ক্রমে স্তিমিত হয়ে আসতে থাকে। ১৯৭৫ সালের ৪ জুলাই মেরি জানতে পারেন ভারত সরকার তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। তৎকালীন ভারতীয় সরকারও বিদেশিনী বন্দীকে মুক্তি দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেদের ইমেজ রক্ষা করতে চাচ্ছিলো। অবশেষে আসে মুক্তি। জামশেদপুর থেকে মেরি টাইলারকে ট্রেনে কলকাতায় নিয়ে এসে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মাঝরাতের এক বিমানে তুলে দেয়া হয়। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন ভারতে ইংল্যান্ডের দূতাবাসের একজন কাউন্সিলার। সেই ভদ্রলোক মেরির হাতে তুলে দেন ৫টি পাউন্ড। মেরি টাইলারকে নিয়ে বিমান উড়াল দেয় ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ মাই ইয়ার্স ইন অ্যান ইন্ডিয়ান প্রিজন-মেরি টাইলার
ছবিঃ গুগল