দুর্গেশনন্দিনী ছাপা হয়েছিলো তেরোবার

মমিনুল ইসলাম

দুর্গেশনন্দিনী’‌ লেখকের জীবৎকালে ছাপা হয়েছিলো তেরোবার। ‘‌মৃণালিনী’‌র এডিশন হয়েছিল দশ আর ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌ ছাপা হয় আটবার।

বঙ্কিমচন্দ্র বরাবরই তাঁর বইয়ের ভাল বাজার পেয়েছিলেন। তবে মজার তথ্য হচ্ছে  রবীন্দ্রনাথ তাঁর কালে নিজের বইয়ের তেমন ভাল বাজার পাননি। আর প্রথম প্রকাশিত বইয়ের ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ উভয়কেই রীতিমতো হতাশ হতে হয়েছিল। তাঁদের প্রথম বইয়ের দু’টি–‌একটি কপিও বাজারে বিক্রি হয়েছিল কি না সন্দেহ।

‘‌দুর্গেশনন্দিনী’‌ যখন প্রকাশিত হয় তখন বঙ্কিমচন্দ্রের বয়স সাতাশ। তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিল মাত্র আঠারো বছর বয়সে। বাংলা গদ্যের সাম্রাজ্যের এই সম্রাটের প্রকাশিত প্রথম পুস্তকটি কিন্তু পদ্যে রচিত ছিলো!‌ বঙ্কিমচন্দ্র সেই কৈশোর–‌উত্তীর্ণ বয়সে নিজেকে রীতিমতো একজন বড় মাপের কবি বলেই মনে করেছিলেন। তাঁর কাব্যগুরু সংবাদ প্রভাকরের ঈশ্বর গুপ্ত। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রথম বই তথা কাব্যগ্রন্থের নাম দিয়েছিলেন ‘‌ললিতা ও মানস’‌।
যে বছর বইটি বের হয় সে বছরেই সংবাদ প্রভাকর কাগজে বঙ্কিমচন্দ্র বইয়ের বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন এভাবে, “‌‌বিজ্ঞাপন/‌ললিতা ও মানস/‌ উক্ত উভয় পুস্তক পয়ারাদি বিবিধ ছন্দে মতকর্তৃক বিরচিত সংপ্রতি প্রকাশ হইয়াছে। যাঁহার প্রয়োজন হয় প্রভাকর যন্ত্রালয়ে অথবা পটলডাঙ্গার ৮৬ নং নিউ ইণ্ডিয়ান লাইব্রেরিতে তত্ত্ব করিলে পাইতে পারিবেন। ঐ পুস্তক একত্রে বন্ধন হইয়াছে। মূল্য ছয় আনা। শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।”‌
এই বই প্রকাশের পঁয়ত্রিশ বছর পর বঙ্কিমচন্দ্র লিখিতভাবে স্বীকার করে গিয়েছিলেন যে তাঁর প্রথম পুস্তক, কাব্যগ্রন্থ, ‘‌ললিতা। পুরাকালিক গল্প। তথা মানস’‌

প্রথম বইয়ের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ভাগ্যেও সেই একই দশা ঘটে। ‘‌কবি–‌কাহিনী’‌ বই–‌আকারে ছাপা হয়েছিলো কবির সতেরো বছর বয়সে— তাঁর এক বন্ধুর সাগ্রহ তৎপরতায়। রবীন্দ্রনাথ সেই বন্ধুকে স্মরণ করে পরে বলেছেন, ‘‌তিনি যে কাজটা ভালো করিয়াছিলেন তাহা আমি মনে করি না.‌.‌.‌। দণ্ড তিনি পাইয়াছিলেন, কিন্তু সেই বই–লেখকের কাছে নহে, বই কিনিবার মালিক যাহারা তাহাদের কাছ হইতে। শোনা যায়, সেই বইয়ের বোঝা সুদীর্ঘকাল দোকানের শেল্‌ফ এবং তাঁহার চিত্তকে ভারাতুর করিয়া অক্ষয় হইয়া বিরাজ করিতেছিল।’‌
কবি সারা জীবনে কখনও দ্বিতীয়বার আর এ–‌বই ছাপতে দেননি।
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস ‘‌দুর্গেশনন্দিনী’‌। প্রকাশের চার বছরের মধ্যে তিনটে এডিশন প্রকাশিত হয়। প্রকাশের দশ বছরের মধ্যে ছ’‌টা এডিশন। আর তাঁর সমগ্র জীবৎকালে ‘‌দুর্গেশনন্দিনী’‌ ছাপা হয়েছিল মোট তেরোবার।
‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়েই আছে। কিন্তু এই অসামান্য উপন্যাসটি বঙ্কিমের কালে কিন্তু তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি। আরও আশ্চর্যের, ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌র চেয়ে ‘‌মৃণালিনী’‌র বিক্রি ছিলো বেশি। ‘‌দুর্গেশনন্দিনী’‌র পরের বছর ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌, আর ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌র দু’‌বছর পরে ছাপা হয় ‘‌মৃণালিনী’‌। বঙ্কিমের জীবৎকালে ‘‌মৃণালিনী’‌র এডিশন দশ;‌ এদিকে দু’‌বছর আগে প্রকাশিত হয়ে‌‘কপালকুণ্ডলা’‌ ছাপা হয় আটবার।
বঙ্কিম ১৮‌৭২–‌এ যখন বঙ্গদর্শন বের করলেন তখন তিনি সেই অবিক্রিত কাব্যগ্রন্থটি ছাড়াই তিনটি উপন্যাসের স্রষ্টা।বঙ্গদর্শন প্রকাশের সঙ্গে–সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের খ্যাতি এবং পসার দুই–‌ই বেড়ে যায়। বঙ্গদর্শনের সূচনাতেই তাঁর হাজার–‌ছোঁয়া গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়ায়।তখন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্রের পোস্টিং বহরমপুরে। কলকাতার ভবানীপুর থেকে ছাপার কাজ হলেও লেখা সংগ্রহ, বাছা ও সম্পাদনার সব কাজ বঙ্কিম বহরমপুরে বসেই করতেন। পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকেই শুরু হয়েছিলো বঙ্কিমের ধারাবাহিক উপন্যাস ‘‌বিষবৃক্ষ’‌।

ধারাবাহিক ‘‌বিষবৃক্ষ’‌ উপন্যাস দিয়ে বঙ্গদর্শনের পথচলা শুরু হয়েছিল। এই পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে ‌সঙ্গে বঙ্কিম যেমন তাঁর লেখার হাজারো অনুকূল পাঠক পান, তেমনি কিছু  নিন্দুক পাঠকও মাথা–‌চাড়া দিয়ে উঠেছিল। তাঁর মৃত্যুর পর ভিড়ে–‌ঠাসা কলকাতার সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘‌মনে আছে, বঙ্গদর্শনে  যখন তিনি সমালোচক–‌পদে আসীন ছিলেন, তখন তাঁহার ক্ষুদ্র শত্রুর সংখ্যা অল্প ছিল না। শত শত অযোগ্য লোক তাঁহাকে ঈর্ষা করিত এবং তাঁহার শ্রেষ্ঠত্ব অপ্রমাণ করিবার চেষ্টা করিতে ছাড়িত না।’‌
বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৮৬ সালের ২৪ মে এক বিশিষ্ট সাহিত্যসমালোচককে পত্রোত্তরে লিখছেন:‌
“‌কৃষ্ণকান্তের উইল সম্বন্ধে একটা কথা বলিয়া রাখা ভাল। প্রথম সংস্করণে কয়েকটা গুরুতর দোষ ছিল। দ্বিতীয় সংস্করণে তাহা কতক কতক সংশোধন করা হইয়াছে। পুস্তকের অর্ধেক মাত্র সংশোধিত হইয়া মুদ্রিত হইলে, আমাকে কিছুদিনের জন্য কলিকাতা হইতে অনতিদূরে যাইতে হইয়াছিল। অতএব অবশিষ্ট অংশ সংশোধিত না হইয়াই ছাপা হইয়াছিল। তাহাতে প্রথমাংশে ও শেষাংশে কোথাও কিছু অসঙ্গতি থাকিতে পারে।”‌ মৃত্যুর এক বছর আগে ‘‌রাধারানী’‌র চতুর্থ সংস্করণের ছোট্ট ভূমিকায় বঙ্কিম বলেছেন, “‌এই ক্ষুদ্র উপন্যাসের দোষ সংশোধন করিতে গিয়া, ইহার কলেবর বাড়াইতে হইয়াছে। কাজেই মূল্যও বাড়াইতে হইয়াছে।”‌
আবার তাঁর শেষ উপন্যাস ‘‌সীতারাম’‌–এর দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় বঙ্কিমের নিবেদন, “‌সীতারামের কিয়দংশ পরিত্যক্ত এবং কিয়দংশ পরিবর্তিত হইল। গ্রন্থের আকার অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র হইল, এজন্য ইহার দামও কমানো গেল।”‌

বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা বই বিক্রির ভালো বাজার পেয়েছিলো ১৮৮৪ সাল থেকে ১৮৯২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। ১৮৮৪–‌তে তাঁর দুটি নতুন বই বের হয়, ও পাঁচটি বইয়ের এডিশন হয়। ১৮৮৬–তে একটি নতুন ও ছ’‌টি পুরনো বইয়ের এডিশন হয়। ১৮৮৭–‌তে দুটি নতুন ও চারটি পুরনো বইয়ের এডিশন। ১৮৮৮–‌তে একটি নতুন ও একটি পাঁচটি পুরনো বইয়ের এডিশন হয়। ১৮৯২–এ নতুন বই একটি ও পুরনো পাঁচটি বইয়ের সংস্করণ হয়। তাঁর বইয়ের বাজার একেবারেই অনুজ্জ্বল নিষ্প্রভ ছিল ১৮৭৬ ও ১৮৮৯–‌এ। ১৮৭৬–এ একটি মাত্র বই বাজারে বের হয়, কোনও পুরনো বইয়ের নতুন সংস্করণ হয়নি। আর ১৮৮৯–‌এ একটি মাত্র বইয়ের সংস্করণ হয়েছে, নতুন কোনও বই ছাপা হয়নি।
তাঁর কালে বঙ্কিমচন্দ্রের পাঠক উপন্যাসকে যেভাবে  গ্রহণ করেছিলো, তাঁর প্রবন্ধ–সাহিত্যকে কিন্তু সেভাবে করেনি। তিনি বেশকিছু প্রবন্ধ সাহিত্য রচনা করেছিলেন। কিন্তু সেসব প্রবন্ধের বই তখনই দ্বিতীয় সংস্করণের বেশি আর এগুতে পারেনি।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর নিজের লেখা উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনীর একাদশ সংস্করণ প্রকাশকালে বলেছিলেন, “এই পুস্তকখানির লোকে যত নিন্দা করিয়াছে তত আর কোনও পুস্তকের করে নাই;‌ তাই এ পুস্তকের বিক্রি বেশি।”‌

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল