তখন গল্পের তরে…

বলতে চেয়েছিলাম এবার প্রাণের বাংলার ঈদ সংখ্যার আয়োজনে রইলো গল্প, ছুটিতে জমিয়ে পড়ুন। কিন্তু গল্পগুলোতে কিছুটা বিষাদ ছুঁয়েই থাকলো শেষ অবধি। গল্প তো এরকমই। জীবনের খোঁড়া আয়োজন, ভাঙ্গা কাঁচে কেটে সামান্য রক্তপাত, অভিমান-এসবও তো গল্প। এবার তেমনি কিছু গল্প পাঠকদের জন্য। গল্পগুলো খানিকটা চিঠির ঢঙ্গে লেখা। কূলে আছড়ে পড়েও সমুদ্রের ঢেউ যেমন পিছিয়ে যেতে যেতে চিঠি লেখে তীরের শরীরে খানিকটা সেরকম।

সায়ন্তন ঠাকুর

গরম ভাতের গন্ধ

বছরে একবার তায়েব মিঞা ক’টা গোরুর গাড়ি বোঝাই নতুন ধান নিয়ে এসে হাজির হয়। অঘ্রাণ মাসের মাঝামাঝি, পাতলা কুয়াশার স্তর পার হয়ে সন্ধের মুখে আমাদের বারবাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায় পাঁচ সাতটা জোয়ান বলদ টানা গাড়ি। গাড়ির নীচে হ্যারিকেন ঝোলানো। তখনও বাড়ির বাণেশ্বর শিবের থানে সন্ধে প্রদীপ জ্বলেনি। বেজে ওঠেনি শাঁখ। বলদগুলোকে জোয়াল থেকে ছাড়িয়ে উঠোনের খুঁটিতে বেঁধে দেয় তায়েব চাচা। গলা তুলে হেঁকে বলে,
—উ মঈন, বলদ গুলানকে দু আঁটি খড় দিনি, বাপ আমার।
হা ক্লান্ত বলদগুলো ঝিমোতে থাকে। সেই কোন সকালে ঘর থেকে বেরিয়েছে। পথ তো কম নয়। বিশ মাইল। গঙ্গার পুব পারে পুরনো গঞ্জ মানিক্যহার। এখানকার লোকে বলে মানকেহার। আছেন আমাদের বংশের কুলদেবতা গিরিধারী। চারশো বছরের মন্দির। পুরনো খিলান, নাটমন্দির, বাস্তুভিটে। কতদিন সংস্কার হয়নি ওই ভিটে। জংলা আগাছা, বুনো লতা, অশ্বথের চারা বাংলা ইঁটের দেওয়াল ফাটিয়ে মুখ তুলেছে আকাশের দিকে। এমন অঘ্রাণের সন্ধেয় আবছা কুয়াশায় ঢেকে যায় তারা। দৃশ্যমান জগতের ওপার থেকে যেন ভেসে আসে গিরিধারীর আরতির কাঁসর ঘন্টার শব্দ।
জমিজমা সব কিনেছিলেন বাবার দাদু। বেশিরভাগই দেবোত্তর সম্পত্তি। কিছু ধানি জমি ঘরের সারা বছরের চাল জোগায়। সে সব জমিজিরেত তায়েব চাচা চাষবাস করে। নতুন ধান উঠলে বস্তা বোঝাই করে নিয়ে আসে। সে ধান জমা থাকে আমাদের গোলায়। খড় ছাওয়া মাটির উঁচু গোলা। আলকাতরা মাখানো একখানি ছোট কালো দরজা তার মুখে। নতুন খেজুর গুড়ও আনে চাচা। নরম কড়াইশুঁটি। ফুলো ফুলো লাল মুড়ি কড়াইশুঁটি আর নতুন গুড় কাঁসার বড় জামবাটিতে মেখে খেতে দেয় মা।

তায়েবচাচা নিজের গামছাখান কাঁধে নিয়ে উঠোনে বসে।একটা বিড়ি ধরায়। আমাকে দেখতে পেয়ে হাত তুলে ইশারায় ডাকে। জিগ্যেস করে
—পড়ানেখা চলছি দা’ঠাকুর ?
—চলছে।—একটু সলজ্জ হাসি আমি।
—পড়ানেখা করি অনেক বড় হও দা’ঠাকুর। বংশির মান রাখতি হবে তুমাকে।
যেন কতদিনের চেনা। হেমন্তের কুয়াশা আর নতুন ধানের গন্ধে মাখামাখি এক সন্ধে নেমে এসেছে তখন চারপাশে।বাড়ির পিছনের বাগানে বুড়ো জামরুল গাছের তলায় জমেছে ঝুঁঝকো আঁধার। বাতাবি লেবু, তেজপাতা, উঁচু উঁচু নারকেল গাছ সারাদিনের ব্যস্ততার পর ক্লান্ত শরীরে নিথর দাঁড়িয়ে। পুকুর থেকে উঠে আসা বাতাসে শীতের শিরশিরানি। একটা লক্ষী প্যাঁচা প্রতিদিন ঠি ক এই সময় কোথা থেকে উড়ে এসে বাড়ির কার্ণিশে বসে। তারপর ডাকতে ডাকতে ওই বাঁশঝাড়ের দিকে উড়ে যায় ফের। জ্বলে ওঠে বাণেশ্বর শিবের থানে প্রদীপ। আমাদের বাড়ির অধিষ্ঠিত দেব। তাঁর নামেই এই বাস্তু। বংশ পাহারা দেন নাকি তিনিই। রুপোর চাঁদ তাঁর মাথায়। চোত মাসে মানত করা কত সন্নিসি আসে আমাদের বাড়ি। গাছের প্রথম আম, বেল দিয়ে যায়। এই সন্ধের মুখে কত শব্দ শোনা যায় পুরনো বাড়ির দরদালানে। ফিসফিস করে কারা যেন কথা বলে। কতদিনের মায়া, ছেড়ে যাওয়া কি সহজ ?

ঠাকুমা একটা লণ্ঠন নিয়ে এগিয়ে আসেন। তায়েব চাচা তাড়াতাড়ি বিড়ি ফেলে উঠে দাঁড়ায়। গড় হয়ে পেন্নাম করে ঠাকুমাকে দূর থেকে। ঠাকুমার আঁচলের পাশে আমি।
—কেমন আছো তায়েব ?
—মা ঠাকরুণের দয়ায় চলি যিছি গো!—একমুখ হাসি ঝরে পড়ে কাঁচা পাকা দাড়ির ওপর।
—এবার ধান কেমন ?
—তা ধরিন ক্যানে বিশ মণ হবেক!
একটু চুপ করে থেকে ঠাকুমা বলে
—বসো, ভেতর বাড়ি থেকে সিধে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
এই বাড়ির নিয়ম। ভেতর থেকে চাল মুসুর ডাল আলু পেঁয়াজ আর লঙ্কা ধামায় করে দিয়ে যাবে কাজের বৌ। আর কিছু শুকনো কাঠ। মাটির উনোন বানিয়ে বারবাড়ির উঠোনে রান্না বসাবে তায়েব চাচার দল। ভাত, পাতলা মুসুর ডাল লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে আর ঝাল ঝাল আলু সেদ্ধ মাখা। রাত আরও ঘন হবে। শীতের রাত। আগুনের পাশে গোল হয়ে ওরা গল্প করবে। মাঠের গল্প, হালের বলদের গল্প, গাভীর গরম হওয়ার গল্প। বীজতলা আর ধান। কুয়াশা পার করা একটা জীবন।

মা তখন আমাকে জোর করে নিয়ে যাবে ভেতরে। খাইয়ে ঠাকুমার পাশে শুইয়ে দেবে। নিভু নিভু আলোয় ঘরের দেওয়ালে পাখা মেলে উড়ে যাবে পক্ষীরাজ। সুয়োরাণী দুয়োরাণী, অভিমানী কঙ্কাবতী। ছুটে আসবে ডাকাতের দল। ওই বুড়ো জামরুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে নীলকমল। লালকমলের আগে কে জাগে ? কে জাগে ?

উত্তর আসে না। শুধু পুকুর থেকে উঠে আসা শীত বাতাসে মিশে যায় তায়েব মিঞার গরম ভাতের গন্ধ। মুসুর ডালের গন্ধ। পুরনো দমচাপা বাড়ির দরদালানে আজও পাক খেয়ে মরে সে বাতাস। কার্ণিশে বড় হয় অশ্বথের চারা। ধুলোময় উঠোন। ভেঙে গেছে ধানের গোলা। কেউ নেই তাদের। কেউ কোথাও নেই।

লুৎফুল হোসেন

তারাদের ঠিকানায়

সু,

দেবদারুর ছায়ায় ভাঙা সিঁড়িটার উপর বসে ছিলাম গত সন্ধ্যা নামার অনেক আগে, সেই মাঝ বিকেল থেকে। গত দু’বছরের স্মৃতির শ্যাওলা ছড়িয়ে ছিলো বসবার জায়গাটুকুন বাদে তার সারাটা গায়। বুকের ভেতরের লোবান পোড়া গন্ধে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল চেনা সুবাস।

একজোড়া বুলবুলিও ছিলো বসে অন্য দিনের মতোন। শুধু ওরা যেনো ছিলো বাকহীন। একটু ডাকাডাকিও ছিলো না তাদের আগের মতোন। এমন নীরবতা মেখে থেকে থেকে ক’বার ডানা ঝাপটেছিল কেবল। আমার কেবলি মনে হচ্ছিল তোমাকেই খুঁজছিলো বুঝি ওরা।

সিঁড়ির পাশে পায়ের ধারে আধোচাঁদ জলের খাদের কিনারে কয়েকটা মাছ খুব চঞ্চল ছোটাছুটির পর সবচেয়ে কাছের ধারটায় এসে সিঁড়িটা ঠুকরে যাচ্ছিলো বার বার।

তুই থাকলে বুঝতি হয়তো ওদের কথা। আমার কি আর ওসব বোঝা হয়ে উঠবে কোনো দিন! কিছুই কি পারলাম বুঝতে আজ অব্দি! এই যে কাল এলি না বিকেল সন্ধ্যার সীমান্তে ডানা মেলা আলোগুলো আমার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে! এর মানেটা কি আমি আদৌ কিছুমাত্র বুঝেছি! কি জানি! হয়তো রাগ করেছিস। অভিমান! হয়তো আর কখনোই আসবিনা চালচুলোহীন এই হতচ্ছাড়াটার কাছে। বসবি না পাশে। বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলে মাটি খুড়ে খুড়ে নীরবতায় আমার বুকের ভিতর খুবলে দিবি না, মান ভেঙে গেলে আর হাসবি না মুখ টিপে।

হয়তো এসব কিছুই না। কর্কট রোগটাকে সামাল দিতে হয়তো চলে গেছিস বিদেশ বিভূঁই। হয়তো শুভ্র অ্যাপ্রন গায় স্মিতহাসি দেয়া কোনো ডাক্তার বা নার্স হবে তোর পড়ন্ত বিকেল আর সন্ধ্যাগুলোর সঙ্গী।

আর আমি ! আমি কি আসতেই থাকবো এভাবে প্রতি দিন তোর অনুপস্থিতির আড়ালে লুকোনো সখ্য স্মৃতির সুখ-গন্ধ-বর্ণ হাতড়ে যেতে !

ইশশশ … যদি সেই ভয়ংকর অসুখটা হয়েও তোর সংগে মিশে যেতে পারতাম। সারাটাক্ষণের জন্য একাকার হয়ে যেতে পারতাম !

আমি কিন্তু আসতেই থাকবো, আসতেই থাকবো অনন্তকাল ধরে সন্ধ্যা ডিঙিয়ে তারাদের কাছে তোর খবর জিজ্ঞেস করে তবেই রোজ বাড়ী ফিরবো।

ইচ্ছে হলে রাগ করে রাতভর ওই শ্যাওলার চাদরে মোড়ানো মখমলি পুকুর ঘাটে শুয়ে থাকবো রাত ভর। তারাদের ঈর্ষা জাগিয়ে যদি কখনো তুই এসে চুলে বিলি কেটে ডেকে দিস !

ভালো থাকিস, যেখানেই লুকিয়ে থাকিস তুই।

দু

লীনা ফেরদৌস

বেহাগের চিঠি

এখন গভীর রাত, চারদিকে সুনসান নীরবতা।  প্রতিদিন ঠিক এই সময়টার জন্য আমি অপেক্ষা করি, কারণ গভীর রাতের নিস্তব্ধতা আমাকে নিয়ে যায় এক পরা-বাস্তব জগতে, এই সময়টাতে আমি আমার মত করে খুঁজে পাই জীবনকে। তাইতো আমার এই প্রিয় সময়টাকেই বেছে নিয়েছি তোমাকে চিঠিটি লিখব বলে, আমার প্রথম এবং শেষ চিঠি…

 আমরা দুজন রোজ এক একটা অভ্যস্ততার দিন কাটাই। এইতো আমার পাশেই শুয়ে আছো তুমি অথচ কি যোজন  দূরত্ব। তুমি রোজকার মত দুপুরে খেতে আস, ভীষণ ব্যস্ততায়, আমার চোখের কাজল, পাটভাঙ্গা তাঁতের শাড়ী কিম্বা কপালের ছোট্ট টীপ কিছুই চোখে পড়ে না তোমার। অথচ আমি রোজ অপেক্ষায় থাকি কবে তুমি ঘরে ঢুকেই মুগ্ধ চোখে বলবে “আজ এই বেলা আর অফিসে যাব না। “

খেতে বসেও ভীষণ রকম তড়িঘড়ি তোমার। খাবার সময়ে তুমি কখনোই দেখ না যে কি মমতায় তোমার জন্য আমি প্রতিদিন টেবিল সাজাই। রোজ তোমার পছন্দের তরকারি, লেবু, মরিচ সাজিয়ে একসঙ্গে খাব বলে অপেক্ষা করি।  অপেক্ষায় থাকি কোনদিন তুমি বলবে “আজ কচুর লতি আর চিংড়িমাছটা অসাধারণ ছিল, মাছের কোপ্তার রেসিপিটা কি নতুন শেখা, না কি তুমি নিজেই এক্সপেরিমেন্ট করেছ।” কিন্ত আমার অপেক্ষা শেষ হয় না। তোমার ব্যস্ততার ট্রেন আমাকে একাকী এক অন্ধকার প্ল্যাটফর্মে ফেলে চলে যায় নিজের গন্তব্যে।

আমি অপেক্ষায় থাকি একদিন সকালে আমাকে অবাক করে দিয়ে তুমি বলবে “চলতো দেখি আজ তোমার বাগানে কি কি ফুল ফুটেছে?”। ভোরের সোহাগী আলোয় আমরা দুজন প্রজাপতি যুগলের মত সোনালী প্রেমে ভেসে বেড়াব। কিন্ত তখন তোমার নেশাতুর চোখ থাকে খবরের কাগজের পাতায়। সকালের সোনালী রোদ মাখা হয় না তাই।

কোন কোন কমলা বিকেলে দুরে ওই লাল বাড়ীর বয়স্ক দম্পতিরা  যখন গল্পে মত্ত,  পাশের সজনে গাছে দুটি শালিক যখন এডাল ওডালে নেচে নেচে তারস্বরে চিৎকার করে। আমি অবাক হয়ে বুঝতে চেষ্টা করি তারা ঝগড়া করছে না ভালবাসার কথা বলছে। আমারও খুব ইচ্ছে করে এমন কমলা বিকেল আমাদের চায়ের কাপে  নেমে আসুক। দুজনের ছোট ছোট খুনসুটিতে  আবছায়া নীল হোক মায়াবী সন্ধ্যেটা।

 ৩০টা বছর  এরকম অনেক কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমি ভীষণ ক্লান্ত, প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে শুধু ভালোবাসার অপেক্ষায়।  সমঝোতার দেওয়ালে আজ আমার পিঠ ঠেকে গেছে, এখন আমি জীবনের এমন একটা প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি যখন  হিসেব  নিকাশটা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। একটাই জীবন, নিজের চাওয়া পাওয়ার জ্যামিতিক সমাধানটা আজ সত্যি খুব প্রয়োজন।

সেদিন হটাত আমার বুকের বামদিকে একটা ছোট্ট সিস্ট আবিষ্কার করলাম। পাশের বাসার ডাক্তার ভাবিকে দেখালাম। উনি কিছু টেস্ট দিলেন। টেস্টগুলো করিয়ে জানতে পারলাম আমার শরীরে ক্যান্সারের শেকড় তাঁর ডালপালা ছড়িয়ে অনেকটাই স্থায়ীভাবে বসবাস  শুরু করেছে।  আমার চারপাশে ওলট পালট হওয়া বাস্তবতার ঝলসানো রোদ, ক্লান্ত জীবন তোমাকে স্পর্শ করল না। তোমাকে বেশ কয়েকবার বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। জীবনে প্রথমবার বুক জুড়ে নেমে আসলো তুমুল অভিমানী বৃষ্টি।  প্রবল জলোচ্ছ্বাস  হয়ে তীব্র অভিমান ধুয়ে মুছে নিয়ে গেলো অপেক্ষার পালা, গভীর উপলব্ধির পলিমাটিতে লিখে দিয়ে গেল এক নতুন কবিতা।

আমাদের রোজকার সাধারণ জীবনটা হয়তো শুধু তোমার সামান্য সঙ্গ, একটু মনোযোগ, একটু ভালবাসাতে অসাধারণ হতে পারত। কিন্ত আমি হয়ত সে সবের যোগ্য ছিলাম না কিম্বা তোমার ব্যস্ত কর্ম জীবনে আমাকে নিয়ে ভাববার অবকাশ ছিল না। তুমি হয়ত ভেবেছিলে বিবাহিতা  স্ত্রীকে আলাদা করে সময় দেবার মত আদিখ্যেতার প্রয়োজন নাই। অন্তহীন এই জীবন  কি এত উপেক্ষা আর ভালবাসা-হীন শিকলে আটকে রাখা যায়?

আমি আজ চলে যাচ্ছি। জানি তিরিশ বছরের মায়ার চৌকাঠ ডিঙানো এত  সহজ নয়। তবুও শূন্য দাওয়ায় বসে জীবনের  শেষ ক’টা দিন আমি আর ভালোবাসার অপেক্ষা করতে পারবো না। তোমার সঙ্গে ভালোবাসার  সুর মেলাতে পারিনি তাই দুরে একাকী বসে বেসুরো বেহাগ না হয় হোক আমার শেষ সময়ের সঙ্গী। আমি কোথায় যাব, কার কাছে যাব কিছুই ঠিক করিনি শুধু মনে হয়েছে টলোমলো পা ফেলে অনাগত সময়ের দিকে আগাবো না আ। ফুরিয়ে যাওয়া বাতির মত নিভে যাবার আগেই নিজের মত একটু জ্বলে উঠতে চাই।

ভাল থেকো নিরন্তর…

নুসরাত নাহিদ

সৈয়দপুরের চিঠি

অনুপম,

তুমিই মনে হয় বলেছিলে প্রতিটি শহরের একটি নিজস্ব গন্ধ থাকে…শহরের হাওয়ায় দু’বার শ্বাস নিলেই এই গন্ধ টের পাওয়া যায়…যেমন তুমি পাও, আমাদেরটা…সৈয়দপুর এমন একটি শহর…মফস্বলই যথার্থ শব্দ এর জন্যে…সবুজ গালিচায় একলা দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো লাল রেল দালান, তাকে ছায়া করে থাকা রেইনট্রির পাতা সোনামুখী সুঁইয়ের মতো এফোঁড় ওফোঁড় করে গলে আসা সকালের সূর্য, গুঁড়ো গুঁড়ো পাথর খসে পড়া চিনি মসজিদ, তারই কাছাকাছি রঙিন নকশা কাটা কাঁচের জানালা ঘেরা আর্মেনিয়ান চার্চ, বাংলাদেশের বুকে হঠাৎ করেই বাগা, প্যান্ডোলিম কিংবা কোলভা সৈকতের চার্চের কথা মনে করিয়ে দেয় যা, আর হলদেটে রোঁয়া উঠে যাওয়া দেওয়ালের পরিত্যক্ত টিনশেডের ঘর, তাও আবার ঝাঁ চকচকে সেনানিবাসের বুকের মধ্যিখানে…সব কিছু কেমন ফিসফাস করে কানের কাছে তোমার কথা বলে দিয়ে যায়…তুমি শুনতে পাওনা এ শব্দগুলি, তুমি দেখতে পাওনা সে সময়ের উচাটন মনের দুকূল ভাসানো প্লাবন…

চিকন চিকন গলিতে কিংবা রেলক্রসিং এর পাল্লা উঠে গেলে উদ্বিগ্ন রিকশায় বাবা আর তার কোলজুড়ে পাঁচ মাস বয়সী পুত্র, সাইকেলে চেপে চলে যাওয়া দুরন্ত কৈশোর, পুরনো কাঠের ভাঁজ দেওয়া দরজা ঠেলে ততোধিক পুরনো কাঠের আলমারিতে রাখা হোমিওপ্যাথির ছোট্ট ছোট্ট শিশি আর শিশিজুড়ে টুকুর টুকুর চেয়ে থাকা সাদা সাদা চিনির দানা, ওজনদরে কিনতে পাওয়া রপ্তানির চাদর কিংবা পর্দায় বনেদী ঘরের সুবাস, জ্বলন্ত উনুনে উত্তপ্ত তেলে ভাজা ভাজা হতে থাকা পাখির মন, শাড়ির জমিনে দিনরাত্তির নকশা বুনে যাওয়া রেশম সুতোর রীল, একহারা গড়নের দু’তরুণের কাছ থেকে হঠাৎ করেই উড়ে আসা অবাঙ্গালি শব্দের জোড়, সব কেমন করে যেন মন ক্যামন ক্যামন করা অসুখ বাঁধিয়ে দিয়ে যায়…সে অসুখের খোঁজ রাখো না তুমি…

তবুও তুমি আমাদের গন্ধ পাও, হাতের মধ্যে হাতটি পেলে নেমে আসে তোমার শব্দের ঢল…মেলেনা, আমার ছোট্ট মাথায় এসবের হিসেব কিছুতেই মেলেনা…।

জয়দীপ রায়

বৃষ্টি ছেড়ে…

হঠাৎ চলে আসতে হল বৃষ্টি ছেড়ে। ভেজা রাস্তা ছেড়ে। ভেজা মন ছেড়ে। ঘরের জানলাগুলো একবার দেখে নিস না শকুন্তলা, বন্ধ করেছি কিনা। জানলার বাইরে কাঁঠালপাতায় বৃষ্টিফোঁটা লেগে থাকে যেন মানুষের চান করে আসার পর নরম পিঠে জলকণা। জানলা বন্ধ থাকলে একবার খুলে দেখে নিস লাল্টুদের কাঁঠালগাছটা।
হোয়াটস্ অ্যাপে খবর পেলাম কাল থেকে দু’দিন দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে ভারী বৃষ্টিরাত হবে। ঘুমের মধ্যে টেরও পাবিনা দাস, কত বৃষ্টি হয়ে গেল রাতভর। ব্যথার ওষুধে বৃষ্টির শব্দ কেমন যেন ঘোলা হয়ে যায়। শুধু শরীর টের পায়। আর উপশম হয়। ব্যথা কমে যায়। যদি সত্যিই দু’রাত ধরে বৃষ্টিতে ভেজা হাওয়ায় তোর শরীর ধুয়ে যায়, দেখবি আর কোনও ব্যথা নেই। এক্সরে প্লেটের চিড়টাও দেখিস রাতে রাতে জুড়ে গেছে।
এদেশে বনগাঁর মত বৃষ্টি হয় না। পুরুলিয়ার মতও হয়না। এখানে বনগাঁর মত কোনও শহর নেই যেখানে হঠাৎ বৃষ্টিতে পালিয়ে গেলে মাত্র দু কিলোমিটারেই চলে আসে ভেজা তাজা সবজিক্ষেত। এখানে কাঁঠাল নেই, তাই কাঁঠালপাতায় লুকানো নরনারীর বৃষ্টিভেজা পিঠও নেই। এখানে বর্ষার ইছামতি নেই। ছোড়দিদের বাড়ির গেটের পাশের ফুল ফুটে থাকা হাস্নুহানা গাছ নেই। ছাতা নেই, বর্ষাতি নেই, বৃষ্টির মধ্যে রিকশার সিটে গায়ে গায়ে বসে, ত্রিপলের পর্দাটা টেনে দেওয়া নেই।


শর্টফিল্মটা আমরা কিন্তু করবোই, রীতু। এই বর্ষাতেই। ভিজতে ভিজতে চলে যাব কোথাও। মাসাঞ্জোর বা মেঘাতাবুরু। বাংরিপোশির বুড়িবালামের তীরেও যাওয়া যেতে পারে। দাসের হাড়ও ততদিনে শক্তপোক্ত হয়ে যাবে। তবে একটা মদ খাওয়ার সিন রাখিস কিন্তু। অরণ্যের দিনরাত্রির মত। তারপর আমরা সারারাত ধরে জঙ্গলের রাস্তায় হেঁটে যাব শর্মিলার গাড়ির হেডলাইটের সামনে পড়ে যেতে। টুকাইকে বলিস আমরা যখন বুড়িবালামের পাড়ে বসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবো, তখনই যেন ড্রোনটা ওড়ায়। ক্লোজ আপে ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যেও আমাদের চোখের জল দেখিয়ে ড্রোনটা আস্তে আস্তে উপরের দিকে উড়ে যেতে থাকবে। বৃষ্টি উপর থেকে আমাদের পরে ফুলের মত ঝরবে। আমরা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাবো। আরও ছোট। আর ড্রোনটা আমাদের সব মনখারাপ, কান্না আর অন্ধকার নিয়ে বৃষ্টির ওপারে চলে যাবে। ড্রোন আর ভোকাট্টা ঘুড়ির মত ফিরে না আসলেও, টুকাইয়ের মোবাইলে সব সেভ করে দিয়ে যাবে।
এইভাবে বৃষ্টির কথা ভাবতে ভাবতে এদেশেও বৃষ্টি আসবে, দেখিস মাম্মা। ততদিনে তোর পরীক্ষাও শেষ হয়ে যাবে। তুই একছুট্টে আমার কাছে চলে আসিস। আমি তোকে সজ্জনগড়ের জঙ্গল দেখাতে নিয়ে যাবো। আমিও দেখিনি যে। এদেশের পাহাড় ততদিনে সবুজ হয়ে উঠবে বেশ। পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে বাঁকে আদিবাসী বাচ্চারা সীতাফল বিক্রি করবে। আতা। আমরা ওদের কাছ থেকে গাছের ঠিকানা জেনে নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যাবো। বর্ষার জঙ্গলে। গিয়েই হারিয়ে যাব। তোদের কড়া প্রিন্সিপাল ম্যামও আর আমাদের খুঁজে পাবে না।

মোর্জিনা মতিন কবিতা

তুমি ফিরে এসো তোমার জন্য

এক সকালে ঘুম ভাঙার পর দেখি- প্রিয় সরল, তোমার তখন ভোর, আমার সন্ধ্যারাত, তুমি আমায় ইনবক্সে লিখেছো- ‘আল্লাহর রহমতে এবার হজ্বে যাচ্ছি। তোমাকে জেনে বা না জেনে কষ্ট দিয়েছি হয়তো, মাফ করে দিও। ভুলগুলো ক্ষমা করে দিও। দোয়া চাই যেন সবকিছু ঠিকঠাক মতোন সম্পন্ন করে আসতে পারি।’

আমি ঠিকই ফজরের নামাজ, মেডিটেশন, রুটি বানানো শেষ করেছি প্রতি সকালের মতো, কিন্তু তুমি কি জানো, আমি চোখও মুছেছি সেই সঙ্গে! কোথা থেকে যে এমন কান্না আসে, কোথা থেকে এমন মায়া চলে আসে, ক্ষমারা কোথায় ছিল এতদিন! আমি হাতের কাজ শেষ করে তোমার মেসেজের রিপ্লাই দেই- ‘অনেক দোয়া তোমার জন্য। আমার ও আমাদের সবার জন্য দোয়া করো। আমার ভুলগুলো মাফ করে দিও। অনেক ভালো থেকো সবাই। সবার জন্য দোয়া রইলো।’ 

তুমি থাকো সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপাড়ে। সেখান থেকেই হজ্বে যাচ্ছো সম্ভবত। তুমি তোমার মেঘ-পাহাড়ের দেশে এসে চলে গিয়েও থাকতে পারো। সম্ভবত স্ত্রী, দুই পুত্র, মা-বাবা সবাইকে নিয়ে যাচ্ছো। কত সব সম্ভাব্য অনুমান আসে মনে। আর অবাক লাগে- তুমি এবার আমাকে বলে যাচ্ছো, কোথায় যাচ্ছো! আগে তো কোথাও যাওয়ার আগে বলে যাও নি। কোন কাজ করার আগে বলে কর নি। পত্রিকায় আমাদের লেখালেখির দিনে, হলুদ খামে চিঠি লেখার দিনে, তোমার জীবন আরো সুন্দর করতে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার দিনে, তোমার সংসার হওয়ার দিনে, আমাদের শেষ দেখা হওয়ার দিন যে আসলেই শেষ দিন ছিল- সেই কথাটি সেই দিনে, চাকরিতে ভরাডুবি বা ব্যবসায় সফল হওয়ার দিনে, তুমি বাবা হওয়ার দিনে, কোন দিনে না।

তবে কি ‘লাব্বাইক’ পড়তে গেলে কাউকে ছলনায় ভুলানোটা বড় পীড়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়! কোন যুক্তি ছাড়াই অর্জন করে নিতে হয় কাউকে মিথ্যে স্বপ্ন দেখানোর দায়মুক্তি!

ক্যালেন্ডারে আমার শিশুপুত্রের স্কুল-কোচিংয়ের ঈদকেন্দ্রিক ছুটির দিনগুলোয় আমি দাগ দেই, মডেল টেস্টের তারিখগুলোয় দাগ দেই। আমার তখন মানে পড়ে কোন কবি যেন এক কবিতার শেষ চরণে লিখেছিলেন- ‘ক্ষতি কী, শোকশয্যায় জাগে যদি কোন মোহ!’

তার আগে অন্ত্যমিল রেখে শব্দ ছিল, তাল-লয় ছন্দবদ্ধ ছিল- মনে আছে। কিন্তু ভুলে গেছি আগের চরণগুলো। অনেকেরই হজ্বে গিয়ে আর ফিরে আসা হয় না। তোমার শোকশয্যা হোক আরো একশো বছর পর, তুমি ফিরে এসো তোমার জন্য, তোমার জীবনজুড়ে যারা আছে, তাদের জন্য। শোক হয়ে নয়, শ্লোক হয়ে ফিরে এসো।

নিরাপদ থেকো, প্রিয় সরল।

অনেক শুভকামনা।

মিতুল