কৈশোরের বিশ্বাসই এক বদ্ধবিশ্বাস

আন্জুমান রোজী,(টরন্টো প্রতিনিধি)

মানুষের ভেতর একটি শুদ্ধতম বিশ্বাসের বীজবপন হতে থাকে কৈশোর থেকেই। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই বিশ্বাসের রকমফের হতে থাকে সময়ের আবর্তনে বা জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে কিম্বা পড়াশুনার অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে। তারপরেও বিশ্বাসের বীজ, বিশ্বাসের সেই শেকড় কোথাও না কোথাও একইরকম থেকে যায়।

জীবনজীবিকার জন্য আমরা আমাদের রূপ বদলাই ঠিকই; কিন্তু মনের গূঢ়তম বিশ্বাস কি বদলাতে পারি! পারি না বলেই কখনো সখনো নিজের অজান্তে সেই বিশ্বাসের ছিটেফোঁটা বের হয়ে যায়। আমরা নিজেকে কখনো শতভাগ বদলাতে পারিনা। বদলাতে পারিনা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও!

তাই সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় মানুষ যতই চিৎকার করে বলুক, সে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার মানুষ; তা কিন্তু কখনওই সত্য হয়ে ধরা দেয়না। কারণ, সাম্প্রদায়িক চিন্তার মানুষ কখনো প্রগতিকে স্বাগত জানাতে পারে না। শুরুতেই তারা বাঁধা দিতে শুরু করে। তারপর ধীরেধীরে জীবনের প্রয়োজনে একসময় তা মেনেও নেয়। এই মানুষগুলো নিয়েই যত সমস্যা! এরা না ঘরকা, না ঘটকা  হয়ে থাকে!

যেকোন বিশ্বাসে শাণ দেওয়া উচিত। সেটা যে বিশ্বাসই হোক না কেন! নিজের ওপর যদি আস্থা, বিশ্বাস থাকে, তাহলে ওই বিশ্বাস লালন করেই জীবনের পথ পাড়ি দেয়া উচিত! এতে অন্তত নিজের কাছে নিজেকে প্রতারিত হতে হয় না। আত্মতৃপ্তি বা শান্তির জন্য আর কারো  মুখাপেক্ষীও হতে হয় না! নিজ বিশ্বাসের ভাইরাস… নিজেকে কুরেকুরে খেলেও; শেষাবধি কোনো গ্লানিও থাকে না। অথচ, মানুষ কোনো এক নির্দিষ্ট বিশ্বাসে অনড় থাকতে পারেনা? অবশ্যই তা বাস্তবতার কারণে! এরজন্য দৃঢ় মানসিকতার প্রয়োজন। যা আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে খুঁজে পাওয়া ভার।

লোভী, স্বার্থপর, হীনমানসিকতার মানুষ নিজের আখের গোছাতে পারলেও; গোটা সমাজ বা দেশের কোনো অবস্থার পরিবর্তন  আনতে পারে না। এইশ্রেণীর মানুষগুলোই দোটানা মনোভাব নিয়ে চলে। যখন যেভাবে… যে সুবিধা পায়; তার পুরোটাই নিতে উদগ্রীভ হয়ে থাকে। এরা মূলত সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার মানুষ। এরা যতই উচ্চবাচ্চ করুক; সমাজ, মানুষ কিংবা দেশ নিয়ে যতই কথা বলুক;  দিনশেষে এদের স্বরূপ ঠিকই প্রকাশ পেয়ে যায়। কারণ, তাদের ভেতরের সাম্প্রদায়িক বিশ্বাসের বীজ বা শেকড় তো তারা একেবারে উপড়ে ফেলতে পারেনা। কৈশোরের বিশ্বাস একেবারে বদ্ধমূল হয়ে গেঁথে থাকে কী না! যতই শাণ দিয়ে একে পরিপাটি করে সাজিয়ে গুছিয়ে প্রকাশ করুক না কেন; বদ্ধমূল বিশ্বাসের রহস্য ঠিকই বের হয়ে যায়!

আজকাল মানুষের সঠিক স্বরূপ খুঁজে পাওয়া যায়না। অর্থাৎ মানুষের মৌলিক চরিত্র বোঝা বড়ই মুশকিল। মানুষ বেশ রহস্য নিয়ে চলতেও পছন্দ করে। এটাও একটা ট্রেন্ড এখন। এতে কী হচ্ছে! এতে সমাজের ক্ষয়িষ্ণু ভাবটাই বেশি ফুটে উঠছে। কারণ, মানুষ দিকভ্রান্ত। ছোটরা যেমন বড়দের বোঝেনা; এবং বোঝেনা বলেই অনুসরণ করতেও পারেনা। তেমনই ছোটদেরও আজকাল আর বড়রা বুঝতে পারছেনা। মূলে একটাই সমস্যা; বিশ্বাসের জায়গাটা পোক্ত নয়। যার ফোকাস অন্যরা বুঝতে পারবে; বা বিশ্বাসের সত্য অংশটা গ্রহণ করবে!

এমন দোদুল্যমান অবস্থায় আজ গোটা বিশ্ব টলটলায়মান। শুধু বাংলাদেশ কেন বলি!কারণ বাংলাদেশকে এই ব্যাপারে একটু বেশিই চিহ্নিত করতে হয়! সততার জায়গাটা পরিস্কার না, বিশ্বস্তের কোনো মাপকাঠি নেই। তাই বোঝাও যায়না , বিশ্বাসের ভিত কার কোথায় গেঁথে আছে। কাজেকর্মে অবচেতন মনে অনেকের অনেককিছু প্রকাশ হয়ে যায় বলে আমরা ধরে নিই… কে বা কারা সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার মানুষ! আসলে সবাই কঠিন বাস্তবতার শিকার। এরমধ্যে নিজেকে ঠিক রেখে যারা নিজ বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটিয়ে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি আমার অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা!

কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে সুবিধাবাদী মানুষেরা মৌলবাদী বা সাম্প্রদায়িক… যা তাদের কৈশোরের বদ্ধমূলে জুড়ে দিয়েছে অভিভাবকেরা। কৈশোরের বদ্ধবিশ্বাস থেকে এরা কখনওই উঠে আসতে পারেনি। তাই তারা বিশ্বাসের বরখেলাপ করে প্রতি পদেপদে। কৈশোরের বিশ্বাসই আসলে মানুষকে আগামীর দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়; তা সে যতই নিজেকে শাণ দিয়ে প্রকাশ করুক না কেন! তাই বলতেই হয়, কৈশোরের বিশ্বাসই এক বদ্ধবিশ্বাস।