এক স্বর্ণালী সন্ধ্যায়…

দেলওয়ার এলাহী

( টরন্টো থকে) : আমাদের এই প্রিয় টরন্টো শহরে বাংলাদেশী অভিবাসীদের  তুলনামূলক সংখ্যায় অনেক গুণী মানুষের বসবাস৷ বিশেষ করে গত দুই দশকে কানাডার বিভিন্ন শহরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য বাংলাদেশী গুণী মানুষ এসেছেন; যাদের একটিই লক্ষ্য নির্ভাবনায় জীবনকে যাপন করা। এঁদের অধিকাংশই তাঁদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে এসেছেন বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। আবার কানাডার যে কোন শহরে এই বাংলাদেশী অভিবাসীদের প্রথম পদার্পণ হলেও অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর টরন্টো বা টরন্টোর পার্শ্ববর্তী শহরকেই বেছে নিয়েছেন বসবাসের জন্য। ফলে, আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তারা এইসব গুণী মানুষদের সম্মিলিত গুণের আলোতে আলোকিত হচ্ছি। তাদের সাংস্কৃতিক বিভায় নিজেদের ঐতিহ্যকে স্মরণ করছি, অবলোকন করছি; এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ধারণ করতে পারছি। তাদের দেশপ্রেমের উজ্জীবিত প্রেরণায় আমরা নিজেরা বলিয়ান হচ্ছি। সর্বোপরি, তাদের বিভিন্ন শাখায় সৃজনশীল কাজের ঝর্নাধারায় অবগাহন করে আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনা সতত প্রবহমান রাখতে পারছি। বিদেশ বিভুঁইয়ে এসেও আমরা অভ্যস্থ জীবনের একঘেয়েমিতে স্থবির হয়ে যাইনি। এসবই সম্ভব হয়ে উঠছে আমাদের এই প্রিয় শহরে অসংখ্য গুণী মানুষের সম্মিলিত সৃজনশীল কাজের ঐকতানে৷ সাধারণ মানুষের সম্মান, মানব অধিকার ও নারী পুরুষ, ধর্ম বর্ণ সমতার নিরিখে সারা বিশ্বে নিরাপদ জীবন যাপনের জন্য প্রথমসারীর দেশ কানাডায় আমার জীবনযাপনকে আমি আশীর্বাদ মনে করি। অন্যান্য আরো অনেক কারণের মাঝে সর্বপ্রথম যে কারণটিকে আমি আশীর্বাদ মনে করি; তা হলো এই শহরে আমাদের একটি সাংস্কৃতিক পরিবার আছে। আমার নিজের আপন মায়ের সংসারে যেমন ভাইবোনের মাঝে মান অভিমান, অনুযোগ অভিযোগ আছে, দল উপদল আছে; আমাদের এই পরিবারেও তেমনটি আছে। এতে, কখনো কখনো আমাদের নিজেদের মধ্যে মান অভিমান হলেও এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিজেরা বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেও আমি নিজে এটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিতে চেষ্টা করি। যদিও অনেকক্ষেত্রেই তা বেশ কিছু সময় নিজেদের অভিমান, দুঃখকে পাথরচাপা দিয়ে রাখতে হয়। এটা যেমন অস্বাভাবিক কিছু নয়, নয় অস্বাস্থ্যকরও। আমাদের এই সাংস্কৃতিক পরিবার দিনের পর দিন নানান চর্চায় নিজেদেরকে যেমন নিয়োজিত রেখেছেন; তেমনি, নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করছেন নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করতে। শুদ্ধভাবে চর্চাকরে সংস্কৃতির রূপায়নকে পরিপূর্ণ করতে। এতে, ক্রমেই আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।
আমি গর্ব করে বলতে চাই ওস্তাদ মুনশি রইসুদ্দিনের দুই গুণী সন্তান এই শহরে বসবাস করেন। আমি আরো গর্ব করে বলতে চাই ওস্তাদ আলীমুজ্জামান ও আশিকুজ্জামান টুলু তাঁদের বাবার রক্তপ্রবাহ ধারণ করেই ক্ষান্ত নন বরং এই শহরে আমাদের ঐতিহ্যগত সংগীতকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাঁদের প্রচেষ্টা সর্বজনবিদিত।
এতো কথা ভূমিকা হিসেবে বলার কারণ হলো গত ২৬ আগস্ট আমার অভিজ্ঞতায় অর্জন করা স্বর্ণালী সন্ধ্যা উপভোগ করেছি বলে। সর্ব প্রথম এই আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমার আন্তরিক অভিনন্দন জানাই শুভেচ্ছা জানাই। বাহুল্য বিবর্জিত একটি অনুষ্ঠান ছিল স্বর্ণালী সন্ধ্যা। ঘোষণা মোতাবেক ঠিক সাতটায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়া থেকে শেষ পর্যন্ত এক মিনিটের জন্যও অনুষ্ঠানে কোথাও ছেদ পড়েনি, ঝুলে যায়নি। বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত শিল্পীদের সঙ্গে আমাদের নবপ্রজন্মের শিল্পীদের পরিবেশনার সুযোগ দেওয়ার বিবেচনাটিকেও আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। এজন্য তনুকার সঙ্গে একমত পোষণ করে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই।
নাটক অংশে প্রখ্যাত সুবর্ণা মুস্তফা ও চিত্রলেখা গুহের সঙ্গে আমাদের বহুমুখী প্রতিভাধর আহমেদ হোসেনের সাবলীল অংশগ্রহণের বিবেচনাটিও আমাদেরকে গৌরবান্বিত করেছে৷
একটি কথা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবেনা। যে কোন একটি অনুষ্ঠান করতে হলে আয়োজকদের যে শ্রম ঘাম মেধা অর্থ এবং ক্ষেত্রবিশেষে সম্পর্ক ব্যয় হয় সে শুধু তারাই জানেন, যারা অনুষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন বা আয়োজনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এই বিদেশ বিভুঁইয়ে যে বাঁধাটি প্রধান হয়ে দেখা দেয় তা হলো অর্থ৷ তার উপর বাংলাদেশ বা অন্যদেশ থেকে শিল্পী বা প্রধান অনুষ্ঠানের আকর্ষণ কাউকে আনতে গেলে তো আরো বেশী অর্থের বাঁধা। এই অর্থ দিয়ে যদি কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি অনুষ্ঠানকে সাফল্যমণ্ডিত করেন; তবে, আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে মঞ্চে ডেকে সম্মান দেখানোয় দোষের কিছু নয়। এতে আমাদের দর্শকশ্রোতাদের সময় থেকে কিছুটা সময় হয়তো ব্যয় হচ্ছে৷ কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, এদের কারণেই বড় বড় অনুষ্ঠান সফলতার মুখ দেখে। এইজন্য আয়োজক ও স্পন্সরের মঞ্চে উঠে পারস্পারিক সম্মান দেখানোকে আমি তীর্যক চোখে দেখিনা। মূল সময়ের সঙ্গে এজন্য আরো আধা ঘন্টা সময় দিতে আমার ধৈর্য্যের বিচ্যুতি ঘটবে না। যে স্পন্সর ভাইবোনরা শত শত, এমনকি হাজার হাজার ডলার ব্যয় করছেন আয়োজকদের আয়োজনে সহযোগিতা করে, তাদেরকে মঞ্চে ডেকে পরিচয় করিয়ে একটি সম্মাননা দেখালে আমার কোন অসুবিধা নেই৷ বরং এইসব উদার মানুষদের পরিচয় জানাও একটি অভিজ্ঞতা।এই সন্ধ্যায় তা এটা ছিল না। এটা স্পন্সরদের মহানুভবতা ও আয়োজকদের দক্ষ পরিচালনা। আমি কারো পরিবেশনা নিয়ে কোন মন্তব্য করবোনা। স্ফুলিঙ্গ হয়ে কালরাতে দেখা দেওয়া আমার শহরের প্রতিভার আগুন দেখার অনুভূতিটুকুই শুধু দু’টি কথায় বলবো। সাবিনা বারী লাকি ও অজন্তা চৌধুরীর সাবলীল উপস্থাপনায় কিশোর-কিশোরী শিল্পী ময়ূখ, অপূর্ব ও রদিয়া তিনজনই খুব স্মার্ট ও সাবলীল ছিলো মঞ্চে। তিনজনের গানই দর্শকশ্রোতা মুগ্ধ হয়ে শুনেছেন। 
ময়ূখের কণ্ঠে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের লেখা ও সুর করা ‘আমার সারাদেহ খেয়ো গো মাটি… ‘ গানটি মুগ্ধ হয়ে শুনেছি। তারপর এই ময়ূখের কণ্ঠে শুনলাম একটি ইংরেজি গান৷ এক কথায় ময়ূখের পরিবেশনা ছিল অসাধারণ।
রদিয়া এশের কণ্ঠে গান শোনে ও তার চৌকস পরিবেশনা দেখে আমি অবাক হয়েছি। মনিরুজ্জামান মনিরের লেখা ও আলাউদ্দিন আলীর সুরে ‘শেষ করোনা শুরুতে খেলা…’ মূল শিল্পী রুনা লায়লার কণ্ঠে গাওয়া আমার এই প্রিয় গানটি রদিয়ার কণ্ঠে শোনে ও তার অসাধারণ পরিবেশনা দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছি। মূলত এই গানটির মর্মার্থ রদিয়া তার কণ্ঠে ও পরিবেশনায় ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে।
ময়ূখ ও রদিয়ার গান শোনে কাল রাতে আমার এক প্রিয় কবি ময়ূখ চৌধুরীর একটি বিখ্যাত কবিতার কথা বারংবার মনে পড়েছে:

‘কিশোরী লো কিশোরী
আর ক’বছর পর এ পাড়ায় লাগাবি আগুন…’

ছবি:বিদ্যুৎ সরকার