নব গ্রহ’ র মধ্যপ্রদেশ- পর্ব এক

সুব্রত গোস্বামী

সে অনেক বছর আগের কথা।তখনও মধ্যপ্রদেশ ভাঙেনি।আমার জীবনের প্রথম বড় করে বেড়াতে যাওয়া।প্রথমবার রাজ্যের বাইরে পা-রাখা।ওহ্‌ নানা, তার আগে অবিশ্যি একবার নাটক করতে শিশু শিল্পী হিসেবে জামশেদপুর গিয়েছিলাম। সেটাও যদিও বিহার ভাঙার আগে।আমাদের মধ্যপ্রদেশ ট্যুরটা ১৯৯৭তে। ওইযে’ বার ডায়ানা মারা গেল সে’বার।বছরটা আমাদের এ’ভাবেই মনে আছে।পুজোর মাস দুয়েক আগে ডায়ানা মারা গেল আর আমাদের একাদশীর দিন বেরুনো।সে মৃত্যুর জন্য যে আমাদের বেড়ানোয় কোনও হেরফের হ’বে তেমনটা না হলেও পিণ্টুর মনে একটা চাপা দুঃখ ছিলো।কাঠ বাঙাল পিণ্টুর ট্যুরের মাঝেও বেশ কয়েকবার স্বখেদোক্তি, “ইশ্‌ রে, ডায়নাটা বাইচ্চ্যা থাকলে এই ডাচেস ফল্‌সের জলে চান কইরা আরেকটু বেশিই মজা পাইতাম!”

সাতানব্বইয়ের পুজোর একাদশী।আমাদের বেরুনো।শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস।আমার, আপনার, এ’পৃথিবীর সকলের দেখা ধরা ধামের সব সেবত্তর রেলগাড়িটির নাম শক্তিপুঞ্জ।রাজা আর বাবু মিলে ভ্রমণ-বই রিসার্চ-টিসার্চ করে যাতায়াত মিলে এগারো দিনের একটা ট্যুর প্ল্যান করেছিলো।ভ্রমণ বইতে জব্বলপুর যাবার জন্য সাজেস্টেড ট্রেনটার নাম শক্তিপুঞ্জই।একটা ট্রেন যেটা হাওড়া থেকে ছেড়ে জব্বলপুর যেতে সাঁইত্রিশ ঘণ্টা সময় নেবে, তিনবার ইঞ্জিন খুলে এ’মুড়ো থেকে ও’মুড়োতে লাগিয়ে আবার কিছুটা উল্টোদিকে ছুটবে, এইসব বিদিকিচ্ছিরি ব্যাপারে আমাদের ন’জনের কেউই তখনও অভ্যস্ত ছিলামনা।কাজেই শক্তিপুঞ্জ আজও আমাদের ন’জনের কাছে “দুনিয়ার সব থেকে ফালতু ট্রেন”।

ও, বলতেই ভুলে গেছি।আমরা ন’জন।রাজা আর বাবু এমন ভাবে ডেটটা সাজালো যাতে ঠিক কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর রাতে আমরা পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় মার্বেল-রক দেখতে পারি।একাদশীর দুপুর।পাড়ার ঠাকুর তখনও প্যাণ্ডেলে বসে।বিসর্জন হয়নি।ন’পিস বছর পঁচিশের ছোকরা কাঁধে ব্যাগট্যাগ বাগিয়ে ড্যাং ড্যাং করতে করতে বেরিয়ে যাচ্ছে।তখন আমাদের পাড়ায় চাইলেই ট্যাক্সি পাওয়া যেতনা। (যদিও এখনও পাওয়া যায়না।) সেই পনের নম্বর বাসস্ট্যাণ্ডে হেঁটে যেতে হ’ত।ওহ্‌, ন’জন না, দশজন ছিলাম।রাজু আমাদের ছাড়তে হাওড়া স্টেশানে গিয়েছিল।মনে আছে ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে, জানলার কাছে এসে আমার হাতে ওর সানগ্লাসটা দিয়ে বললো, “পিকলু, এটা পরে কেতা মেরে ফটো তুলিস।তোকে মানাবে”।

রাজা-সমীর-আমি, সজল-কালু-পিণ্টু, বাবু-সঞ্জীৎ-পূজারী।এই হ’ল আমাদের ন’জনের টিম।জব্বলপুর পৌঁছে, হোটেলে এই অর্ডারে বণ্টিত রূমেই আমরা প্রথম রাতে ছিলাম।পনের নম্বর বাসস্ট্যাণ্ড থেকে একেকটা ট্যাক্সিতে পাঁচজন করে বসে সোজা হাওড়া।পিণ্টু তুতে রঙের বারমুডা, সাদা স্যাণ্ডো আর পায়ে হাওয়াই।“এইগুলি ফরেনারগো ছাড়া কাউরে মানাইবো না”।বাংলাদেশ ফরেন।সেই হিসেবে পিণ্টু ফরেনার বটে।বাকি সবাই সাধারণ   পোষাকে।মাঝরাতে ডালটনগঞ্জ, ম্যাকলাক্সস্কিগঞ্জ, হ্যাড্ডা ব্যাড্ডা সব পেরিয়ে ভোরে রেণুকূট।নামটা বেশ।ভূগোল পটু পিণ্টু বললো, “এইটা হইল উত্তর প্রদেশের দক্ষিণদিক।মাথায় গাইথ্যানে।পরে পড়া ধরুম”।ব্রিটানিয়ার বেকার্স-চয়েজ নামের একটা বিস্কুট পাওয়া যেত তখন।মনে আছে রেণুকূট স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ক্লোজ-আপ মাউথওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে বেকার্স-চয়েজ আর গরম গরম জিলিপি সাঁটিয়েছিলাম।ওই রেণুকূটেই সেদিন আমার ক্লোজ-আপ মাউথওয়াশটা হঠাৎ করে’ই হারিয়ে গেল।আর হঠাৎ করেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলো।সবকটাকে কাঁচা খিস্তি করেছিলাম সেদিন।জিলিপি খাওয়া মুখ থেকে বেরোচ্ছিলো বলে হয়তো মিষ্টি লাগছিল।একটা হারামজাদাও গায়ে মাখেনি।

কাটনি ফাটনি কী সব স্টেশন পেরিয়ে রাতে ট্রেন জব্বলপুর পৌঁছলো।বাবু, রাজা বলেছিলো যদি অমরকণ্টক যাওয়া হয় তাহলে দিন বাড়তে পারে।তাই ফেরার টিকিট রিজার্ভ করা ছিলোনা।সে’সময় অবশ্য ফেরার টিকিট রিজার্ভেশনের অভ্যেস আমাদের ক্লাসে খুব একটা ছিলনা।এই ব্যাপারে“যা আছে কপালে” টাইপের একটা মনোভাব ছিলো তখন। জব্বলপুর স্টেশান থেকে অটো ধরে সোজা হোটেল।বাবু আমাদের বন্ধু হলেও হাবে ভাবে কাকা-জ্যাঠাটাইপ। “অটোওলা হোটেলের সামনে নামিয়ে দিলেও কেউ হোটেলে ঢুকবিনা।মালগুলো কমিশন খেয়ে চলে যাবে”।কথামত কাজ।চারখানা অটো মালপত্তর সমেত আমাদের নামিয়ে দিয়ে ও ঠায় দাঁড়িয়ে।ওরাও নড়েনা, আমরাও নড়িনা।ধৈর্য্যের পরীক্ষায় শেষমেশ আমরাই উত্তীর্ণ হলাম।চালকগণ অবশেষে গন।কী একটা সিনেমাহলের পাশে ছিলো হোটেলটা। নামটা মনে নেই।

“থাকার হোটেলে খামুনা।পুরা দা’মাইরা ছাইর‍্যা দিবো কইলাম” পিণ্টুর  কথামত রাতের খাবার খেতে বাইরে বেরোলাম।প্রায় সবকটাই বারকাম রেস্টুরেণ্ট।বাকিরা জানে পিকলু নেভা নেভা আলোর বার-কাম-রেস্টুরেণ্টে ঢুকবেনা।তখন আমার এ’রকম একটা সংস্কার ছিলো মনে পড়লে এখন নিজেরই কেমন যেন লজ্জা লাগে।যাইহোক আমার পছন্দকে সম্মান জানিয়ে আমরা সেই রাতটা পাও ভাজি খেয়েই কাটিয়ে দিলাম।সঙ্গে বাকিদের বিয়ার আর আমার কোল্ডড্রিংক। ( চলবে )

ছবি: লেখক