সার্টিফাইয়েড বেকার

বচ্চন গিরি, কলকাতা

জীবনের শুরু থেকে শেষ প্রতিটা মানুষকেই যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়| উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি পেরোনোর পর মনে হতো ‘এবার বাঁচলাম, আর পড়তে হবেনা খুব একটা| এবার কলেজে উঠে গিটার, লেখালেখি আর নতুন নতুন মেয়েদের সঙ্গে বেশ কাটবে জীবনটা|’ প্রথম প্রথম কলেজের ক্লাস বেশ মজা লাগতো| এদিক ওদিক তাকাতাম কোনও মেয়ে দেখছে নাকি সেই ভেবে| দু’একজন যদি মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতো তখনই শালা নিজেকে সলমন খান ভাবতাম মাইরি বলছি| ঘটনার সূত্রপাত কলেজে চার পাঁচ মাস ক্লাস হবার পর থেকে, তখন অবশ্য দু একবার লাইন মারার ট্রাই নিয়ে নিয়েছি কিন্তু বিধি বাম| পটেনি ভাই| সলমন খান চুপসে কাঞ্চন মল্লিক হয়ে গেছে ততোদিনে| ভাবলাম বৃথা চেষ্টা, তার চেয়ে পড়াশোনাটা করবো| পাড়ার অভিজিৎ দাদা খুব একটা ভালো দেখতে নয় তবু ডাব্লিউ বি সি এস লাগানোর পরে বউটা যা পেয়েছে না| উফ্….
রাতদিন পড়া আর পড়া| মাঝে মাঝে ফেসবুক ঘেঁটে মেয়েদের প্রোফাইল দেখা| কিন্তু নিট ফল জিরো| মেসের দাদাদের দেখতাম কলেজ কমপ্লিট করেও মেসেই পড়ে রয়েছে| মাসে মাসে বাড়ি যাচ্ছে বাবার কাছে টাকা আনছে আর দু’চারটে টিউশনি করেই চালিয়ে নিচ্ছে| সকালে কলেজের পাশে চায়ের দোকানে বসে গরম গরম চা, লেড়ুস বিস্কুট আর পায়ের উপর পা তুলে রাজার বেটার মতো একটা বিড়ি অথবা পয়সা বেশি থাকলে কখনো কখনো সিগারেটে সুখটান| এভাবেই দিন যায়, সময় ফুরিয়ে আসে, বাড়তে থাকে বয়স ক্রমশ| সারাবছর ধরে পড়াশোনার নাম নেই, পরীক্ষা যতো এগিয়ে আসতে থাকে আমরা এক একজন হয়ে উঠি বিদ্যাসাগর, আইনস্টাইন, অমর্ত্য সেন| রাত জেগে পড়াশোনা আর বিড়ির পর বিড়িতে টান| সিনিয়র দাদারা বলতো প্রায়ই “যতোই কর চাকুরি লাগাতে না পারলে আমাদের মতোই পরিস্থিতি হবে তোদেরও|” তখন ভাবতাম ‘শ্লা কি বলে রে? মুখস্ত করবো পরীক্ষার খাতায় গিয়ে লিখে দেবো, চাপ কি বস?’ পরীক্ষা হয়, রেজাল্ট বেরোয় ফাস্ট ক্লাস নম্বর পেয়ে বেশ হিরো হিরো একটা ইমেজ| তবু শালা কেউ তাকায় না| সলমন খান চুপসে আবার কাঞ্চন মল্লিক হয়ে যায়| ঠিক এভাবেই তিনটে বছর পেরোনোর পর শুরু হয় আসল যুদ্ধ| বাড়ির লোক বলে দেয় ” তুমি যথেস্ট বড় হয়েছো|এবার কি করবে ভাবছো?” সাময়িক থমকে গিয়ে একবার ভাবি বিশাল বড় অফিসার হবো আর একবার ভাবি নীরব মোদী(এখন টাকা মেরে হাওয়া) অথবা অনিল আম্বানি হবো|

ততোদিনে সিনিয়র দাদারা কেউ কেউ মেস ছেড়ে বাড়িতে ফিরেছে, কেউ কেউ তখনও চা, নেড়ুস বিস্কুট আর বিড়ি ফুঁকেই মেসের অসহনীয় জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত| শুরু করলাম পড়াশুনো| কলেজ স্ট্রীট থেকে বেশ মোটা মোটা বই কিনে নিয়ে এলাম চাকুরির পরীক্ষার| বই খুলতেই নিচের সবকিছু মাথার উপরে উঠে বসে গেছে| পাশের বন্ধু কে বললাম ‘এগুলো পড়া নাকি অন্য কিছু বে?’ সিনিয়র দাদা হঠাৎ ‘আম চুষনির’ মতো মুখ করে বললো “কি বলেছিলাম তোদের?” ধূর শ্লা ভাল্লাগেনা এসব| স্কুল লাইফেই ভালো ছিলামরে| একটা বিড়ি ধরিয়ে মেসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে টান মারতে থাকি| এভাবেই দিন কাটতে থাকে, মেসের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠে| জামাকাপড় কাচা, রান্না করা, বাসনপত্র ধোওয়া -জীবনের বারোয়ানাই বৃথা| কমবেশি এটাই সমস্ত বেকারদের প্রতিদিনের চেনা জীবনযাত্রার ছবি|

তারপর ‘বেকার’ শব্দের ট্যাগলাইন ঝুলে যায় নামের পাশে| এতোদিনে বহু কষ্টে একটা লাইনও হয়ে যায় কারো কারো| কিন্তু বড় আপদ বলুন বা বিপদ আবার সেটাই| সঠিক সময়ে দেখা করতে না পারলে খিস্তি খেতে হয় উদোম| চুল গুলো টেনে টেনে ছিঁড়ে দেয়, যেন উনার বাপের পালিত কুত্তা তাই যখন ইচ্ছে কিলিয়ে দেবে, চুল টেনে মারবে, খিস্তি দেবে -চাকুরির জন্য পড়ছি বললে বলবে “কি পড়ো সারাদিন ফোনটা ধরতে পারোনা? এখনো তো একটা ঝাঁট দেওয়ার কাজ জোগাড় করতে পারলেনা, যত্তোসব|” তারপর একদিন শুনবেন সরকারি চাকুরি করা টাঁক মাথা আধবুড়োকে অথবা ফোকলা দাঁত হুন্ডাই সিস্টেমের একটা টাকা বালা ব্যবসায়ীকে বিয়ে করে ফুলসজ্জা করছে| জানানোর প্রয়োজনও মনে করেনি, আর যখন জানতে পারবেন তখন হাতে রাম বা হুইস্কির বোতল নিয়ে রাজ চক্রবর্তীর ডিরেকশনে “প্রিয়ারে প্রিয়ারে প্রিয়ারে কাঁদে মন কাঁদে এই হিয়ারে….” চলবে|

আসলে কি জানেন দাদা প্রেম বলুন বা ভালোবাসা দুই ধরনের হয়| উপরে যেটা বললাম সেটা একরকম আর একরকম হচ্ছে, মেয়ে বেস্টফ্রেন্ড, খুব শান্তশিষ্ট মেয়ে – ছেলে বেকার চাকুরির জন্য পড়াশোনা করছে, বারবার ব্যর্থ হচ্ছে তবু সেই মেয়েটি তথা বেস্টফ্রেন্ড উৎসাহ দেবে “চিন্তা করোনা ঠিক হয়ে যাবে, চেষ্টা করো|” এই টাইপের মেয়েরা বেকার ছেলে বেস্টফ্রেন্ড অথবা প্রেমিককে সাকার করে তুলতে জীবনপাত করে দিতে পিছিয়ে যায়না| কিন্তু আল্টিমেটলি আরে ভাই হবেটা কি? বাড়িতে পাড়াতুতো, মামাতুতো, খুড়তুতো ইত্যাদি টাইপের কিছু ঝাঁট জ্বালানোর মতো মাল প্রায়ই আসবে বাড়ির লোকের সামনে বলবে “তোমাদের ছেলেটার এখনো কিছু হয়নি হিল্লে? আরে আমার মেয়ের জায়ের ভাইয়ের মেয়ে অমুক জায়গায় জয়েন্ট করলো চাকুরিতে|” সকলের এতো খারাপ খারাপ কথা, এতো অভিযোগ শোনার পরও শুধু একজন সবকিছু সামাল দিয়ে বলবে ‘চেষ্টা করছে ঠিক পেয়ে যাবে, আমার ভরসা আছে|’ সে কে জানেন? আমাদের সকলেরই মা| পৃথিবীতে এই একজনই মানুষ আছে যে নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে কোনও কথাই শুনতে চায়না| পরিস্থিতি হয়তো বাধ্য করে অনেক সময় কিন্তু সকলের আড়ালে তার চোখের কোনে জল’টা গড়িয়ে পড়ে শুধুমাত্র তার সন্তানের জন্য| তবু বিরাম নেই, এরপর আসবে কিছু আত্মীয় নামক পিন্ডি চটকানো পাবলিক যারা কোনও অনুষ্ঠান বাড়িতে দেখা হলেই ফাঁকায় বা একলা ডেকে নয়, ইচ্ছে করে ঘর ভর্তি লোকজনের সামনে বলবে “কি করছিস এখন?” যদি বলেন চাকুরির জন্য পড়ছি, কি বলবে জানেন “এখনো পড়ছিস? সেই আমাদের পাশের বাড়ির মন্টুদার ছেলের শালা প্রাইমারিতে চাকুরি পেয়ে গেছে| তোর থেকে কত ছোট| তোর দ্বারা কিচ্ছু হবেনা|” -হ্যাঁ সত্যি বলছি এই সমস্ত আত্মীয়দের কথায় কান দেবেন না, এই সমস্ত আত্মীরা হলো মুরগির জাত যে পাত্রে খায় সেই পাত্রেই হাগু করে, এরা হলো বন্ধু নামক শত্রু, ক্যান্সারের চেয়েও ভয়ঙ্কর মাল এগুলো| যতোটা সম্ভব এদের এড়িয়ে চলুন ভালো থাকবেন নিজে|

যাইহোক যেটা বলছিলাম ‘বেকার’ শব্দটা কোনও পাপ নয়| বেকার বলে ফেলে দেওয়ার পাত্রও নই কেউই, শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয়, সহ্য করতে হয় অনেক কিছু| বয়স বাড়ুক তাতে কি যায় আসে? নিজের মনের কাছে পরিস্কার থাকলে কাউকে কোনও কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন সত্যিই নেই| যে যা বলছে বলুক, এক কানে ঢুকিয়ে অন্য কানে বের করে দিন অথবা জোরে গান চালিয়ে হেডফোন গুঁজে নিন| মুখের উপরে বলুন ‘বেকার ঠিকই কিন্তু শয়তান নই আপনাদের মতো|’ আসলে কি জানেন তো লোকে বলে “ভাগ্য খারাপ”….কিন্তু না, রাজনৈতিক নেতাদের ষড়যন্ত্রের বলি হয়ে মরতে হয় দিনের পর দিন| লাখ লাখ চাকুরি হচ্ছে বলে ফলাও করে রাজনৈতিক মালগুলো আদপে হিসেব করলে দেখা যাবে কিছুই হয়নি কাজের কাজ| আমরাই শুধু জীবনভর সার্টিফাইড বেকারত্বের শীলমোহর পাছায় সেঁটে ঘুরতে থাকি| ‘বেকার’ বলে অবহেলা করবেন না কোনও মানুষকেই, একদিন হয়তো দেখবেন এমন পরিস্থিতিতে পড়লেন তখন আপনার শালির ছোট ননদের দেওরের শালির বড় চাকুরি করা ছেলে নয়, বরং কোনও বেকার’ই আপনার রক্তাক্ত দেহ বা ঝিমিয়ে পড়া আপনার স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াচ্ছে|

ছবি: মানজারে হাসিন মুরাদ