সত্যজিতের লেখার খাতা

satyajit-ray hand write

সত্যজিতের এই খসড়া আঁকিবুঁকি

সত্যজিৎ রায় শ্যুটিংয়ে যেতেন লাল রঙের হার্ড কভার বাইন্ডিংয়ের খাতা নিয়ে। শ্যুটিং চলার সময় বহু জরুরী নোট, কাটাকুটি সেসব খাতায় লেখা থাকতো। কিন্তু বাড়িতে যখন কাজ করতেন তখন অপেক্ষাকৃত নরম মলাটের খাতা ব্যবহার করতেন। নানা রঙ আর বিচিত্র সাইজের খাতা ছিলো তার। কলমের কালি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ভীষণ শৌখিন ছিলেন সত্যজিৎ রায়।
পুরনো  পত্রিকার পাতা উল্টাতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়লো এই অসাধারণ সৃষ্টার লেখালেখির নানা খুটিনাটি গল্প। পাঠকদের জন্য তুলে দিলাম সেইসব মজার কাহিনির কিছু অংশ।
সত্যজিৎ রায় ১৯৬২ সালে প্রথম ছোট গল্প লিখতে শুরু করেন। গল্প লেখার জন্য তিনি নানা সাইজের খাতা ব্যবহার করতেন। তাঁর ছেলে সন্দীপ রায়ের জবানীতে জানা যায়, লেখার সময় বিভিন্ন রঙের কালি ব্যবহার করতেন তার বাবা। প্রথম গল্প ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’। গল্পটি লেখা হয়েছিলো কালো কালিতে। কিন্তু তার পরেই গোলাপি কালি ব্যবহার করে লিখলেন দ্বিতীয় গল্প ‘কিটিকিকম্ভূত’। অবশ্য এই গল্পটি পরে তিনি আর শেষ করেন নি। খাতার আড়াই পৃষ্ঠা লেখার পর গল্পটি অসমাপ্ত অবস্থায় থেকে যায়। সন্দীপ রায় বলছেন, এই অসমাপ্ত গল্পের পর আবারও বদলে যায় কালির ব্যবহার। এবার  ‘সেপ্টোপাসের খিদে’ গল্পটি তিনি লিখলেন উজ্জ্বল নীল রঙের কালি ব্যবহার করে। ইংরেজিতে এই রঙটাকে বলা হয় ‘সেরুলিয়ান ব্লু’। এই একই খাতায় সত্যজিৎ রায়ের বেশ কয়েকটি ইলাস্ট্রেশনের খসড়া দেখা যায়।
সত্যজিৎ রায়ের অভ্যাস ছিলো খাতার মার্জিনের পাশে আঁকিবুকি করা। কখনো সেইসব আঁকিবুকি হয়ে উঠেরছ মানুষের মুখ আবার কখনো বিচিত্র নকশা। সন্দীপ

paint

ফেলুদার কভার ড্রইং       চারুলতা সিনেমার পোস্টার

রায় বলছেন, এই খাতাগুলো হয়ে আছে তার বিচিত্র মননের আধার। কোনো খাতায় ছোটগল্প লেখা, কোনোটায় আবার সঙ্গীতের স্বরলিপি। আবার দেখা যাচ্ছে সিনেমার ওপর ইংরেজিতে লেখা প্রবন্ধ, নিজের ছোট গল্পের অনুবাদ। তবে পরের দিকে তার কলমের কালির বৈচিত্রময় ব্যবহার কমে এসেছিলো।
অনেকগুলো সম্পূর্ণ উপন্যাসের খসড়াও এসব খাতার মধ্যে লেখা হয়েছে। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ফটিক চাঁদ’ তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন ১৯৭৫ সালে। খাতায় দেয়া তারিখ অনুযায়ী মাত্র পাঁচ দিনে লেখাটি তিনি শেষ করেন। তাঁর খসড়া খাতায় গোয়েন্দা ফেলুদার উপন্যাস ‘ বাক্স রহস্য’ পুরোটা লেখা ছিলো। মাত্র দশ দিনে পুরো উপন্যাসটি তিনি লিখে শেষ করেন।
সত্যজিৎ রায় নিজের খসড়া লেখার জন্য বিশেষ ধরণের খাতা কিনতেন কলকাতার অক্সফোর্ড বইয়ের দোকান থেকে। এই খাতাগুলোর মলাটে সোনালী অক্ষরে লেখা থাকতো ‘নোটস’। দেশের বাইরে গেলে খাতা কেনার জন্য নির্দিস্ট ছিলো কয়েকটি দোকান। লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটের পেপারচেজ, ডব্লিউ. এইচ স্মিথ আর উইনসোর অ্যান্ড নিউটন ছিলো তার প্রিয় জায়গা। এসব দোকান থেকে খাতার পাশাপাশি তিনি কিনতেন তার লেখার কলম-মঁ-ব্লা পেন।আাঁকার জন্য কিনতেন রেক্সেল কলম।
সত্যজিৎ রায়ের এই খসড়া খাতাগুলোর মধ্যে অনেক উপন্যাস আর গল্পের একাধিক সূচনা দেখা যায়। পরে হয়তো আসল উপন্যাসে লেখাটা তিনি বদলে দিয়েছিলেন।