সাবান উপাখ্যান…

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

সাবানের সঙ্গে আমার দারুণ বন্ধুত্ব। ছোট বেলা থেকেই দেখেছি মা সুগন্ধি সাবান ব্যবহার করেন খুব যত্ন করে, ভালবেসে।সেই যত্নটাও আমার পছন্দ ছিল।সুন্দর সোপকেইসে সুন্দর সাবান, আর তা দিয়ে গোসল করে পরী মা জননী আমার কি যেন হয়ে যেতেন! মাজা ছাপানো চুল কানের পাশে গোল গোল চুলের আলগোছ ঝুমকা, মা পাটভাঙ্গা অথবা মাড় দিয়ে টান টান করে শুকানো সুতির শাড়ি পরে গোসলখানা থেকে বের হয়ে যখন চুলে জড়ানো গামছা দড়ির মত করে পেচিয়ে পিছনের দিকে ঝুঁকে চুল ঝাড়তেন তখন আমার মনে হত রংধনু অর্ধবৃত্তাকার অবস্থা থেকে ক্রমশই বৃত্তাকার হয়ে এক‌টি পারিজাত এ রূপ নিচ্ছে আর সুবাস ছড়াচ্ছে! সেই সুবাস আসলে সাবানের। তখন তো আর শ্যাম্পু সেভাবে মধ্যবিত্ত নারীদের রোজকার ব্যাবহৃত প্রসাধনী ছিলনা। এর পর মা মাখতেন স্নো বা ভ্যানিশিং ক্রীম। তার গন্ধও সাবানের গন্ধে মিশে নতুন রসায়ন তৈরী হত! আহা! গন্ধের কি শক্তি! ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলাম মায়ের ব্যবহার্য অনেক কিছুই দখল করতে লাগলাম। সাবানের ব্র্যান্ড বদলে যেতে লাগলো। আজ এই সাবান, কাল সেই সাবান আজ এই ক্রীম, কাল এই স্নো ! মা কিন্তু একই নিয়মে একই সময়ে একই ধরনে রয়ে গেছেন।সেটা তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিশে গেছে।সেটাই হয়তো নিয়ম।আমি বাপু নিয়ম দেখতে পছন্দ করি পালন করতে নয়। খালাম্মাদের সাবান গোসল বা রূপচর্চা মোটামুটি রূপকথার চুপকথা ছিল।সে এক বিশাল উপাখ্যান ছিল বটে।তিন খালা এক সঙ্গে কাপড়, সাবান, গামছা, খৈল ভেজানো বাটি বা কাঁচা হলুদ বাটা নিয়ে কাঠের তক্তা দেয়া পুকুর ঘাটে যেতেন। হলুদ খৈল কখন মাখতেন জানিনা, যখন সাবান মাখা শুরু করতেন তখন দারুণ এক আবহ তৈরী হতো।মায়ের মত খালাম্মারাও সুন্দর রূপবতী ছিলেন। তাদেরও ইয়া লম্বা লম্বা চুল ছিলো। গোসলের পর পুকুরঘাট  থেকে উঠে ভেতর বাড়ি ঢুকে তারাও চুলে জড়ানো গামছা খুলে  পেচিয়ে চুল ঝাড়তেন।কি অপূর্ব দৃশ্য ছিল। এই কিছুদিন আগে একটা পারফিউম কিনলাম।”ইভ সাঁ লোর” এর “পেরী “।পারফিউম টা মাখতেই খালাম্মাদের কথা মনে হয়।সবসময় তো তাদের পাইনা, না পেলেই আমার কান্না পায়! কি মুশকিল! হঠাৎ মনে পড়লো এই পেরীর সুবাস আসলে আমার পরী পরী খালাদের সাবানের সুবাস! সেই সুবাস নাকে গিয়ে মগজে ঘুরেফিরে আমার সেই গোঁসাইবাড়ির স্কুল কোয়ার্টার এর পুকুর পাড়ে নিয়ে যায়।এই পেরী আমাকে ভালই জ্বালালো, তাই ইচ্ছে হলেই আমি আর একটা পেরী কিনিনা, এতো আবেগপ্রবণ হয়ে লাভ? আমার পয়লা সন্তান জন্ম নিলে কে যেন একটা বেবী লোশন কিট উপহার দিলো।অনেক উপহারের সঙ্গে এই উপহার আমার খুব পছন্দ হলো। কি আশ্চর্য, এখনো এই সাবানের গন্ধ নিলে মনে হয় মাশুক ফারিয়া আমার বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে! গন্ধের কি ভয়াবহ শক্তি। ইদানীং অনেক দিন হয় সাবান মাখিনা।দরকার পড়েনা। কিন্তু বাথরুমে বা আলমারিতে অনেক রকম সাবান জমানো থাকে। আতর লোবানের ভয়াবহ গন্ধে পরিবেশ যখন গুমোট হয়ে পাথর হয়ে গেছে তখন হঠাৎ শুনি মেয়ে জামাই আমার মেয়েকে বলছেন বাইরে থেকে মহিলা এসেছে তোমার দাদীমা কে গোসল করাতে, তোমার দাদীমার গোসলে তুমি হাত লাগাও।আমি ভাবলাম তাইতো! আমরা কি করতে আছি! পর্দার ভেতরে গেলাম। আতর লোবান আমার প্রাণপ্রিয় শাশুড়ি মা কে অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল।গোসল করানোর জন্য যারা কাজ করছেন তারা পরিচয় জিজ্ঞাসা করছেন। আমি বললাম আমি ওনার ছেলের বৌ আর ফারিয়া ওনার নাতনী। ওনারা বললেন ঠিক আছে, হাত লাগান, বালতিতে গরম ঠান্ডা পানি মিশিয়ে দেন, গায়ে পায়ে সাবান মেখে দেন।যেই কথা সেই কাজ।গরম ঠান্ডা পানি মিলিয়ে সাবান ভিজিয়ে আম্মার গায়ে ধরতেই আমার মনের ভেতর বদলে গেলো।আমার চোখে আমার সলাজ স্বলভাসী মৃদুহাসির সেই সম্ভ্রান্ত মহিলা জেগে উঠলেন যার কাছে আমার মা-বাবার হাত থেকে হাত বদলে আমি সত্যিকারের বড় হয়েছি।উনি আমাকে কত ঋদ্ধ করেছেন শুদ্ধ করেছেন শিক্ষা দিয়েছেন, নীরব পর্যবেক্ষণযোগ্য তৃতীয় নয়ন খুলতে সাহায্য করেছেন তা শুধু আমি নই আমার মাও জানেন।আমিই তার একমাত্র অসমবয়সী বন্ধু যাকে তিনি নীরবে লুকিয়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শুনিয়েছেন।সেই মানুষটি আজ নিথর! সাবান সহ আমার হাত স্তব্ধ! হঠাৎ ফারিয়া মৃদু তিরস্কার করলো “আম্মু, কই, সাবান মাখো, পানি ঢালো! আর আমি ভাবছিলাম এটা তো সাবান নয় ফারিয়া, এটা আমার অতীত, এতে আমার জীবন ঠাসাঠাসি করে বসবাস করে।আর এতে ভাবনার জল ঢাললে ফেনায়িত ভাবনা সজল হয়ে জেগে উঠে বলে “এই আমি জীবন, আমি ঘুমাইনি, আমাতে জল ঢালো, আমি জেগে উঠি। আমার আর শাশুড়িকে গোসলের কাজে হাত লাগানো শেষ হয়নি।আমি পারিনি। আম্মা, মা জননী, আম্মাগো, আপনি বেঁচে থাকতে কতদিন গোসল করিয়ে দিতে চেয়ে আপনার লজ্জার জন্য অনুমতি পাইনি আর আজ শেষবার এই সাবান এই স্মৃতি এই জমে থাকা আস্ত জীবন আমাকে কিছুই ঠিকমতো করতে দিলোনা, আমি ক্ষমাপ্রার্থী আম্মা, আমার প্রিয়তমা মা জননী আমার প্রিয় অসমবয়সী বন্ধু।আল্লাহ আপনাকে বেহেশতে রাখুন।

ছবিঃ সজল