ভালোবাসার শহর আমার…

এই শহরে আজো কেউ যত্নে ফোটায় ফুল বারান্দায়, খেলা করে মেঘ ও রৌদ্র। শরতে আকাশ নীল হয় কী তীব্র ভালোলাগায়। এই শহরে বৃষ্টি আসে, বাতাস উড়িয়ে আনে  কদমফুলের ঘ্রাণ, মানুষ মানুষকেই বলে ভালোবাসি।  উৎসবে, আনন্দে এই শহর বর্ণময় হয়ে ওঠে। খবর ছাপা হয়েছে ঢাকা শহর বসবাসের অনুপযুক্ত। কিন্তু এই ঢাকা তো আমাদের প্রথম ভালোবাসা। এই শহর তো জানে প্রথম সবকিছু।  এই শহরকে পরিত্যাগ করা যায়? সুরে, বেসুরে বাজা সপ্রাণ শহর ঢাকা। বিদ্রোহে, আনন্দে, বেদনায়, অভাবে, যাতনায়, বেঁচে থাকার আশ্রয়। 

এই শহরে সুখস্মৃতি নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন। প্রবাসী- অপ্রবাসী ৭ জন লেখক জানিয়েছেন এই শহরে তাদের ভালোলাগা, ভালোবাসার স্মৃতি।

মোর্জিনা মতিন কবিতা লেখক

গোলাপ ফুলে ছেয়ে গেলো পুরো ঢাকা শহর

রাজকীয় শহর। রাজার শহর। রানীর শহর। কিংবা শহরের রাজা। ঢাকা। কে বলে! সেদিনই না ঘোষণা এলো- ঢাকা এই দুনিয়ার সবচাইতে নিকৃষ্ট শহর। জনবহুল শহর। গ্যাস নাই। পানি নাই। বিদ্যুৎ নাই। সুখ নাই। শান্তি নাই। নিরাপত্তা নাই। আছে অপরাধ। আছে অনিশ্চয়তা। আছে দ্রব্যমূল্য। আছে নর্দমা আর কীট-পতঙ্গ। এই শহর ধূলোর। এই শহর ধোঁয়ার। ছেলেবেলার পড়া ‘মসজিদের শহর’ ঢাকা এখন ‘কোচিং সেন্টারের শহর’। এখানে কেবল প্রতিযোগিতা-জীবনমানের। এখানে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা- মরণপণের। পোশাক-জুতো-গয়না-প্রসাধনীর পরিমাপন। কার গাড়ি আছে, কার বাড়ি আছে। কার ফ্রিজ নেই, কার টিভি নেই। কে ভালো রাঁধতে পারে, কে ভালো বাঁধতে পারে। কে সেরা, কে গোঁড়া। কার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লাইক পড়ে কম, কার ফেসবুকে ফলোয়ার বেশি। এখানে বর্ণবাদ চলে ভালো, ধর্মবাদ ফলে ভালো। রাজনীতি আর সেক্স নিয়ে কথা বলা একদম মানা! বাজার-সদাই, রান্না-বান্না নিয়ে কথা বলুন না! শহরময় জানজট, সড়কময় মৃত্যুপট।

তবু এই শহরের আছে এক নিজস্ব আকাশ, একান্ত এক মহাকাশ। এখানে সূর্য ওঠে। এখানে চাঁদ ওঠে। এই শহরে পিঠা উৎসব আসে, বইমেলা বসে। শীত-গ্রীষ্ম আসে নিয়ম করে।

তেমন করে শরতের এক বিকেল এসেছিলো এই শহরে। প্রাক বিকেল। বিকেল সোয়া তিনটা হয়ে। তুমুল রোদ হয়ে। আমার আত্মজ হয়ে। আমার জ্বলজ্বলে প্রজন্ম। আমার ঝকঝকে উত্তরসূরী। আজন্ম প্রাইভেট ক্লিনিকের তত্বাবধানে থাকা আমি ক্রিটিক্যাল মুহুর্তে স্থানান্তরিত হই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। জানালার গ্রীল জং ধরা। মেঝের মোজাইক স্যাঁতস্যাঁতে। অনাড়ম্বর পেট চিড়ে এক আড়ম্বর সদ্যজাত। যেন গোলাপী গোলাপ। সাদা সব ফুল ভালোবাসি, সেই বিকেলে আমি প্রথম কোন গোলাপী ফুল ভালোবাসলাম। আর তখন- কোথায় জং ধরা গ্রীল! কোথায় স্যাঁতস্যাঁতে মেঝে! ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল হয়ে উঠলো গোলাপী রাজপ্রাসাদ। সদ্য ভালোবেসে ফেলা গোলাপ ফুলে ছেয়ে গেলো পুরো ঢাকা শহর।

ঢাকা, তুমি একদিন ঠিক সেরে উঠবে।

আমার ও আমাদের রেখে যাওয়া প্রতিনিধিরা ভালোবেসে তোমায় যত্ন করবে…

 

আন্জুমান রোজী,(টরন্টো প্রতিনিধি)

সেই দুটি চোখ

ঢাকার তুলনা ঢাকা-ই। ঢাকা শহরকে কোনোভাবেই  অবমূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। কারণ, এর ঐতিহ্য, ইতিহাস, সাংস্কৃতিক মণ্ডল ঢাকাকে সমৃদ্ধশালী করে রেখেছে। বসবাসের অনুপযুক্ত শহরের খাতায় নাম উঠেছে এই শহরের। তারপরেও ঢাকা অদ্ভুত এক টানের শহর, প্রাণের শহর। এখানে পৌষ-পার্বনে আনন্দ উৎসব হয়, বৈশাখী উৎসব, দূর্গা পূজার উৎসব , ঈদ উৎসব এবং  আছে আরো জাতীয় দিনের উৎসব; যেমন, একুশের বইমেলা, এসবে প্রাণবন্ত হয়ে উঠে আমাদের ঢাকা শহর। স্মৃতিময় ঢাকা ভুলে যাবার নয়। সেই সব উজ্জ্বল দিনের স্মৃতি আজো ডেকে যায়।

মনের মধ্যে খুঁজি ঢাকা জীবনের সুখস্মৃতি। ছোটছোট সুখ এমনই আছে যা আজো স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে।তখন আমরা একুশে ফেব্রুয়ারীতে সূর্য উঠার আগে খুব ভোরে অন্ধকার থাকতে থাকতে খালি পায়ে বের হয়ে যেতাম শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে ফুল নিয়ে। এই স্মৃতিটা আমাকে আজো খুব ভাবায়। আরো একটি ছোট্ট ঘটনা। আমি তখন ইডেন কলেজে পড়তাম। বাসে চড়ে মীরপুর থেকে কলেজে যেতাম। মীরপুর বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। সেইসময় লক্ষ্য করেছি একজোড়া চোখ অপেক্ষা করছে আমার জন্য। প্রতিদিন আমরা একই বাসে চড়ে কলেজে যেতাম, ছেলেটা নেমে যেতো ঢাকা কলেজের কাছে, আর আমি ইডেনে। কিন্তু কখনো কথা হয়নি দৃষ্টি বিনিময় ছাড়া।  ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যেতাম যখন ছেলেটি একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো। কিন্তু একধরণের অনুভূতি আমাকেও নাড়া দিয়ে যেতো। কখনো কিছু বলা হলো না, জানা হলো না। এভাবে চলেছিলো বছর দুই। তারপর কোথায় হারিয়ে গেলো সেই ছেলেটি! আর খুঁজে পেলাম না। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর পথেঘাটে সেই ছেলেটির মুখের আদল আর চোখ খুঁজে বেড়াতাম। এখনো সেই স্মৃতি, সেই অনুভূতি আমাকে নাড়া দিয়ে যায়। মনের মধ্যেই থেকে গেলো সেইসব দিনে ঢাকা শহরের স্মৃতি। রয়ে গেলো ভালোলাগার গল্প হয়ে।

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী
লেখক

স্মৃতির শহর

আজকের যানজট, ঘনবসতি, অপরিচ্ছন্নতা, অনিয়ম আর অরাজকতার ঢাকা শহর দেখে আমার খুব মনে পড়ে তিরিশ বা পঁয়ত্রিশ বছর আগে আমার ছেলেবেলায় দেখা সেই ঢাকা শহরটাকে। এই শহরটা নিয়ে আমাদের অসন্তোষ আর বিরক্তির অন্ত নেই । তবু বলবো হাজারো অভিযোগ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন এ শহরটাই আমার প্রিয় শহর। ঢাকা আমার প্রাণের শহর। আমার শৈশবে দেখা আশির দশকের ঢাকার সঙ্গে এখনকার ঢাকা শহরের বিস্তর তফাৎ বৈকি! তখনো এ শহর যন্ত্রনগরী আর এর অধিবাসীরা যন্ত্রমানব হয়ে ওঠেনি। বুড়িগঙ্গার জল বিষাক্ত হয়নি।  রাস্তায় দাঁড়ানো পোস্টবক্স গুলো অকেজো হয়ে যায়নি। সেসময়ও হরদম গাড়িঘোড়া চলতো। তাই বলে এমন নাভিশ্বাস ওঠা যানজট হতো না। আমরা থাকতাম ধানমন্ডিতে। ধানমন্ডি তখন সুপরিসর দোতলা বা একতলা বাড়ি, সামনে বাগান, পেছনে উঠান, ফুলে – ফলে, গাছগাছালিতে ঘেরা চমৎকার আবাসিক এলাকা। বাড়ির পাঁচিলগুলো খর্বাকৃতি। পাঁচিল টপকেই প্রতিবেশীদের বাড়ি যাওয়া যেতো। চুরি-ডাকাতি,ছিনতাই একেবারে যে হতোনা তা নয়। তবে এখনকার মতো মানুষ নিজের ঘরে বসে এতো অনিরাপদ বোধ করতো বলে মনে পড়ে না। এই ঢাকা শহরেই প্রতিবেশীদের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল, একে অন্যের বাড়িতে আসা-যাওয়ার চল ছিল। তখন ছিল এনালগ ফোনের যুগ। ফোন করে এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে কেউ কারো বাড়িতে যেতে হতো না। বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন বা দূরের অতিথির আগমনকে মানুষ সানন্দে গ্রহণ করতো। সকাল হলে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে ফেরীওয়ালাদের হাঁকডাক শুরু হতো। ভরদুপুরে কাঁচের মনোহারী বাক্স আর সাদা বোঁচকা পিঠে নিয়ে আসতো লেইস ফিতা ওয়ালা। বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বানর খেলা,সাপের খেলা দেখানো হতো। সবাই মিলে একসঙ্গে বসে আমরা দেখতাম বানর কীভাবে সালাম ঠুকে শ্বশুরবাড়ি যায়। ডাকপিয়ন বাড়ি বাড়ি ঘুরে চিঠি বিলি করতো। আইসক্রিম ওয়ালার টিনের চৌকো বাক্সের মতো গাড়িটা মহল্লার বাচ্চাদের লাল, কমলা, সবুজ রঙের ললি আইসক্রিমের লোভ দেখিয়ে কেবল টুংটুং টুংটুং ঘণ্টা বাজিয়েই যেতো। এরপর আসে স্নো হোয়াইট নামের কোন (Cone) আইসক্রিমের দোকান। মনে আছে, আমরা প্রথম যখন কোন (Cone) আইসক্রিম খেয়েছিলাম, তার দাম ছিল পাঁচ টাকা! হাজীর বিরিয়ানি খেতে সপরিবারে পুরান ঢাকায় যেতো লোকে। নিউমার্কেটে বাজার করা মানেই লাচ্ছি খাওয়া। স্কুলের সামনে এক টাকার মুড়ি, বাদাম, আট আনার আচার তো ছিলোই। আমার প্রিয় শহর তখনো অপরিকল্পিত মার্কেট, সুপারশপ আর ক্যাফে রেস্টুরেন্টে ভরে যায়নি। ধানমন্ডি এলাকায় মিরপুর রোডে মার্কেট , চায়নিজ রেস্তোরাঁ , টিপটপ লন্ড্রি, ইস্ট ওয়েস্ট ডিসপ্লে ছিল। বাজার-সদাই, শপিং সব নিউমার্কেট, গাউসিয়া থেকেই হতো। জুতোর একচেটিয়া মার্কেট এলিফ্যান্ট রোড। ঈদের কেনাকাটায় আমরা আড়ং , কুমুদিনীতেও যেতাম। দর্জিবাড়িতে ভিড় তো লেগেই থাকতো। একটু আধুনিক বা বিদেশি জিনিসের দরকার পড়লে গুলশান মার্কেট যেতে হতো। বলাকা হলে রাজ্জাক – কবরী, আলমগীর – শাবানা, ফারুক ববিতাদের পোস্টারে ছেয়ে থাকতো।ভারতীয় ছবি দেখা যেতো ধানমন্ডি -২ এ ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রেও চলচ্চিত্র , কার্টুন দেখা যেতো। লাইব্রেরি ব্যবহার করা যেতো সদস্য হয়ে। বিকেল হলে খেলাধুলা, সাইকেল চালানো ছিল। এ বাদেও খেলার জন্য ছিল আবাহনী মাঠ, ৮ নম্বর মাঠ, মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স। শুক্র – শনিবার ছায়ানটে নৃত্যকলা আর গানের ক্লাস। যতদূর মনে পড়ে ছায়ানটের তখন নিজস্ব ভবন ছিলো না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কোথাও ক্লাস হতো ( ইউনিভারসিটি ল্যাবরেটরি স্কুল কিনা মনে পড়ছে না) দর্শনীয় স্থানের মধ্যে শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা আর জাতীয় যাদুঘর ছিল সবার প্রিয়। বোটানিক্যাল গার্ডেনে তখন ছোট ছোট দলে শীতকালে পারিবারিক বনভোজন হতো খুব। সকাল-বিকেল হাটাঁহাঁটি, জগিং আর খোলা হাওয়ায় সময় কাটাতে ধানমন্ডি লেক, সংসদ ভবনের মাঠ, রমনার জুড়ি ছিল না। বেইলি রোডের নাটক পাড়া , ফুলার রোড, শিল্পকলা, বাংলা একাডেমী, চারুকলা, পুরান ঢাকা – সব তখন স্বমহিমায় উজ্জ্বল। একুশে ফেব্রুয়ারির রাতে বাড়িতে বাড়িতে বাগান পাহারা দিতো সবাই কেননা ফুলচোরেরা আসতো। ফুল চুরি হলে পরদিন ভোরে প্রভাতফেরীতে কীভাবে তাজা ফুল নিয়ে যাবে! আহা! এখন ভাবলে সেই ফুলচোর আর বাগানমালিক – দুইপক্ষকেই বড় নিরপরাধ, নির্মল মনে হয়। আসলে তখন এই শহরের মানুষগুলো মানবিক বোধসম্পন্ন ছিল বলেই স্মৃতির এ শহরে অনেক বেশি প্রাণ ছিলো।

মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি
মিস আয়ারল্যান্ড

ঢাকা আমার মনের রাজধানী

ঢাকা শহরে আমার অনেক সুখস্মৃতি আছে। আমি যতদূরেই যাই, যতদূরেই বসবাস করি ঢাকাকে আমার মনে পড়ে বারবার। ঢাকা শহরেরর এখন অনেক সংকট। যানজট, পরিবেশ, জনসংখ্যা অনেক কিছুতেই এখন নাকাল এই শহর আর শহরের অধিবাসীরা। কিন্তু আমার স্মৃতির ভেতরে ঢাকা রয়ে গেছে এক সুন্দর ছিমছাম স্মৃতির শহর হয়ে আজো। এই শহরের রিক্সা চড়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা খুব মনে পড়ে আমার। তখন নিজেকে ফড়িং ফড়িং মনে হতো। ঢাকার খোলামেলা, ফাঁকা রাস্তায় রিকশা চড়ে ঘুরে বেড়াতাম এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে যেতাম শিশু পার্কে। তিনটা রাইডের বেশী চড়ার অনুমতি ছিলো না। কিন্তু সেই অসম্ভব ভালো লাগার স্মৃতি আমার এই শহরেই। বাড়িতে আত্নীয়-স্বজনরা দলবেঁধে বেড়াতে আসতো। মনে হতো সেদিনই বাড়িতে ঈদের খুশী বয়ে যাচ্ছে। এসব ছোট ছোট ভালোলাগার কথা বড় হয়ে উঠেছে এই শহরেই।

ঢাকার সব সংকট, সব জটিলতাকে অতিক্রম করে এসব আনন্দের স্মৃতি আমাকে খুব টানে। আমার আত্না আজো আটকে আছে এই শহরেই। আমি বারবার ফিরে যেতে চাই আমার প্রিয় ঢাকা শহরেই। ঢাকা শহরকে আমরা হয়তো যত্ন করিনি। তাই আজ ঢাকা আমাদের অনাদরে ম্লান হয়েছে। কিন্তু অনেক ভালোলাগার শহর, অনেক ভালোলাগার স্মৃতির শহরটাকে আমি ভুলি না কখনোই। ঢাকা আজো আমার মনের রাজধানী হয়েই আছে।

 

কাশফিয়া ফিরোজ
মানবাধিকার কর্মী

এ শহর জানে আমার প্রথম সব কিছু

ঈদের পর আজকেই কিছুটা জ্যাম পেলাম। অফিস শেষে যাবো প্রথমে বিজয় স্মরণী , তারপর উত্তরা। আশা করিনি আজও জ্যামে পড়বো। কি করা, নিয়তি! ক্লান্ত ছিলাম , চোখটা লেগে আসছিলো । ভাবলাম চোখ বুজে একটা খেলা খেললে কেমন হয়? মানে চোখ বুজে , গাড়ীতে বসে আমি ধারণা করবো আমি কতদূর গেলাম? ঠিক কোন লোকেশনে আছি তা ধারণা করবো আরকি, অনুমানের উপর ভিত্তি করে। নিজের সঙ্গে নিজে খেলতে খেলতে মনে পড়ে যাচ্ছে ঢাকার রাস্তার কতো স্মৃতি। ছোটবেলার ঈদে সকাল সকাল সাজগোজ করে আমরা পাড়া বেড়াতে বের হতাম। এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে মজার মজার খাবার খেতাম আর ঈদি তুলতাম। এরপর রিক্সা নিয়ে সারাদিন টইটই। বড় রাস্তার মাঝ দিয়ে রিক্সা চলতো পঙ্খীরাজের মতো। অর্থ সংকটে কখনো বা আড্ডার উছিলায় চারজন উঠেছি এক রিক্সায়। এখন ভাবি , কিভাবে সম্ভব? স্কুলের দিনগুলোতে রীতিমত আমরা দোয়া পড়তাম যেন সন্ধ্যায় ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। সে সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে পাড়াবাসি বেশিরভাগই রাস্তায় নেমে আসতো , মা-খালারা হাঁটতেন , গল্প করতেন আর আমরা অন্ধকারে ছুটোছুটি করতাম,বকা খেতাম। নগরায়নের তীব্র স্রোতে কোথায় হারিয়ে গেল সেই পাড়া কালচার? স্বরূপের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করেছি সাড়ে চার বছর। তখনতো যা দেখি , যা করি তাই ভালো লাগে। ছাত্র বয়সের হাতে গোনা আয়ে, কখনো আমরা ঘন্টা চুক্তিতে রিক্সায় ঘুরছি তো কখনো সংসদ ভবনের সিড়িতে বসে ভাবছি দেশে থাকবো না বিদেশ পাড়ি দেবো। সকাল-সন্ধ্যা হরতালের দিনগুলোতে দু’জনের দেখা করাটা ছিলো একটা অসম্ভব ব্যাপার ।সে সময় স্বরূপ সন্ধ্যায় ঘন্টা চুক্তিতে রিক্সা ভাড়া নিয়ে আসতো আমার সঙ্গে দেখা করতে। মোড়ে চালককে চা-নাস্তার খরচা দিয়ে আমাদের বাসার সামনে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাড়িয়ে থাকতো আর সুযোগ বুঝে আমিও বারান্দায় এসে দাঁড়াতাম।এখন ভাবতেই অবাক লাগছে। এইতো দু’বছর আগের কথা, ঢাকায় মেয়র ইলেকশন। থাকি উত্তরায়, কেন্দ্র মোহাম্মদপুরে।হায়, এখন উপায়। সকাল দশটায় স্বরূপ বললো , চলো। কিন্তু, কিভাবে? স্বরূপ বললো, আরে চলোই না। রিক্শা নিলাম , উত্তরা-মোহাম্মদপুর-উত্তরা।পথ কি আর ফুরায়।তবে চলতে চলতে কুড়িয়ে পেলাম বিশ বছর আগের কত স্মৃতি , কত গান। এই শহর নিয়ে আমাদের দু’জনের রোম্যান্টিসিজমের শেষ নাই । হবে নাই বা কেন? এই শহরেই আমাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, স্বপ্ন দেখা, প্রেম, সংসার, জীবিকা। গাড়ী আছে কিন্তু আজও আমরা অবলীলায় গণপরিবহনে যাতায়াত করি। পকেটে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে যেমন সুপার শপ থেকে বাজার করি একই ভাবে নিয়মিত ভাবে কাঁচা বাজারে গিয়ে দরদাম করে বাজারের সেরা মাছটা কেনার সুযোগও হাতছাড়া করি না। করবোই বা কেন? এ শহর আমার প্রেম। মানুষ যখন ভালবাসে তখন তার সঙ্গীর ভালো মন্দ সব কিছুর সঙ্গেই নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে । কখনো পরিবর্তনের চেষ্টা চালায়, কখনো খাপ খাইয়ে নেয়। রাগ হয় , ক্ষোভ ঝরে কিন্তু নিরাশ হয়না।ভালবাসার হাত ছাড়ে না। আমাদের দশাও অনেকটা সেরকম। জ্যাম, জনসংখ্যা, বৈষম্য, দুর্নীতি, অসমতা যাই থাকুক না কেন, বেলা শেষে আমার শহর-আমার গর্ব। মৃদু একটা দুলুনি , তার মানে মহাখালি রেললাইন পার হচ্ছি। চোখ খুলে উকি দেই মিলিয়ে দেখার জন্য।মিলেছে। আবার চোখ বন্ধ করি, গন্তব্যে না পৌছানো পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যাবার ইচ্ছা। কিন্তু মাথা থেকে দু’টো লাইন কিছুতেই তাড়াতে পারছি না , “এই শহর জানে আমার প্রথম সবকিছু, পালাতে চাই যতো সে আসে আমার পিছু পিছু।”

নুসরাত নাহিদ
লেখক

তবুও এ শহরেই

আমি হেঁটে যেতে দেখি আমাদের। তোমার আমার ক্ষ্যাপাটে শহরে। কাজের ফাঁকে, দপ্তর থেকে দপ্তরে ছোটার মাঝে। তুমি চলে আসো ঠিক ঠিক। কাকরাইল মোড়ে মসজিদটায় মুসুল্লিরা দাঁড়িয়ে থাকে মনকন্যাকে দেখার আশায়। ওদের পেরিয়ে যেতেই হেয়ার রোডে চিরল চিরল পাতার ছায়ায় তোমাকে আমাকে পেয়ে যাই। এত কথা বল তুমি, এত কথা বল…আমি মোহগ্রস্থের মত শুনি। 
তোমার আমার সাধের শেরাটন নতুন করে সাজছে এখন। ওই তাম্র ঘোড়সওয়ারেও তোমাকে আমাকেই দেখি। খুব হাসতে, প্রাণটা খুলে। পথিকদেরও সংক্রমিত করে দিয়ে।
ডানকান মেসোর বাড়িটা পেরুতেই চা-বাগানে থালার মত চাঁদটা দেখার সাধটা মাথা চাড়া দেয় তোমার। আমারও যে খুব ইচ্ছে হয়, চা এর মাঝে কমলা ছেড়ে সাঁঝবেলাতে তোমার পাশে বসার। ইস্কাটন গার্ডেন রোডে কত শত অলিগলিতে কত যে ঘুরি তোমার সুন্দরী বাইকের পিঠে। কানে কানে বলে রাখি একটুও আরাম পাইনা কিন্তু ভদ্রভাবে বসে। পরেরবারে খানিক নাহয় অভদ্রই হতে দিলে।

কতোদিন পুনিতকে দেখিনা। ওর জন্যে টো ধরে আর বসে থাকে না পুষ্পিতা। নিতিন, রাজু, এহসান আর সৌরভের দলটাও গীটার নিয়ে কাঁপন ধরায় না ফুটপাথে। শোনায় না গান সাংসারিক সুতোয় গাঁথা পথিকের কানে। এখন ওরা চলে গেছে মিউজিকক্যাফের পিচ-ব্ল্যাক ছাদের তলায়। বিটুমিনের পথের বদলে অনুরনণ এখন অ্যালুমিনিয়ামের পাতটায়। অপেক্ষাগুলি রাধাচূড়ার উষ্ণতা ফেলে শীতল রেস্তোরাঁয়- সুসজ্জিত খাবার টেবিলে, কাঁটাচামচে আর পিরিচে। সার সার কৃষ্ণচূড়া আর সোনালুর অপমৃত্যুর শ্মশানে এখন টাইলসের কফিন। ব্যস্ত নগরীর শশব্যস্ত নাগরিকপাড়াও এখন সময়হীনতায় শ্বাসরোধী সঙ্গিন। একটি দু’টি দর্জিবাড়ি, একটি দু’টি সদাইপাতি আর একটিমাত্র ফার্মেসী এখন আর চোখে পড়ে না। ঝাঁ চকচকে স্থাপত্য আর কাব্য লেখা প্রাচীরের পাশে যে কোনও দালানই আজ প্রাচীন।

তবুও এ শহরেই তোমার আমার দেখা হয়। কলাপাতা শাড়ির পাড়ে, কালচে নীল শার্টের হাতায়।

 

ফারহানা আলম
উন্নয়নকর্মী

ঢাকার গন্ধ…

অফিসের কাজে বা বেড়ানোর জন্য ঢাকা বা দেশের বাইরে যেতেই হয়। কিন্তু ৪/৫ দিন পরই একটা মন কেমন করা অনুভুতি হতে থাকে। সেটা কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনা করা যায় না। ঢাকায় আমার যেটা সবচাইতে পছন্দ সেটা হলো ঢাকার গন্ধ। আমি নানান উৎসব, মৌসুম বা আয়োজনে ঢাকায় একটা গন্ধ পাই। এ গন্ধ ভীষণ আপন। সেপ্টেম্বর এসে গেলেই ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে আমি একটা গন্ধ পাই। এ গন্ধটা মনে করিয়ে দেয় শীত আসি আসি। শীতের পুরো সময়টা শুকনা পাতা পোড়ানোর, রাস্তার পাশে পিঠা বানানোর ধুম, শহর জুড়ে কুয়াশার চাদরের একটা গন্ধ আছে। আমি সে গন্ধটা পাই। এ গন্ধটাই আমার ভীষণ ভালো লাগে। বইমেলার সময়টায়, উৎসবের একটা আমেজ থাকে একটা আনন্দের গন্ধ থাকে চারদিকে। আমি সে আমেজটা ভালোবাসি। পহেলা বৈশাখের সময় ১৫দিন ধরে চারুকলার মুখোশ আঁকার , মঙ্গল শোভাযাত্রার যে প্রস্তুতি সে আনন্দের তো তুলনাই হয় না। রোজার সময়টায় ইফতারের আগে থেকে প্রায় মাঝ রাত পর্যন্ত যে হুলুস্তুল কেনাকাটা, খাওয়া দাওয়ার ধুম তারও একটা গন্ধ আছে।  আমি সেটাও খুব ভালোবাসি। প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত এ নগরে সবাই প্রতিনিয়ত ছুটে বেড়াচ্ছে। এ ব্যস্ততার মাঝেও আছে এক আন্তরিকতা। শহরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যে চায়ের স্টল, সেগুলোতে দলে বলে চায়ের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার যে আনন্দ, তা ঢাকায় না থাকলে কেমন করে বোঝা যেত?

ছবিঃ গুগল, প্রাণের বাংলা