জীবন গিয়াছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার


সুমন সুপান্থ

(ইংল্যান্ড থেকে): ঈদ এলে, পার্বণ এলে মাতৃগ্রামটা খুব মিস করি। পিতৃভিটেটা মিস করি। গ্রামের বড়বোন সেই মফঃস্বল শহর, আমাদের সেই মৌ শহরটাকে মিস করি খুব। যাদের ঘর নেই, দেশ নেই, তবু কোথাও ফেরার এক মোহন ও মুরালীময় তাড়া রয়ে গেছে অলক্ষ্যে, সবার, সব্বারই এমন হয়… জীবন যায় চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার! কতো আপনজনা চলে গেছে লক্ষ যোজন জগতের পার! ক্ষয় ও ক্ষতির এইসব খতিয়ান জনান্তিকে দিতে আর সায় দেয় না মন। এইসব ব্যক্তিগত ক্ষত। কাহাতক আর! কিন্তু স্মৃতি এক সুপারসনিক অক্টোপাস! ভিন্ন ভিন্ন হাতে সে চেপে ধরেই যায়। কণ্ঠনালি। খাবলে দেয় কলজে সুদ্ধ।
এই যে নিজের কোনও শহর নেই, দেশ নেই, ভুমি নেই তবু কোথাও নিজের অনেকগুলো স্মৃতি জমা হয়ে আছে। ত্যাজ্য হয়ে পড়েছি যে গ্রাম থেকে, শহর থেকে, ফি বছর এই ঈদে সেখানে ফিরতেই তবে ভেতর ভেতর এতো উতলা হয়ে পড়ি কেন!? তুচ্ছ এবং তুচ্ছাতিতুচ্ছ কিছু ঘটনা, যা কিনা আজও একেকটা উজ্জ্বল স্ন্যাপশট হয়ে আছে,সেসব কিছুই ছেলেবেলার। ঈদবেলার।
খুব মনে আছে, এমন ঈদের কোনোও একদিনেই মনি আর আকতার ভাইর পাল্লায় পড়ে প্রথম সিগারেটে টান মেরে চোখ টোখ লাল হয়েছিলো কি হয় নি, তাও, অযথাই বাড়তি এক ভয় উত্তেজনা চেহারায় মেখে লেবু পাতা চিবিয়ে গিয়েছিলাম সারাদিন! পাছে ধরা পড়ে যাই। আবার কারো কাছে কেন ধরা পড়ছি না এখনো, আমরা যে বড় হয়ে গেছি তা কেন কেউ জানছে না, সেই ব্যর্থতাও বয়ে গেছি সারাদিন। এমন ঈদের এক বিকেলেই আমি, জুয়েল ভাই, আর জুয়েল ভাইর শহরবাসী বন্ধু টিটো মিলে, টিটোদের ছাদখোলা জীপ করে সারা শ্রীমঙ্গল চষে বেড়িয়েছিলাম। বিটিআরসির সবুজ গালিচাময় চত্বর, আর হঠাৎ জগত থামিয়ে দেয়া সুন্দর একঝাঁক আপাস্থানীয়ারা আমাদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো দূর গহীন এক চা বাগানে ভেতর। তাদের শ্লথ রিক্সার পেছন পেছন আমাদের তেল প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া সেই জীপ! এরকম ঈদের দিনেই আমি প্রথম দেখেতে পেয়েছিলাম পৃথিবী ছেড়ে যাবার কালে পশুদেরও অভিমান হয় জগতের উপর। আজ ভাবি, তখন হয়তো মানুষ ছিলাম, এখন দিনে দিনে নিজেই পশু হয়ে উঠছি, তাই সেই অভিমান আর ছোঁয় না সেভাবে।
এখন ফেসবুক আছে, ইন্সটগ্রাম আছে। এই হাসি হাসি মুখের বন্ধুর ছবি, তো ওই দূর সম্পর্কীয় বান্ধবীর নতুন ড্রেসের ছবি। মোহনীয় ভাবীর বানানো রঙ ঝলঝল জর্দার পাশে ভাইয়ার স্ফীত ভূড়ির ঝলক! কী নেই! স্ক্রল করে নিচে নেমে গেলেই আবার সেই বন্ধুর পোস্টেই অল্প ক্ষণ পর খুন হতে চলা অভিমানি ষাড়ের গড়িয়ে নামা অশ্রুর ছবি। আছে মনের পশু কুরবানী দেয়ার অযুত নিযুত আহবান। আছে রক্ত ঝরানোর মরতবাময় বয়ান। কোথায় যাবে বাহে! মুক্তি মিলে না, মুক্তি মিলে না। পোস্টের সঙ্গে লাইক মিলে, তবু মুক্তি মিলে না!
তখন মুক্তিই ছিলো নৈমিত্তিক। আজ মুক্তি হন্যে হয়ে খুঁজে মরা। আজ প্রেম প্রেম খেলা। সেদিন প্রেমই ছিলো মূখ্য। আহা আমাদের গেছে যে দিন! আহা আমাদের আপুস্থানীয়া সেই সুন্দরীরা। আহা, কাশফুলের মত সেই হাসি তাদের। আহা আমাদের চিঠি প্রাপক প্রেমিকারা; ডাকসাইটে সৌন্দর্য ছিল তাহাদের। সারা শহর জুড়ে সেসব ঈদের দিনে প্রেমের বান ডাকত গো। মনুর বানের মত, ক্লাউড বার্স্ট করা বৃষ্টির মত প্রেম।
আর কি কখনও কবে এমনও ‘ঈদ’ হবে? আসলেই, ‘জীবন গিয়াছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার’।
দূরে পড়ে আছি। বৃত্তের বাইরে। তবু “ঈদ” ছেড়ে যাচ্ছে না আমাদের। এবার না হয় আমাদের এই মেমোরি সেক্রিফাইকেই তুমি কবুল করো হে নাথ। আমাদের কুরবানী কে গ্রহণ করো প্রেমময়।
… তব পুণ্যকিরণ দিয়ে যাক মোর মোহকালিমা ঘুচায়ে….

ছবি: গুগল