ভীষণ অচেনা ও একা…

পৃথিবীতে সবচাইতে বুদ্ধিমান প্রাণীটিই সবচাইতে নিঃসঙ্গ। চারপাশে জীবনের এতো আয়োজন, শাখা-প্রশাখায় বিস্তারিত পরিবার, প্রজন্ম, স্বাস্থ্যবান পাখির ডাক, ধানচাষ, দুবেলা দু’মুঠো ভাপ ওঠা গরম ভাতের আয়োজন, গম্ভীর সমুদ্রের ডাক, মৌন পাহাড়ের হাতছানি, নিজের হাতে গড়ে তোলা সভ্যতা, উজ্জ্বল সূর্যের আলোর নিচে জীবনের এতো গাঢ় আয়োজন সঙ্গে নিয়েও মানুষ তার মনের ভেতরে নিঃসঙ্গতার চূড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
পৃথিবীতে মানুষ ২ লক্ষ বছরের পুরনো প্রাণী।তার একাকীত্বের বয়স কত? কবে থেকে মানুষ একটু একটু করে একা হয়ে গেছে? হিসেব কষে উত্তর দেয়া কঠিন। রকেটে চড়ে মানুষ চাঁদে গেছে তবু তার মনে তৈরী হয়েছে একাকীত্বের ভার! এতোকিছু জয় করেও মানুষ নিজেকেই চিনতে পারেনি। ভীড়ের ভেতরেও নিজের চিবুকের কাছেও সে রয়ে গেছে ভীষণ অচেনা ও একা। ফরাসী কবি বোদল্যের তাঁর কবিতায় বলেছেন ‘অচেনা মানুষ’।
মানুষের একাকীত্ব আসলে সময়হীন বিস্তারের অভিজ্ঞতা। নিজের আদিকালেই কি মানুষ একাকীত্বে ভুগেছিলো? নৈঃসঙ্গ কাটাতে সে ঘর বেঁধেছিলো, তৈরী করেছিলো পরিবার। কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে ফেরা একাকীত্বের হাওয়ার বয়সও অনেক। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো মানুষের সেই একাকীত্বের কথা ‘ভীষণ অচেনা ও একা’।

একবিংশ শতাব্দীতে পা রেখে মানুষ আরো একা। সবটাই যেন জীবনানন্দ দাশের সেই ধূসর পাণ্ডুলিপি, লেখা হয়ে গেছে পৃথিবীর সমস্ত আকাশ জুড়ে। জীবনানন্দ বলেছিলেন, হাজার বছর ধরে পথ হাঁটার কথা। পৃথিবীর মানুষ তারও চেয়ে বেশী সময় ধরে হেঁটে এসে আজ সকল বিরূপতার বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস, ইচ্ছা আর রুচি হারিয়েছে বলেই মনে হয়। জীবনানন্দ দাশের মতো আজ তারাও হয়তো টেম্পোরারি সাসপেনশন অফ ডিজবিলিভ রোগে আক্রান্ত।গণমাধ্যম খবর জানাচ্ছে একাকীত্ব এখন মহামারীর রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি ব্রিটেন সরকার নিঃসঙ্গতা বিষয়ক মন্ত্রণালয় খুলতে বাধ্য হয়েছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষে মানুষে যোগাযোগের সেতুটি বিপর্যস্ত, প্রায় ভেঙ্গে পড়ার দশায় উপস্থিত। মানুষ ভুলে গেছে অন্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর কৌশল। দু’জন মানুষের মন সমান্তরাল। কেউ কাউকে ভেদ করতে পারছে না। দুজন মানুষ পাশাপাশি বাস করেও একে অন্যকে ভেদ করতে পারছে না। স্বামী, স্ত্রী, বন্ধু এবং প্রেমিক-প্রেমিকার ওপর গবেষণা চালিয়ে তারা জানাচ্ছেন, এই শতাব্দীতে মানুষ এক ভ্রমের মধ্যে দিয়ে জীবনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কমিউনিকেশনের গভীর অভাবটাকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে না পেরে তারা ভাবছে একে অপরের সঙ্গে তারা সংযুক্ত। কিন্তু আসলেই কি তাই?
নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বকে এক পাত্রে গুলিয়ে ফেলার কোনো কারণ নেই। যে মানুষ একা থাকে সে নিঃসঙ্গ না-ও হতে পারে। সে একা থেকেও নৈঃসঙ্গকে উপলব্ধি করবে এমন কোনো কথা নেই। আবার একজন মানুষ ভীড়ের মধ্যে থেকেও একাকীত্বে ভুগতে পারেন। এখন পৃথিবীতে নগরে বসবাস করা বেশীরভাগ মানুষের সংকট এটাই। তারা মনের ভেতরে ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছে।চিকিৎসকরা বলছেন মানুষের এই নিঃসঙ্গতা দিনে ১৫টি সিগারেট পান করার চেয়েও মারাত্নক ক্ষতিকর। সম্প্রতি অ্যরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক পাসালাকুয়া ও ক্রিস সেগরিন ২৬৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর গবেষণা করে জানিয়েছেন, আমাদের চারপাশে এমন অনেকেই আছেন, নিজের পারিবারের সদস্যদের সঙ্গে যাদের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই এমনকি কোনো বন্ধুও নেই। এ ধরণের মানুষের শরীরের ওপর নিঃসঙ্গতা খারাপ প্রভাব বিস্তার করে কিন্তু তারা তা বুঝতেও পারেন না।
প্রয়াত অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো আত্নহত্যার আগে ১৯৬২ সালে শেষ নোটে লিখছেন, ‘প্যাটকে বিদায় জানাও, প্রেসিডেন্টকেও বিদায় জানাও এবং বিদায় জানাও নিজেকে। কারণ তুমি চমৎকার।’ হয়তো কাঁপা কাঁপা হাতে পৃথিবীকে শেষবার নিজের কথা জানিয়ে দিতে লেখা কয়েকটি অসংলগ্ন লাইন। অথচ জীবনের নিঃসঙ্গতা কত করুণ হয়ে ফুটে উঠেছে কয়েকটি লাইনে।
নিজের হাতে জীবনদীপ নিভিয়ে দেয়ার আগে আরেকটি চিঠিতে মনরো লিখেছিলেন এক বন্ধুকে, ‘ আমি এখন পরাজিত। কোন কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছি না… আমি উন্মাদের মত বলছি, মনে হয় আমি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি। আমি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াই, মনোনিবেশ করতে চেষ্টা করি, কিন্তু মনঃসংযোগ ঘটাতে ব্যর্থ হচ্ছি। মনে হচ্ছে মানব প্রতিযোগিতায় আমার কোন অস্তিত্বই নেই।’
১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ প্রায় মনরোর কথাগুলোই শেষ চিঠিতে লিখেছিলেন ভার্জিনিয়া উলফ। পানিতে ডুবে নিজের বিখ্যাত লেখক জীবনের সমাপ্তি টেনেছিলেন। স্বামীকে লেখা সুইসাইড নোটে লেখা ছিলো-‘প্রিয়তম, আমার মনে হচ্ছে আমি আবারো পাগল হয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে এবার আমরা আর ভীতিকর সময় কাটাতে পারবো না। এই সময় থেকে নিজেকে মুক্ত করতেও পারবো বলে মনে হয় না। আমি কিছু স্বর শুনতে পাই। কিছুতেই মন বসাতে পারি না। তাই যেটা সবচেয়ে ভালো মনে হচ্ছে সেটাই করছি। তুমি আমাকে সর্ব্বোচ্চ সুখ দিয়েছিলে।’
এই দু’জন মানুষ উদ্ভাষিত হয়েছিলেন পাদপ্রদীপের আলোয়। মানুষের আরাধ্য হয়েছিলেন, কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। কিন্তু তারপরেও জীবনের খুব কাছে থেকেও তারা একা হয়ে গিয়েছিলেন।
মনরো আর উলফের আত্নহননের প্রায় ৭০ বছর পরে এসেও একজন নারী এই সময়ে তার ব্লগ পেজে লিখছেন এই কথাগুলো-‘নিঃসঙ্গতা আমার খুব প্রিয়। ভালোবেসে ওর নাম দিয়েছি একাকীত্ব। বিষণ্ণতার ভারে আমার মন যখন ভারাক্রান্ত, আমি তখন শুধু নিঃসঙ্গতাকেই চাই। চারিদিকের কোলাহল অসহ্য লাগে। নিঃসঙ্গতার কোলে মাথা রেখে, খুব ঘুমোতে ইচ্ছে করে তখন। একাকীত্ব খুব শান্ত, স্থির। আমাকে বোঝে, আমার মনকে বোঝে, তাই একাকীত্বের কাছে নিজেকে উজাড় করে দিতে বড়ো ভালো লাগে। আমার একাকীত্ব খুব চাপা, কোনো কথা বলেনা। আমার মনের কষ্টগুলোকে নিজের মধ্যেই চেপে রাখে। নিঃসঙ্গতা আমার অনেকদিনের সঙ্গী, এখন ও আমার অভ্যেস। ওকে ছাড়া আমি খুব অসহায়। আমার প্রতিটা ভালো খারাপের সাক্ষী আমার একাকীত্ব। লোকে বলে, খারাপ সময়ের সঙ্গীরাই নাকি প্রকৃত বন্ধু। যদি তা সত্যি হয়, তাহলে একাকীত্ব আমার প্রকৃত বন্ধু। আমার প্রতিটা মন খারপের সময় ও আমার পাশে থেকেছে, আমাকে সামলেছে।’ চমকে ওঠার মতোই ঘটনা। তারমানে এই দীর্ঘ যাত্রায় মানুষ কি আসলে একার থেকেও একা হয়ে গেছে? আমাদের নগরবাসের ইতিকথা, শিল্পের বিস্তার, রাজনৈতিক দৈন্য আর দুর্নীতি মানুষকে মানসিক একাকীত্বের অসহায় এলাকায় ঠেলে নিয়ে গেছে। যে মানুষ সময় ও পরিস্থিতির ফাঁদে পড়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, অন্যদের নিজের কষ্ট বুঝতে দিতে চায় না বা অন্যরা সেটা বুঝতে চায় না, তখন সে তার চারপাশে অদ্ভূত একটা পরিমন্ডল গড়ে তোলে। সে এতে সুখ পায় না, বাধ্য হয়েই সেই ঘেরাটোপে তাকে একা থাকতে হয়। একা থাকতে থাকতে একসময় একা থাকাটাই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। একটা সময়ে সে নিজেও বুঝতে পারে না অন্যদের সঙ্গে তার সংযোগ সেতুটি ভেঙ্গে পড়েছে।
মনোবিজ্ঞান বলে, একজন ব্যক্তি মানুষ নিঃসঙ্গতায় না ভুগেও একা থাকতে পারে। আবার সে অনেক মানুষের ভীড়েও থাকতে পারে ভীষণ নিঃসঙ্গ। সেই মানুষের এই নিঃসঙ্গ অথবা একা জীবনের মাত্রা নির্ধারিত হয় একান্ত নিজস্ব জীবন পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ ৭০ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত নিঃসঙ্গতায় ভুগতে পারে। আর এই নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তার ওপর চেপে বসে ডিপ্রেশন নামের রোগ।
রবীন্দ্রনাথ যৌবনে অনেকটা সময় পূর্ববঙ্গে কাটান। তিনি একা একাই ভ্রমণ করতেন। তখন জনৈক কবি বন্ধুকে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘অনেক সময় মাসের পর মাস একা থাকতাম। কথা বলারও লোক ছিলো না। ব্যবহারের অভাবে সেইসময় আমার কন্ঠ ক্ষীণ হয়ে এসেছিলো।’’ এই অবসাদ রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলেছিলো।
যদি ফিরে তাকাই সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ সিনেমার দিকে দেখতে পাবো সেখানেও
ট্রেন যাত্রায় সেই নায়ক সেলেব্রিটি বলেই নিঃসঙ্গ। স্বপ্নে জাগরণে একাকীত্বের আঘাত তাকে বহন করতে হচ্ছে। অর্থ, প্রতিপত্তির আর জনপ্রিয়তার চূড়ায় আরোহন করেও নায়ক নিঃসঙ্গতার চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছেন। দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠে বিগ ক্লোজে পর্দায় তার ঘর্মাক্ত মুখ বলে দেয় নিঃসঙ্গতা মানুষকে কতোটা আচ্ছন্ন করেছিলো গত শতাব্দীতেও। সত্যজিৎ রায় সেই নিঃসঙ্গতার ভ্রমণকেই তাঁর সিনেমায় দেখাতে চেয়েছেন।
মানুষ তার নিজের নিঃসঙ্গতার বিষয়টি সম্ভবত প্রথম উপলব্ধি করতে পারে ষোড়শ শতকে। বলা যেতে পারে মনের মধ্যে একা হয়ে যাবার বিপদটাকে সে বুঝতে পারে ওই সময়ে এসে। সপ্তদশ শতকে প্রথম লেখায় ‘নিঃসঙ্গতা’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। ১৬৬৭ সালে কবি জন মিল্টন তাঁর ‘প্যারাডাইস লস্ট’ কবিতায় প্রথম নিঃসঙ্গ চরিত্র নির্মাণ করলেন। সেই চরিত্রটি ছিলো শয়তান। সেই শয়তান ছিলো একা।
আসলে নিঃসঙ্গতার রূপকে সঠিক ব্যাখ্যার আয়ত্তে আনা সম্ভব নয়। প্রত্যেকটি মানুষ তার একাকীত্বকে, নিঃসঙ্গতাকে নিজের মতো করে অনুভব করে, যন্ত্রণায় দুমড়ে যায়, পরিণতিতে বাঁধে একলা থাকার ঘর। সাহিত্যিক জোসেফ কনরাড তার বইতে এই নিঃসঙ্গতাকে ‘নগ্ন সন্ত্রাস’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।যন্ত্রণাকে আড়াল করতে অথবা সংযোগহীনতাকে বুঝতে না পেরে মানুষ মুখোশে নিজেকে আড়াল করে পথ চলে। কিন্তু নিঃসঙ্গতা ঘাতক হয়ে তাকে ঘিরে ধরেছে। পরিত্রাণের পথ খুঁজছে মানুষ। পাবে কি?

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল ও প্রাণের বাংলা