একাত্তরের বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী : শ্রদ্ধাঞ্জলি

আবদুল্লাহ আল মোহন

একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জননী নামে সর্বমহলে শ্রদ্ধেয় বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী ‘একাত্তরের জননী’সহ ১৮টি গ্রন্থের লেখক, মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের শিকার নারী রমা চৌধুরী গত ৩ সেপ্টেম্বর সোমবার ভোররাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। একাত্তরের বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য, রমা চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাড়ের ব্যথাসহ নানা রোগে ভুগছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে বাসায় পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে গিয়েছিল তাঁর। সেই থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন । কয়েক দিন আগে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানান, ভোররাত ৪টা ৪০ মিনিটে রমা চৌধুরীর লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বোয়ালখালীর গ্রামের বাড়িতে রমা চৌধুরীকে সমাহিত করা হয়। এর আগে রমা চৌধুরীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। রমা চৌধুরী একাত্তরের বীরাঙ্গনা। তাঁর দুই সন্তান যুদ্ধে গিয়ে মারা যায়নি যদিও, কিন্তু তারাও আসলে এই যুদ্ধেরফল ভোগ করেছে। এই দেশের জন্য এই ভদ্রমহিলার জীবনটা ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। একটা সুখের এবং শান্তিময় জীবন কাটানোর কথা ছিলো তাঁর, তাঁর বদলে অতি নির্মম একটা জীবন পেয়েছেন তিনি। সেই জীবনে শুধু একাকীত্বের বেদনাই নেই, রয়েছে সব হারানোর তীব্র যন্ত্রণাও। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি হারিয়েছেন তাঁর সর্বস্ব। আমাদের স্বাধীনতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর অবদান। কিন্তু, এর বদলে তিনি কখনোই কিছু চান নি বাংলাদেশের কাছে। নিজের জীবিকা তিনি নিজে জোগাড় করেছেন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। নিজের লেখা বই নিজেই তিনি বিক্রি করতেন। বই বিক্রি করে একটি অনাথ আশ্রম গড়ার স্বপ্ন ছিল তার। জীবনের শেষ বয়সে রমা চৌধুরীর ঋণ শোধ দেবার সুযোগ আমরা কাজে লাগাইনি ভেবে বেদনাহত হতে হয়। এ দায় শুধু রাষ্ট্রের একার না, এই দায় আমাদের সকলেরও। একাত্তর পরাজিত করতে পারেনি বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীকে। এ বছরের শুরুতে (জানুয়ারি, ২০১৮) হাসপাতালের বেডে শুয়ে রমা চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আমি বাঁচতে চাই। একাত্তর সালে পরাজিত হইনি। স্বাধীন দেশে রোগ ও অর্থের কাছে পরাজিত হতে চাই না।’

রমা চৌধুরী ১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রমা চৌধুরী। এমনও বলা হয়ে থাকে, তিনিই ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ)। ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। সাগর, টগর, জহর এবং দীপংকর এই ৪ সন্তানকে ঘিরে তার সংসার আবর্তিত হয়েছে। একসময় রমা চৌধুরী দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ে করেন। কিন্তু এই সংসারও সুখের হয়নি। প্রতারক স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে যান। এই সংসারে জন্মেছিলো তাঁর আরেক সন্তান। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। এই সন্তানকেও তিনি বাঁচিয়ে রাখতে পারেন নি। ১৯৯৮ সালের ষোলই ডিসেম্বর এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর দ্বিতীয় সংসারের সন্তান টুনু মারা যায়। এর পর থেকে পায়ের জুতোকে পুরোপুরি বিসর্জন দেন তিনি। খালি পায়েই চলা ফেরা করে চলেছেন সেই থেকে।

তিনি গল্প উপন্যাসের কোনো চরিত্র নন, আমাদেরই খুব চেনা একজন। তাঁর নাম রমা চৌধুরী। একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়ে লক্ষ লক্ষ নারীদের মতো তিনিও ধর্ষিতা হয়েছিলেন বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে। শুধু ধর্ষিতা হয়েই শেষ হয়নি তাঁর উপরে নেমে আসা পৈশাচিকতার। এর মাশুল আরো বিশাল পরিমাণে তাঁকে দিতে হয়েছে পরবর্তীতে। পুরো জীবনটাই ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছে তাঁর, হয়ে গিয়েছে লণ্ডভণ্ড এবং তছনছ। অন্তহীন এক অন্ধকার নেমে এসেছে তাঁর জীবনে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তিন পুত্রসন্তানের জননী ছিলেন। থাকতেন পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায়। তাঁর স্বামী ভারতে চলে যান। ১৩ মে সকালে পাকিস্তানি সেনারা এসে চড়াও হয় তাঁর ঘরে। এ সময় দুগ্ধপোষ্য সন্তান ছিল তাঁর কোলে। এরপরও তাঁকে নির্যাতন করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা গানপাউডার দিয়ে আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দেয় তাঁর ঘরবাড়ি। পুড়িয়ে দেয় তাঁর সব সম্পদ। নিজের নিদারুণ এই কষ্টের কথা তিনি লিখেছেন ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে ২ পুত্রকে হারানোর পাশাপাশি তিনি নিজেও সম্ভ্রমহানির শিকার হন। তার ঘর-বাড়ি আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয় বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা। জীবনে তিনি কখনো মানুষের দয়া সহানুভূতির জন্য কাতর হননি। নিজের লেখা বই বিক্রি করে তিনি জীবন ধারণ করতেন। তার লেখা গ্রন্থসমূহের মধ্যে- একাত্তরের জননী, এক হাজার একদিন যাপনের পদ্য এবং ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখযোগ্য। তিনি সর্বমোট ১৮টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের পর ২০ ডিসেম্বর তাঁর বড় ছেলে সাগর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর ১ মাস ২৮ দিন পর মারা যায় আরেক ছেলে টগর। এরপর তিনি জুতা পরা বাদ দেন। পরে অনিয়মিতভাবে জুতা পরতেন তিনি। ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর আরেক ছেলে মারা গেলে পুত্রশোকে তিনি আর জুতা পায়ে দেননি। খালি পায়ে হেঁটে নিজের লেখা বই বিক্রি করে চলতেন এই নারী। হিন্দু রীতিতে শবদেহকে পোড়ানোয় বিশ্বাস ছিলো না রমা চৌধুরীর। ফলে, তাঁর দুই সন্তানকেই কবর দেওয়া হয়। জুতো পরে হাঁটলে তাঁর দুই সন্তান ব্যথা পাবে, এই বিবেচনায় জুতো পরা বন্ধ করে দেন তিনি। চার বছর এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যায়। পরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের অনেক অনুরোধ এবং পীড়াপীড়িতে জুতো পরেন তিনি। কিন্তু, কে জানতো, এই জুতো পরাও বন্ধ হয়ে যাবে একদিন।

বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উত্তালক্ষণে তিনি দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েছেন। কাজেই তার এই স্মৃতিকথার একটা ঐতিহাসিক-সামাজিক মূল্য আছে। তার অপর স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থটি সরাসরি ইতিহাস-সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রামে শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত ছিলেন রমা চৌধুরী। একে তো শিক্ষিত, সচেতন মানুষ, তার ওপর নারী, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার হিন্দু-পরিচয়। সবমিলিয়ে পাকিস্তানি বর্বর আর্মিদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি নিজে যেমন নির্যাতিত হলেন, তেমনি নিজের দুই সন্তানকে হারালেন। তার জীবনের সেই ক্রান্তিকাল নিয়ে তিনি লিখেছেন এখানে। এছাড়া তার স্মৃতিতে একাত্তর নিয়ে অগ্রন্থিত কিছু গদ্য আছে। স্মৃতিকথা নামে কয়েক পর্বে ছাপা হয়েছে পাক্ষিক ‘অনন্যা’ পত্রিকায়। ২০১৫ সালের ‘অনন্যা’ ঈদসংখ্যায় নিজের জীবনে বেড়ালের ভূমিকা নিয়ে অসাধারণ এক গদ্য লেখেন। ২০১৪ সালে তিনি অনন্য শীর্ষদশ সম্মাননা পান।

স্বাধীনতাযুদ্ধে ঘরবাড়ি, তিন শিশুসন্তান, স্বামী সবকিছু হারিয়ে পথে বসা একাত্তরের বীরমাতা রমা চৌধুরী বিগত ২০ বছর ধরে লেখক বৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। যদিও তাঁর লেখক বৃত্তির পেশা একেবারেই স্বনির্বাচিত ও স্বতন্ত্র। তিনি প্রথমে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। বিনিময়ে সম্মানীর বদলে পত্রিকার ৫০টি কপি পেতেন। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবন-জীবিকা। পরে নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ করে বই ফেরি করতে শুরু করেন। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে তিনি নিজের ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর ‘একাত্তরের জননী রমা চৌধুরী’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে প্রথম আলো।

আলতো করে তপ্ত মাটিতে এক পা রাখেন তিনি। তারপর দ্বিতীয় পা-টাকে বাড়িয়ে দেন তেমনই সাবধানে। তিনি পা রাখলে মাটি ব্যথা পাবে, এমনই যেন ভাব তাঁর হাটার মধ্যে। খুব ধীরে ধীরে মাটিকে ব্যথা না দিয়ে হেঁটে যেতে থাকেন তিনি। যারা তাঁকে চেনে, তারা জানে, কেনো তিনি এভাবে হাঁটেন। যারা জানে না, তারা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে বৃদ্ধা এই মহিলাটির দিকে। গায়ে সাদা রঙের শাড়ি, মাথাভর্তি শাদা চুল, মুখে বলিরেখার দাগ স্পষ্ট, চোখে ভারি ফ্রেমের চশমা। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে একগাদা বই। ভিক্ষুক তিনি নন, অথচ পা খালি। আবার সেই খালি পায়েও হাঁটছেন অত্যন্ত সাবধানে। নিজের পা-কে বাঁচাতে নয়, যেন জীবন্ত কোনো কিছুর উপর পা ফেলছেন তিনি, এমনই সাবধানতার সাথে অতি মোলায়েমভাবে পা ফেলে হেঁটে চলেন তিনি। পাশ থেকে কৌতূহলী কেউ হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করে বসে, “এমন করে হাঁটছেন কেনো খালাম্মা? পায়ে কোনো সমস্যা? আপনার জুতো কোথায়?” প্রশ্নকর্তার দিকে ঘুরে দাঁড়ান তিনি। দৃষ্টি স্থির করে দেখেন তাঁকে। তারপর যেমন মোলায়েম করে হাঁটেন তিনি, ঠিক সেরকম নরম গলায় বলেন, “আমার তিন ছেলে মাটির নীচে শুয়ে আছে বাবা। আমি মা হয়ে জুতো পায়ে হাটি কী করে? আমার বাছারা কষ্ট পাবে না?”

  পাঁচ বছর আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে তাকে আশীর্বাদ করেছিলেন রমা চৌধুরী। ২০১৩ সালের ২৭ জুলাই গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীর । প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কিছুই নেননি রমা চৌধুরী। দু’জনই সব হারিয়েছেন৷ একজন একাত্তরে, আরেকজন পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্টে৷ বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ তাদের দেখা হয় গণভবনে৷ তারা দু’জনে একান্তে কথা বলেছেন৷ ভাগ করে নিয়েছেন বেদনার গল্প৷রমা চৌধুরী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সব হারিয়েছেন৷ পাকিস্তানি হায়েনারা একাত্তরে তাঁর সন্তান, ভিটেমাটি, সম্ভ্রম সব কেড়ে নিয়েছে৷ আর তখন তিনি ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক৷ চট্টগ্রামের প্রথম নারী এমএ রমা চৌধুরী ১৯৬২ সাল থেকে ১৬ বছর শিক্ষকতা করেছেন৷ আর গত ২০ বছর ধরে লেখালেখি করে কাটিয়েছেন৷কিন্তু একাত্তরে সব হারানো এই নারী যেন পথকেই তার ঠিকানা করে নিয়েছেন৷ চট্টগ্রামের রাস্তায় বই ফেরি করে তার জীবন চলে৷ মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘‘একাত্তরের জননী৷”। রমা চৌধুরীর এই দুঃসহ জীবন এবং সংগ্রামের কথা সংবাদ মাধ্যম ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই  সময়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়৷ আর তা নজরে আসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার৷ আর তিনি দায়িত্ব দেন তাঁর বিশেষ সহকারী (মিডিয়া) মাহবুবুল হক শাকিলকে৷ তাদের দু’জনের যোগাযোগ হয়৷ রমা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গণভবনে দেখা করেন৷ তিনি দেখা করতে আসেন খালি পায়ে৷ শাকিল ডয়চে ভেলেকে বলেছিলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী রমা চৌধুরীর সঙ্গে একান্তে আধাঘণ্টা কথা বলেন৷ তারা একান্তে কথা বলার সময় তাদের জীবনের সংগ্রাম আর কষ্টের কথা বলেছেন৷ এসময় রমা তাঁর লেখা বই ‘‘একাত্তরের জননী’’ প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেন৷ প্রধানমন্ত্রী রমা চৌধুরীর আত্মসম্মান দেখে মুগ্ধ হয়েছেন৷ তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোন সহায়তা চাননি৷” তবে রমা নিজে অনাথ আশ্রম গড়ার স্বপ্নের কথা বলেছেন, জানান শাকিল৷ আর সেই স্বপ্ন তিনি পুরণ করতে চান ফেরি করে বই বিক্রির টাকায়৷ প্রধানমন্ত্রী রমা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে বলেন সব হারানোর কষ্ট তিনি বোঝেন৷ আর রমা চৌধুরীসেই সময় সংবাদ মাধ্যমকে দ্বিধাহীনকণ্ঠে জানান, তাঁর নিজের কোন চাওয়া পাওয়া নেই৷ সবাই মিলে যদি দেশটাকে গড়া যায় তাহলে তিনি খুশী হবেন৷ বিলাসিতা-উপভোগ বাদ দিয়ে সবাই মিলে দেশটাকে গড়ার কথা বলেন তিনি৷ আলাপের এক পর্যায়ে নিজের বোন এবং দু’বোনের সন্তানেরা কোথায় কী করেন- তা বলেন শেখ হাসিনা। রমা চৌধুরীও আগ্রহ নিয়ে সেসব কথা শোনেন। শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা তো দু’বোনই বেঁচে আছি। আমাদের একটাই সাধনা, আমরা দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই।” শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সদস্যদের আরো সাবধানতা অবলম্বন করার অনুরোধ জানান রমা চৌধুরী। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “সব কাজই বিপজ্জনক। সবখানেই রাজাকার আর খুনিরা আছে।” গণভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় রমা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, “তুমি বয়সে আমার ছোট হবে। তোমাকে আশীর্বাদ করি। যেন তোমার সব অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে পার।”প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর রমা চৌধুরী ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান৷ সেখান থেকেই তিনি চট্টগ্রামের পথে রওয়ানা হন৷

মুক্তিযুদ্ধ এই নারীকে নিঃস্ব করে দিয়ে তাঁর কাঁধে ঝোলা ঝুলিয়ে দিয়েছে। একটা বিড়ালকে সঙ্গী করে ছোট্ট এক কক্ষে তাঁর জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। নিজের উপর এবং তাঁর পরিবারের উপর নেমে আসা এইসব চরম বিপর্যয়ের পরেও ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন রমা চৌধুরী। নিত্য অভাবের সাথে লড়তে কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে নিজে উপার্জন করার পন্থাকেই বেছে নেন তিনি। এর জন্য লেখালেখিকেই পেশা হিসাবে পছন্দ করেন তিনি। নিজের লেখা বই নিজেই ফেরি করে বিক্রি করা শুরু করেন তিনি। এটাই তাঁর পেশা। চট্টগ্রাম এবং ঢাকা, এই দুই শহরে খালি পায়ে হেঁটে, কাঁধের ব্যাগে নিজের বই নিয়ে তিনি ছুটে গেছেন এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে, এক অফিস থেকে আরেক অফিসে। বই বিক্রি হলে খাবার জুটেছে, বিক্রি না হলে খাবার জোটে নি। তাঁর ভাষাতেই বলি, “আমি বই বিক্রি করি। যেদিন বিক্রি করতে পারি সেদিন খাই, যেদিন পারি না, সেদিন উপোষ করি।”

বিগত কয়েক বছর তিনি ভীষণভাবে অসুস্থ ছিলেন। অর্থকষ্টে ঠিকমতো চিকিৎসা নিতে পারেননি। গত ২০ জুন ২০১৭ তারিখের দৈনিক ‘ইত্তেফাক’-এ প্রকাশিত খবরে বলা হয়- ‘অর্থের অভাবে লেখিকা রমা চৌধুরী হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দরকার; কিন্তু অর্থাভাবে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসতে হয়েছে।’ তখন রমা চৌধুরীর বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন বলেছিলেন, ‘রমা চৌধুরী নিজেই কারো কাছ থেকে অর্থ-সহযোগিতা নিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে চান না। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে যেমন কোনো অর্থসহযোগিতা নেননি, তেমন কোনো ব্যক্তির কাছ থেকেও নিতে চান না। নিজের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন এই সংগ্রামী নারী।’

অনেকদিন ধরেই হাসপাতালে ছিলেন তিনি; তাই তাঁর মৃত্যুসংবাদ অপ্রত্যাশিত ছিলো না। তবুও এমন একজন জননী সাহসিকার মৃত্যুর শোক সংবাদ আমাদের বেদনার্ত করে, শূন্যতা তৈরি হয়। একাত্তরের বীরাঙ্গনা ও জননীখ্যাত লেখিকা রমা চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি আবারো জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। কারণ, তাদের ত্যাগেই আজ স্বাধীন দেশ, এই লালসবুজ পতাকা।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,ভাসানটেক সরকারি কলেজ, ঢাকা

(তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সমকাল, দৈনিক প্রথম আলো, ইন্টারনেট)