এ আমি অন্য এক শিলা

শিলা চৌধুরী
(ক্যালিম্পং থেকে)

শ্রীপুর সদর হাসপাতালে আমার জ্ঞান ফেরার পর যখন চোখ খুলি হুমড়ি খেয়ে পড়লো সাত আট জন পেশাদার সাংবাদিক আমাকে প্রশ্নবানে বিদ্ধ করতে ! ঘোলাটে চোখে তাদের মুখ দেখতে পেয়েছিলাম আর শুনতে পাচ্ছিলাম একেকজনের প্রশ্ন…আপনাকে কজন মিলে ধর্ষণ করেছে ,কোথায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে, কোথায় কোথায় স্পর্শ করেছে. …!!! সালটা উনিশ একানব্বই আর দিনটা সতেরো অক্টোবর ।আমি তখন উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ি।আমাদের গ্রামেরই ফাউগান উচ্চ বিদ্যালয়ে।তখন বিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলছিল ।দুপুর বারোটা থেকে ছিল আমার পরীক্ষা ।ওই সময়ে আমার সঙ্গে আর কারোর পরীক্ষা ছিল না ।সবাই দশটার আগেই তাই চলে যায় ।আমি খেয়েদেয়ে হেলতে দুলতে চলছিলাম বিদ্যালয়ের পথে।আমাদের বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ে যেতে সব কটা বাড়ির পরে একপাশে গজারি বন পরে, আরেকপাশে ধান ক্ষেত ।তারপর গ্রামের হাট আর হাট পেরুলেই বিদ্যালয় ।সব মিলিয়ে মিনিট দশেক ও লাগে না পায়ে পৌছাতে ।সবে মাত্র বাড়ি পেরিয়ে গজারি বনের কাছে পৌঁছেছি ,নিচে ধান ক্ষেতে দিনমজুররা কাজ করছে,তাদের একজন আবার আমাকে জিজ্ঞেস করলো দিদি তুমি এতো দেরিতে আজ..? ওনার কথার জবাব দিয়ে একটুখানি এগুতেই জঙ্গল থেকে দুজন মানুষ বের হয়ে মুঠো ভর্তি করা ধূলো আমার চোখে আচমকা ছিটিয়ে দিয়ে আমার নিজের গলার ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে রাস্তার উপরেই ওড়না টানতে লাগলো, আরেকজন গজারির গাছের ডাল ভেঙে ওটা দিয়ে পিঠে পায়ে মারতে লাগলো ।

আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে কোন আওয়াজই গলা থেকে বের করে পাশে একটু দূরেই ধান ক্ষেতে কাজ করে যাওয়া ওদেরকে ডাকতে পারছিলাম না সাহায্যের জন্যে..।যে আমাকে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে যাচ্ছিলো সে টেনে হিঁচড়ে রাস্তার উপরেই কাঁঠাল গাছের সঙ্গে বাঁধতে শুরু করে দেয় আর অপরজন দৌড়ে একটু দূরেই ধান ক্ষেতে দেবার জন্যে রাখা কিটনাশক এর বোতল নিয়ে এসে আমার মুখে ঢেলে দিয়ে নাক মুখ চেপে ধরে গিলতে বাধ্য করে ।এদিকে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে চারদিকে অন্ধকার দেখতে পাচ্ছিলাম ।মনে হচ্ছিলো সব আলো নিভে গেছে চারদিকের ।ঠিক ওই সময়ে দিন মজুর দের একজন দেখতে পেয়ে জোরে চিৎকার শুরু করে দেয়।সবাই ওখানকার কাজ ফেলে কাদা জমি থেকে দৌড়ে আসতে থাকে ।আর সেটা দেখতে পায় বাজার থেকে সদাই নিয়ে আসতে থাকা আমাদের ছোটবেলা থেকে কোলে পিঠে করে মানুষ করা বিশ্বস্ত গৃহকর্মী সুধীর দাদা ।সুধীর দাদা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছিলেন কিন্তু নিজের জীবনের চেয়ে ও বেশি ভালোবাসতেন আমাদেরকে ।সুধীর দাদা কি করবে হয়তো বুঝতে পারছিলেন না, হাতের সব সদাই ফেলে দিয়ে একবার আমার দিকে আবার বাজারের দিকে দৌঁড়াচ্ছিলেন।ততক্ষণে দিনমজুর দাদারা পৌঁছে যায় আমার কাছে আর তা দেখতে পেয়ে আগন্তুক হামলাকারীর গজারি বনের ভেতরে পালিয়ে যায় । আমি ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি..।বাজারেই আমার সেজকাকুর চেম্বার ।সুধীর দাদা দৌড়ে সেজকাকুর চেম্বারে পৌঁছায় কিন্তু সেজকাকু রুগী দেখতে তখন বাইরে. ..।তাই সুধীর দাদা আবার ছুটে আসে আমার কাছে ।সবাই মিলে বাড়িতে নিয়ে যায় আমাকে ।বাড়িতে মা আর ঠাম্মী ছাড়া আর কেউই ছিলো না ।বাবা অফিসে ,বাকি কাকুরাও যার যার কাজে ।পাড়ার লোকজন সব দৌড়ে আসে কিন্তু কি করবে তারা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।সেজকাকু ততক্ষণে রুগী দেখে বাজারে পৌঁছাতেই খবর পেয়ে যায়।

বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও রাস্তায় নেমে আসে ।দিনমজুরদের মধ্যে দুইজন সেই আততায়ীদের দেখতে পায় বাজারের পুকুরে হাত মুখ ধুঁতে।তারপর দেখতে পায় চায়ের দোকানে ।সেজকাকুকে সে খবর দিতেই ওদেরকে ধরতে গেলে ওরা সেজকাকুকে চেয়ার তুলে পাল্টা আক্রমণ করে ।ডানহাতে সেই চেয়ার লেগে হাত ভেঙে যায় সেজকাকুর তবু ও পিছপা হয়নি। কাকু ধরে ফেলে ওদেরকে ।তারপর সেই ভাঙা হাতের পরোয়া না করেই আমাকে প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা শুরু করে ।কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয় ভেবে মটর সাইকেল সেই ভাঙা হাতে চালিয়েই আমাকে রাইমোহন কাকু আর সেজকাকু নিয়ে যায় রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস হাসপাতালে ।সেখান থেকে শ্রীপুর সদর হাসপাতালে । আর চোখ খুলতেই সেখানে সেই ঘৃন্যতম শব্দ / প্রশ্ন বানে …. ” আপনাকে কজন মিলে ধর্ষণ করেছে !!!” যেসব শব্দের কোনটাই আমার পরিচিত শব্দ আর বোধগম্য ছিল না সেই বয়সে. ..এদিক ওদিক সবার কৌতুহলী মুখ গুলো দিয়ে লালা ঝরছিল রসালো উত্তর শোনার জন্যে…।ততক্ষণে পুলিশ চলে আসে ,সরিয়ে নিয়ে যায় আমার কাছ থেকে সবাইকে।হাসপাতালে থাকাকালীন আশে পাশের রুগীসহ তাদের পরিজন সব জানালা দিয়ে অদ্ভুত সব চোখ নিয়ে দেখে যেতো আর নিজেদের মনগড়া প্রশ্ন আর উত্তর নিজেরাই দিয়ে যেতো…।কানে পৌঁছাতো আর ভয়ে ,কান্নায় মনে হতো আসলে আমিই কি সেই আমি. ..।পালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলাম হাসপাতাল থেকে. …পারিনি পালাতে। বাড়ি ফিরলাম মুখ ,শরীরে কালসিটে দাগ নিয়ে।গলার আর মুখের ভেতর মনে হতো আগুন লেগে ফোস্কা পড়ে গিয়েছে…।মা থেকে শুরু করে সবাই চুপচাপ ।কারো মুখে কোন শব্দ নেই।বাড়ি জুড়ে নিস্তব্ধ অবস্থা ।ভুতুড়ে বাড়ি মনে হচ্ছিলো. ..।কান্না গলায় আটকে যেতো, বুঝার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম কি করে সব এতো বেশি পরিবর্তন ।পারছিলাম না বুঝতে…

সহপাঠীরা দেখতে আসে অনেকেরই প্রশ্ন সেই একই. ..তোর সঙ্গে নাকি খারাপ কাজ হয়েছে ? হিসেব মেলাতে পারছিলামনা. ..খারাপ কাজের. ..।পরে বিদ্যালয়ে যেতেই সেই একই প্রশ্ন ।শারিরিক ও মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লাম…।পাকস্থলীতে সমস্যা দেখা দেয়. ..সবকিছু থেকে দূরে নিয়ে যায় মেজকাকু। তার কর্মস্থলে ।বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ রেখে সুস্থ করতে ঘরেই পড়াশোনা চলতে থাকে ।দিনরাত সেইসব শব্দ গুলো মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে ।ক্রোধে মনে হতো চারদিকে আগুন লাগিয়ে দেই…পারতাম না।পালাতে ইচ্ছে হতো।পুরো দুনিয়ার সবকিছু অসহ্য লাগতো…।চেনা সবকিছু অচেনা মনে হতো। নিরপরাধ আমি, কি করে সব বদলে গেলো মিথ্যাচারে …। ভেতরে ভেতরে সেই ক্রোধের আগুন কখন কিভাবে জানি না সাহসী করে দিয়ে যায় আমাকে. .. বাড়ি ফিরি আবার…উত্তর খুঁজে বেড়াই কেন ঘটেছিল কি অপরাধ ছিল আমার. .. উত্তর পাইনা …!! আজোও খুঁজে ফিরি  সেই উত্তর …

ছবি: গুগল